যাদবপুরের চায়ের দোকানে জাঁকিয়ে বসেছেন ‘নচিকেতা’

যাদবপুরের ‘চা ও নচিকেতা’ দোকান ঠিক যেন বাস্তব আর রূপকথার মেলবন্ধন

চিকেতা গেয়েছেন “সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা”। এক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। কারণ গৌরবের প্রথম ও শেষ প্রেম কিন্তু স্বয়ং নচিকেতা (Nachiketa Chakraborty)। যাদবপুরের এইট বি (Jadavpur 8B) বাসস্ট্যান্ডের পাশে সরু একফালি দোকান। সবাই ‘নচিকেতার চায়ের দোকান’ নামেই চেনে। আশেপাশের মানুষজন এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা প্রতিদিন বিকেল-সন্ধেতে ভিড় জমান। চায়ে চুমুক সহ চলতে থাকে নির্ভেজাল আড্ডা। কেউ কিন্তু বসেন না, আরে বসার জায়গা কোথায়? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই চা পান চলতে থাকে। দোকানের মালিক গৌরব বলেন, “নচিকেতার সেই যে বিখ্যাত গানগুলো আছে না, ওই ‘ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার। মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার ওপার’, আহা কী সব লাইন! কী লিখে গেলেন উনি! প্রতিদিন ভাবি আমাদের সমাজের বাস্তব চিত্রটাই তো ফুটিয়ে তুললেন।” গৌরবের চোখের কোণে কি জল জমছে? সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে চা-এ চিনি দিতে ব্যস্ত হয়ে যান। এভাবেই চলতে থাকে রোজকার সংসার। হ্যাঁ সংসার, এমনটাই মনে করেন গৌরব। মাটির ভাঁড়ে আদা-দুধ চা, লোকে বলে ‘পুরো একঘর চা’।

যাদবপুরের এইট বি বাসস্ট্যান্ডের পাশে সরু একফালি দোকান। সবাই ‘নচিকেতার চায়ের দোকান’ নামেই চেনে।

দোকানে ছড়ানো ছেটানো আছে গায়ক নচিকেতা চক্রবর্তীর অসংখ্য ছবি। রঙিন সাদাকালো সব ছবিতে দেখা যাবে নচিকেতার বিভিন্ন বয়স।

দোকানে ছড়ানো ছেটানো আছে গায়ক নচিকেতা চক্রবর্তীর অসংখ্য ছবি। রঙিন সাদাকালো সব ছবিতে দেখা যাবে নচিকেতার বিভিন্ন বয়স। নচিকেতাও এই দোকানে এসেছেন, চা খেয়েছেন, বুকে টেনে নিয়েছেন গৌরবকে। সেইসব ছবিও সুন্দর ভাবে সাজানো আছে দোকানের বাইরে। গৌরব মনে করেন তিনি জীবনে যা যা করতে পেরেছেন সবই নচিকেতার জন্য। ডাই হার্ড ফ্যান হয়ত একেই বলে। গত জানুয়ারি মাসে এই দোকান পাঁচ বছরে পা দিয়েছে। গৌরবের জীবনটাও ছিল আসলে তথাকথিত মূল স্রোতের বাইরে। তাকে নাকি একসময় কেউ পছন্দই করত না। সেখান থেকে সম্পূর্ণ ‘কামব্যাক’ করে ফিরে আসেন গৌরব। খোলেন এই চায়ের দোকান। বাকিটা তো অনুপ্রেরণা। এখন গৌরবকে দেখেও শিখছে মানুষ। একটা চায়ের দোকান আর মিষ্টি ভদ্র ব্যবহারের মধ্যে কীভাবে আপামর তারুণ্যের মন জয় করা যায়, তা জানেন গৌরব। একেকসময় বলা হয় ‘যাদবপুরের গৌরব’। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধে দোকানে চলে নচিকেতার গান। কখনও নচিকেতা গেয়ে উঠছেন “যখন সময় থমকে দাঁড়ায় নিরাশায় পাখি দুহাত বাড়ায়”, কখনও “রাজশ্রী তোমার জন্য মুদ্রাস্ফীতি অস্ট্রেলিয়ায়”, কখনও বা নচিকেতার গাওয়া রবীন্দ্রসংগীত “ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকায় মাথা”। স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন গৌরব। এই স্বপ্নকে নিয়েই তাঁর পথ চলা কখনও ফুরোয় না।

গৌরবের অনুপ্রেরণা গায়ক নচিকেতা, আর এখন অনেক মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন গৌরব। বাংলার বুকে এমন অজস্র মণিমুক্তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। কারোর খোঁজ রাখি, কারোর খবর আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। সবাই যখন কোরাসে বলে ওঠে, “নচিকেতায় আছি” বা “নচিকেতার চা খাচ্ছি”, অনেকটা বাস্তব আর রূপকথা যেন পাশাপাশি হাঁটে। অক্লান্ত পরিশ্রমের মাঝে জীবনবোধ সম্পর্কে তাঁদের ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস বারবার আমাদের বাকরুদ্ধ করে, মোহিত করে। না হয় ওঁদের স্বপ্নের সাক্ষী হই। এভাবেই বসন্ত কাটুক আর গৌরবদের বোধ আকৃষ্ট করুক আমাদের। বারবার।

Post Tags
Developed by DXDasia