
কবি যাচ্ছেন ইতালি। আপ্যায়নের ভার নিয়েছেন স্বয়ং মুসোলিনি
১৭ মার্চ ১৯৩৫। পৃথিবীর এক শান্তিকামী কবি শিল্পীর কালি ও কলমে ছবি হয়ে উঠে এলো দ্বিতীয় মহা সমরের নিন্দিত সমর নায়ক মুসোলিনি। এই কবি শিল্পীর নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। অস্থির রেখার দ্রুত গতির চলনে যেন এক পাগলের তাণ্ডবের ছবি এটি। এর আগে রবীন্দ্রনাথ এমন কোনও সমর নায়কের ছবি বা কোনও নামজাদা মানুষেরও অবয়ব এঁকেছেন কিনা সন্দেহ। মুসোলিনিকেও যে চেনা যাচ্ছে এমনটা নয়। কিন্তু তিনি সরাসরি ছবির তলায় চরিত্রের নাম মুসোলিনি লিখেই দিলেন। এতো মানুষ থাকতে মুসোলিনি কেন? এর উত্তর পেতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে আরও দশটি বছর আগে।
সেটা ১৯২৫। ওই বছরের শেষ দিকে ইতালি থেকে কার্লো ফারমিকি পড়াতে এলেন শান্তিনিকেতনে। সঙ্গে এলেন তরুণ অধ্যাপক জোসেফ তুচ্চি। দেখা গেল তাঁরা সঙ্গে নিয়ে এসেছেন বহু শত মূল্যবান ইতালীও বই। আর সেই বইগুলি রবীন্দ্রনাথকে পাঠিয়েছেন স্বয়ং মুসোলিনি। শুধু তাই নয় তুচ্চির বেতনও বিশ্বভারতীকে দিতে হল না। তাঁর যাবতীয় খরচ বহন করল ইতালির সরকার। কবি মুগ্ধ। শান্তিনিকেতন থেকে টেলিগ্রাম করে নিজে ধন্যবাদ জানালেন খোদ মুসোলিনিকে। ওদিকে ফারমিকি শুরু করলেন মুসোলিনির ভারত প্রীতি-র প্রচার করতে। এর পরের ঘটনা আরও গভীর।
এবার কবি যাচ্ছেন ইতালি। তাঁকে আপ্যায়নের ভার নিয়েছেন স্বয়ং মুসোলিনি। রোমে কবিকে সম্মান দেওয়া হল। হাজির রইলেন মুসোলিনি। অন্য আরেক দিন তাঁর নির্দেশে রোমান সম্রাটদের সময়ে নির্মিত কলোসিয়ামে কবিকে সম্মান জানান হল। পঁচিশ থেকে তিরিশ হাজার লোক হাজির ছিলেন সেখানে। কবি তো আপ্লুত। এর পর কবির বিশেষ অনুরোধে বেনেডেক্তো ক্রোচে-কে নেপলস থেকে এনে কবির সঙ্গে দেখা করানো হল। তখনও কবি জানেন না ফ্যাসি বিরোধী এই দার্শনিক কার্যত গৃহবন্দি। এর পর কবি এলেন ভিলেনুভ গ্রামে। এখানে একটি ভালো হোটেলে যে ঘরে কবি উঠলেন সেই ঘরেই দীর্ঘদিন থেকেছেন ভিক্টর হুগো। কবির মন ভরে গিয়েছে আনন্দে। কবি মুসোলিনির প্রশস্তি গাইতে শুরু করলেন। শুধু তাই নয় কবি শুরু করলেন ফ্যাসিস্ত প্রীতি দেখাতে। সেগুলি ইতালির কাগজ পত্রে ফলাও করে প্রকাশ পেতে থাকল।
এমনটাই চাইছিলেন মুসোলিনি। নিন্দনীয় এই ব্যাক্তি তখন নানা উপায় দেশ বিদেশের মনিষীদের প্রশংসা কুড়োতে নানা ফন্দি বার করে চলেছেন। যা তখনও বুঝতে পারেননি রবীন্দ্রনাথ। ফলে ভিলেনুভ গ্রামে বসে কবি যখন ফ্যাসিস্ত প্রীতি দেখাচ্ছেন তখন খুব অবাক হয়ে গিয়েছিলেন অদূরে থাকা রোম্যারোঁলা। কবি দেখা করলেন তাঁর সাথে। রোঁলা তাঁকে আসল ঘটনা সব খুলে বললেন। সব শুনে কবি অ্যানড্রুজকে দীর্ঘ চিঠি লিখলেন। সেই চিঠি ছাপা হল ম্যানচেস্টার গার্ডেনে। মুসোলিনির দলবল তাতে খেপে আগুন হয়ে গিয়ে শুরু করলেন প্রবল দাপাদাপি আর গালাগালি। অধ্যাপক তুচ্চিকে শান্তিনিকেতন থেকে সরিয়ে নেওয়ার হুকুম এলো ইতালি থেকে।
কবি অঙ্কিত মুসোলিনির এই ছবির মধ্যে ধরা পড়েছে তাঁর উন্মাদের মতো রণ হুঙ্কারের চিত্র। ক্ষিপ্র রেখায় ও ভঙ্গিতে কবি মুসোলিনির চরিত্রের সেই বেতালা আর বদ মেজাজি রূপটিকে পরিষ্কার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
নিজের কথায় ও লেখায় যে ভাবে তিনি এই হীন চরিত্রের রাষ্ট্রনায়কের প্রশংসা করেছিলেন তা দীর্ঘদিন কবিকে গ্লানি বোধে ভুগিয়েছিল। ছবিতে এবার তাই দশ বছর পরে কবি মুসোলিনির উন্মাদ প্রায় রণ নায়কের চিত্রটি তুলে ধরলেন।
