নতুন বছরের রেজোলিউশন হোক জীবনের জয়গান

স্বাগত ২০২১

মহামারির কথা ইতিহাসের পাতায় এতদিন পড়েছি। একুশ শতকেও তা করাল চেহারা নিয়ে আমাদের পথ আটকে দাঁড়াবে, কেই বা জানত? কেবল মহামারি নয়, এ যে অতিমারি। বিশ্ব জুড়ে স্বজনহারার বিলাপ,  মৃত্যুর আতংক যে ভয়াবহ মাত্রায় দেখলাম, তার নজির আগে কোথাও নেই। মধ্যযুগে ব্ল্যাক ডেথ ইউরোপে নড়িয়ে দিয়েছিল সামন্ততন্ত্রের ভিত। সমাজে কতটা পরিবর্তন নিয়ে এসেছে কোভিড, এখনই শেষ কথা বলা সম্ভব নয়। তবে পুরোনো জীবন-জীবিকায় জোর আঘাত সবারই চোখে পড়েছে। লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক নেমেছেন রাস্তায়। নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে হাজার হাজার মাইল হেঁটে চললেন, সংক্রমণের পরোয়া না করেই। সরকারি নির্দেশ সত্ত্বেও তাঁদের পেটের ভাত, মাথার ছাদ কেড়ে নিয়েছে বাবুরা। 

তবে অমানবিকতা আর নিষ্ঠুরতাই শেষ কথা নয়। অভিনেতা সোনু সুদের মতো কিছু মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরানোর উদ্যোগ নেন। সরকারও বাড়িয়ে দেয় সাহায্যের হাত। অন্ধকার সময়ে আলো হাতে দাঁড়ালেন কোভিড যোদ্ধারা। জীবন বিপন্ন করে ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশকর্মীরা আম-জনতাকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব নিলেন। তাঁদের পরিশ্রম এবং আত্মত্যাগকে জানাই  সেলাম। কুর্নিশ জানাই শ্রমিক এবং কৃষকদের, যাঁরা অতিমারির সময়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দিয়েছেন ঘরে ঘরে। সভ্যতার চাকা এখনো থেমে যায়নি তাঁদের জন্যই। 

করোনাকালে একটি কথা বলা প্রচার করা হতে থাকে – 'সামাজিক দূরত্ব'। যা কিনা অস্পৃশ্যতারই নামান্তর। সচেতন মানুষেরা প্রতিবাদ করে বিকল্প শব্দবন্ধের কথা বলেন – 'শারীরিক দূরত্ব'। সংক্রমণ রুখতে দৈহিক সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা জরুরি। কিন্তু সমাজে তো আরও বেঁধে বেঁধে থাকতে হবে। নইলে মহামারির বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়ব কীভাবে? মানুষে মানুষে দূরত্ব যে সত্যিই কমে আসছে, তা দেখলাম সোশ্যাল মিডিয়ায়। নিজের কথা বলতে, নিজেকে প্রকাশ করতে ফেসবুক, ট্যুইটার, ইনস্টাগ্রাম বেছে নিলেন ঘরবন্দি নাগরিকেরা। ভালোবাসা আপন করে নেয় সবাইকে, দুনিয়া যতই বড়ো হোক না কেন। মহামারি আমাদের তা বুঝিয়ে দিল। 

লকডাউনে যখন বহু মানুষের রোজগার বন্ধ, আমাদের মন জয় করে নিল মানবিকতার আরেক মুখ। স্থানীয় লোকেরাই নানা জায়গায় জোট বেঁধেছেন, গড়ে তুলেছেন ছোটো ছোটো স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। দিনের পর দিন ধরে গরিব-দুঃস্থদের সেবা করেছেন। হাতে তুলে দিয়েছেন খাবার এবং ওষুধ। অসহায় পশুপাখিদের খাবার দিয়েছেন নিয়মিত। 

একা রামে রক্ষা নেই, সুগ্রীব দোসর! করোনার প্রকোপে যখন মানুষ নাজেহাল, বাংলায় হানা দেয় ঘূর্ণিঝড় আমফান। বহু লোক ঘরছাড়া হন, রুজি-রোজগার ধ্বংস হয় অনেকের। বিদ্যুৎ সংযোগ হারিয়ে পাড়ার পর পাড়া অন্ধকারে ডুবে যায় অনির্দিষ্ট কালের জন্য। কিন্তু মানুষ তো হার মানার পাত্র নয়। প্রত্যন্ত গ্রামের কোনো গৃহবধূ পাঠশালা খুললেন কচিকাঁচাদের জন্য। দল-মত নির্বিশেষে ত্রাণের কাজ চলতে লাগল। বিপন্নদের উদ্ধারে দিন-রাত এক করে দিল সরকার।    

বাঙালির দুই বড়ো উৎসব দুর্গাপুজো এবং ইদ। দু'বারই সংযমের পরিচয় দিয়েছেন সাধারণ মানুষ। দেশের নানা প্রান্তে মৌলবাদী শক্তির যতই বাড়বাড়ন্ত হোক না কেন, আমরা কিন্তু ধর্মান্ধতার ফাঁদে পা দিইনি। বাড়িতে আনন্দ করেছি। আশা রেখেছি, পরের বছর মহামারি থাকবে না। ধুমধাম করে উৎসবে জমায়েত হব সবাই।

সেই পরের বছর আজ শুরু হল। করোনার প্রকোপ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। ২০২০ সাল আমাদের শিখিয়েছে আত্মীয়তার নতুন সংজ্ঞা। তাকে পাথেয় করেই ২০২১-এর পথ চলা শুরু। ক্রিসমাসে জীবনের উদযাপন করে গত বছরকে আমরা বিদায় জানিয়েছি। নতুন বছরে আমরা জীবনকে জিতিয়ে আনব। পরাজিত হবে অতিমারি। আবার সবাই গেয়ে উঠব, "…somewhere at some new moon, / We'll learn that sleeping is not death, / Hearing the whole earth change its tune,…"

Developed by DXDasia