
১৯৩০ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি অভিযান করে বেড়ান সারা ইউরোপ তথা বিশ্বময়
সাল ১৯৪৮। সবেমাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। এমত অবস্থায় হিন্দি সিনেমায় আত্মপ্রকাশ পেল এক অন্য ধরনের সিনেমা। যেখানে নাচে-গানে উপস্থাপন করা হল ভারতবর্ষের কথা ও সমাজ চেতনার কথা। সিনেমার নাম ‘কল্পনা’। এই অভিনব প্রচেষ্টার জনক বিশ্ববরেণ্য উদয়শঙ্কর। আজ তাঁর জন্মদিন।
আধুনিক নৃত্যের পথিকৃৎ বিশ্ববিখ্যাত ভারতীয় নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর ১৯০০ সালের ৮ ডিসেম্বর রাজস্থানের উদয়পুরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা শ্যামশঙ্কর ছিলেন বাংলাদেশের যশোর জেলার অধিবাসী। উদয় শঙ্কর অর্জিত নৃত্যকলার তাত্ত্বিকজ্ঞান এ উপমহাদেশের ধ্রুপদী নৃত্যে ব্যবহারে অভূতপূর্ব মুন্সিয়ানা দেখান। নসরতপুর, গাজীপুর, বারানসি এবং ঝলওয়ারসহ বিভিন্ন জায়গায় পড়াশোনা করেন উদয়শঙ্কর। ১৯১৮ সালে উদয়কে মুম্বাইয়ের জে জে স্কুল অব আর্টস এবং পরে গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভের জন্য রয়্যাল কলেজ অব আর্ট, লন্ডনে যান।
উদয় শঙ্করে জীবন শুরু হয় আর্ট কলেজে ছবি আঁকা শেখার মধ্য দিয়ে। কিন্তু তিনি প্রতিষ্ঠা পেলেন বিশ্বের একজন শ্রেষ্ঠ নৃত্যশিল্পী হিসেবে। ভারতীয় ধ্রুপদী নৃত্যের কোনো শাখাতেই উদয় শঙ্কর আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেননি। তাঁর উপস্থাপনার লক্ষ্য ছিল সৃষ্টিশীলতা। তিনি চিত্রকলা বিষয়ে উচ্চতর অধ্যায়নের জন্য বৃত্তি নিয়ে রোমে যান।
ছাত্রজীবনেই তিনি বোম্বাইয়ের এক স্টেজ প্রোডাকশনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তারপর অনেকটা আকস্মিকভাবেই তিনি মেতে ওঠেন নাচ নিয়ে। এই সময়ই তাঁর সঙ্গে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে বিশ্বখ্যাত নৃত্যশিল্পী আনা পাভলোভার। তিনিই উদয়শঙ্করকে নিজের ব্যালেতে নৃত্যশিল্পী হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি সেখানে রাধাকৃষ্ণ ও ইন্ডিয়ান ম্যাসেজ এর প্রধান নৃত্যশিল্পী হিসেবে যোগদান করেন।
বস্তুত এভাবেই তিনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ নৃত্যশিল্পী হিসেবে দর্শক সাধারণের সপ্রশংসা দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন। গোটা ইউরোপ দেখতে পেল দিব্যকান্তি তরুণের নৃত্যভঙ্গিমার মধ্য দিয়ে প্রাচ্যের জীবনেতিহাস, সংস্কৃতি আর কিংবদন্তির এক মূর্ত রূপ। এই সময় তার ইউরোপের বহু খ্যাতনামা জ্ঞানীগুণীর সঙ্গে আত্মিক যোগসূত্র গড়ে ওঠে। রম্যা রলা, সিলভ্যা লেভি, ইহুদি মেনুহিন প্রমুখ অসাধারণ মনীষীর সঙ্গে গড়ে ওঠে তার নিবিড় সখ্য।
১৯২৯ সালে উদয়শঙ্কর তার নৃত্যশৈলী প্রদর্শনের মাধ্যমে ইউরোপ জয় করে ফিরে এলেন স্বদেশে। এরপর গোটা ভারত জুড়ে শুরু করলেন তার নৃত্যশিল্পের অভিযান। তিনি যেখানেই যান সেখানকার নৃত্যভঙ্গিমা আর সংগীতের বৈশিষ্ট্য অনুধাবনের চেষ্টা করেন।
