
কালীঘাট পটশিল্প
বাংলার চিত্রকলার ইতিহাসে তখন কোম্পানি আমলের পর্ব চলছে। সেই কোম্পানি চিত্রকলার নির্মাণ যুগের প্রাক্ মুহূর্তেই আমরা দেখতে পাই কালীঘাট পটশিল্প-এর (Kalighat Pot Painting) উজ্বল উপস্থিতি। এদেশে ইউরোপীয় ধারার চিত্রকলার সূচনা পর্ব থেকেও দেখা গিয়েছে যে কালীঘাট পটচিত্রের ধারা আদরনীয় হয়ে উঠেছে। বাংলা শিল্পকলা ধারায় কালীঘাট চিত্রকলা শুধু জনপ্রিয়ই নয়, রয়েছে এমন এক নিজস্ব শৈলীবিস্তার, যার সমঝদার আজও অক্ষুণ্ণ; কিন্তু সেই রীতি আজ স্তব্ধ।

প্রাথমিকভাবে কালীঘাট মন্দিরের বাজার ধরেই এই পটের ব্যবসা শুরু হয় তীর্থপণ্য হিসেবে। তীর্থযাত্রীরা কালীঘাটে এলে তীর্থের স্মারক হিসেবে এই পট কিনে নিয়ে যেতেন। সেই চাহিদা অনুসারে আঁকা হত ছবি। শিব, কালী, রাম-সীতা, ইত্যাদিই ছিল পটের বিষয়। বালির মিলে তৈরি কাগজে (চৌকো আকৃতির) আঁকা হত এই পট। তাই এই পটকে কালীঘাটের ভাষায় বলা হত ‘চৌকশ’। অর্থাৎ অনেকগুলো দিক থেকে বাংলার জড়ানো পটের থেকে আলাদা হয়ে যায় এই পট। জড়ানো পট খুলে খুলে দেখানো হয়। পরিবর্তে পটুয়া পায় চাল, ডাল, সবজি, কিছু পয়সা। এটাই সেকালের রীতি ছিল। পরিবর্তে কালীঘাট পট বিক্রি করা হত স্মারক হিসেবে। দ্বিতীয়ত, জড়ানো পট মানে লম্বা একটা স্ক্রোলে একটা কাহিনির লম্বা বিস্তার। কালীঘাট পট অপরদিকে এক ফালি পটে কাহিনির একটি খন্ডাংশ। তৃতীয়ত, জড়ানো পট স্মারক নয়।
আরও পড়ুন: যুগে যুগে পট কাব্যের কালীঘাট
কালীঘাটের পটের বিশিষ্টতা –
১। এই পটের শৈলী প্রাধানত রেখাভিত্তিক। তাই এই পটে রঙের প্রসঙ্গ প্রথমদিকে আসেনি।
২। এমন সুডৌল বলিষ্ট মূর্তি আমরা কালীঘাট পটে দেখতে পাই যা আর অন্য কোনও শিল্প ধারায় নজরে পড়ে না।
৩। আলতানুটি ও গোলেলর জাদু কালীঘাট পট শৈলীকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। আলতানুটি হল তুলি যা দিয়ে আলতা পরানো হত। তাই রেখার বৈশিষ্ট্য কালীঘাটে অন্যরকম। আর গোলেল হল ডৌলতার পর্দা বা টোন।
৪। সামাজিক চিত্রে শিল্পীর যে রসিক মনের পরিচয় মেলে তা অন্যত্র সুলভ নয়। চরম উৎকর্ষের সময় কাল ১৮৫০ থেকে ১৯১৫।
শিব, দুর্গা, কালী-র বিষয় থেকে বেরিয়ে গিয়ে শিল্পীরা আঁকলেন ‘আলালের ঘরের দুলাল’, ‘বাবু ও বেশ্যা’, ‘ঘরে ছুঁচোর কেত্তন আর বছরে কেঁচোর পত্তন’ জাতীয় ছবিগুলি। পাশাপাশি দেখা গেল শুধু মাত্র আঙ্গিকে নয়, রূপের আদর্শেও কালীঘাট বিশিষ্টতা অর্জন করেছে।

কালীঘাটের পট হল সব মিলিয়ে এই বাঙালির নিজস্ব শিল্প অভিব্যক্তির এক বিশেষ প্রকাশ। নিরবচ্ছিন্ন প্রবহমান রেখা, ধ্রুপদী উজ্জ্বলতা, রঙের উজ্বল্যের পাশাপাশি প্রবল এবং তীব্র ব্যঙ্গ, রসিকতা ও সমাজ সমালোচনা গ্রাম বাংলার জড়ানো পটের ধারা থেকে কালীঘাটকে আলাদা করে দেয়। তীর্থযাত্রীদের জন্য তৈরি বলে গোড়ায় ছবির বিষয় না হলেও পরবর্তীকালে সমাজ সমালোচনায় মনোনিবেশ করেন শিল্পীরা। শিব, দুর্গা, কালী-র বিষয় থেকে বেরিয়ে গিয়ে শিল্পীরা আঁকলেন ‘আলালের ঘরের দুলাল’, ‘বাবু ও বেশ্যা’, ‘ঘরে ছুঁচোর কেত্তন আর বছরে কেঁচোর পত্তন’ জাতীয় ছবিগুলি। পাশাপাশি দেখা গেল শুধু মাত্র আঙ্গিকে নয়, রূপের আদর্শেও কালীঘাট বিশিষ্টতা অর্জন করেছে। পটলচেরা চোখ, ধনুকাকৃতি ভ্রু, বাবরি করা চুল, নধর বপু, পুরুষের আদর্শ লক্ষণ। নারীর আদর্শ হল সুপুষ্ট দেহ আর লীলায়িত ভঙ্গিমা। চব্বিশ পরগনার মাটির পুতুল হয়ে উঠল কালীঘাট পটচিত্র শৈলীর অনুপ্রেরণা।

ফেরনদ লেজে, পিকাসো, অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল ও সর্বোপরি যামিনী রায় পৃথিবীর বহু শিল্পীকেই কালীঘাটের পট প্রেরণা জুগিয়েছে। শ্রেষ্ঠ সিরিজ ‘মোহন্ত এলোকেশি’। এক সময় ‘পয়সা পয়সা দর’–এ তীর্থ যাত্রীরা স্মারক হিসেবে এই পট কিনতেন। পরে ওগুলিয়ো গ্রাফ, স্পিথেগ্রাফে উজ্বল ছাপা ছবি এই পটের বাজারকে অবলুপ্তির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।