স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে তিনি আলমোড়ায় স্থাপন করলেন উদয়শঙ্কর ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টার নামে একটি নৃত্যশিক্ষাকেন্দ্র। এখানেই তিনি রচনা করেন নতুন মঞ্চপ্রকরণ সহযোগে বিশ্বজোড়া খ্যাতির অধিকারী রামলীলা। তার এই শিল্প অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হন গুরু শঙ্করণ নাম্বুদ্রিকন্দ্র, পিল্লাই, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এবং তিমিরবরণের মতো বহু গুণী শিল্পী। শঙ্করণ নাম্বুদ্রিকন্দ্র উদয়শঙ্করকে কথাকলি নৃত্যকলার মধ্যদিয়ে আধ্যাত্মিক চেতনার প্রকাশ করতে শিখিয়েছিলেন যা ভারতিয় সিনেমার জগতে প্রথম। উদয়শঙ্করের নৃত্যভঙ্গিমায় সবচেয়ে বেশী প্রভাব পড়েছে কথাকলি নৃত্যের। তার কাহিনী স্রোতকেই তিনি তার নাচের ভঙ্গিমার মুখ্য অভিপ্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। সেই সঙ্গে মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন ভরতনাট্যমের মণিপুরী নাচের প্রকাশরীতি এবং জাভা ও বালিদ্বীপের তালবাদ্য। কিন্তু তার নৃত্যভঙ্গিমায় সর্বাধিক আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে সেখানে, যেখানে তিনি ভারতীয় নৃত্যরীতির সঙ্গে মিশিয়েছেন পাশ্চাত্যের ব্যালে নাচের সম্মোহনী লালিত্য।
আরও পড়ুন
পুতুলখেলার বাসন-কোসন
১৯৩০ খ্রিষ্টাবেদ উদয়শঙ্কর তার দলবল – ট্রুপ অব হিন্দু ড্যান্সার্স অ্যান্ড মিউজিসিয়ান্স নিয়ে উপস্থিত হন ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি দিগ্বিজয়ী আলেকজান্ডারের মতো আপন মহিমায় অভিযান করে বেড়ান সারা ইউরোপ তথা বিশ্বময়। পাশ্চাত্যের মানুষ ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয় বলতে যে তিন মহাবলী তথা টেগোর, গান্ধী এবং শঙ্করকে বুঝত- এই উদয়শঙ্কর ছিলেন তাদের অন্যতম। পাশ্চাত্যে এদেশ পরিচিত হয়ে ওঠে টেগোরের দেশ, গান্ধীর দেশ এবং উদয়শঙ্করের দেশ হিসেবে। কিন্তু উদয়শঙ্করের এই নৃত্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে জেগে ওঠা উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেশি দুর অগ্রসর হতে পারেনি। কলাকেন্দ্র ১৯৪৪ সালেই অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। আলমোড়ার এই কলাকেন্দ্রের টাকা পয়সার মুল উৎস ছিলেন মিস ট্রেট। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় কোন কারণে এই অর্থ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।
তবু একেবারে ভেঙে পড়েননি তিনি। ভাঙা মনকে জোড়াতালি দিয়ে আবার নতুন করে কিছু গড়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকেন তিনি। তার এই কর্মকাণ্ডের কর্ণধার এবং একান্ত সহায়িকা ছিলেন তার স্ত্রী শ্রীমতি অমলাশঙ্কর। ১৯৭০ সালে ছায়াছবি আর নৃত্য নাট্যের সংমিশ্রণে তার অভিনব সৃষ্টি শঙ্করস্কোপ। এই শঙ্করস্কোপই তার শিল্পী জীবনের সর্বশেষ কীর্তিস্তম্ভ, যা বিশ্বে নতুন এক মঞ্চরীতির ইতিহাস রচনা করেছেন। শিল্পে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য তিনি ভারত সরকার কর্তৃক পদ্মভূষণ উপাধিতে ভূষিত হন।
