
বিজেপি আটকে গেল ২৪০-এ, প্রস্তুতি চলছে কোয়ালিশন সরকারের
অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচন-এর ফলকে ভবিষ্যতে মানুষ ১৯৭৭-এর লোকসভা ভোটের ফলের সঙ্গেই তুলনা করবে। ৭৭-এ অবশ্য ইন্দিরা পরাজিত হয়েছিলেন। জরুরি অবস্থা জারির জন্য ভারতীয় জনতা শাস্তি দিয়েছিল তাঁকে। আর তার ৪৭ বছর পরে, ২০২৪-এ ভারতের জনতা নরেন্দ্র মোদীকে সিংহাসন চ্যুত করেনি ঠিকই তবে তাঁর ক্ষমতায় লাগাম পরিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, দেখা গেল, বারানাসী কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদীর ভোটও কমেছে ২০১৪ এবং ২০১৯-এর থেকে।
মোদী ডাক দিয়েছিলন ‘৪০০-পার’-এর। তাঁর নিজের দলের জন্য লক্ষ্য স্থির করে দিয়েছিলর ৩৭১। ভোটের ফল অবশ্য ‘মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’ স্লোগানটার উপরেই এক ঘটি জল ঢেলে দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আসন বাড়বে এই নিয়ে বিজেপি নেতৃত্ব মোটামুটি নিশ্চিত ছিল। ফল (লোকসভা ২০২৪ ফলাফল) বেরোতে দেখা গেল ১৮ থেকে আসন কমে ১২-তে নেমেছে। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস ২৯। ভোটও বেড়েছে টিএমসির অনেকটা। ১৯৪৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত বাংলা শাসন করেছে যে দুটি দল সেই কংগ্রেস এবং সিপিএমের সর্বোচ্চ দুই রাজ্যনেতা মুর্শিদাবাদের পাশাপাশি দুটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে একযোগে হেরে গিয়েছেন। সিপিএম তার শূন্যতার লজ্জা ঢাকতে কয়েক জন উজ্জ্বল কমবয়সীকে বেশ কিছু কেন্দ্রে প্রার্থী করেছিল। কোনও কাজে আসেনি। বিজেপি বা বলা যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে যে ভাবে প্রথম দফার পর থেকে দেশ জুড়ে এই নির্বাচনকে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক ছকের মধ্যে এনে ফেলেছিলেন তাতে এই রাজ্যে ভোটে মেরুকরণের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। সেই মেরুকরণের সুবিধা কিছুটা টিএমসি পেয়েছে। অধীর চৌধুরী বা মহম্মদ সেলিমের হারের পিছনে এই কারণ কিছুটা হলেও কাজ করেছে।
মোদী ডাক দিয়েছিলন ‘৪০০-পার’-এর। তাঁর নিজের দলের জন্য লক্ষ্য স্থির করে দিয়েছিলর ৩৭১। ভোটের ফল অবশ্য ‘মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’ স্লোগানটার উপরেই এক ঘটি জল ঢেলে দিয়েছে। তিনি নিজেই প্রচার করতে শুরু করেছিলেন রাম যেমন বিষ্ণুর অংশ, তিনিও প্রায় সেরকমই, ডাইরেক্ট ঈশ্বরের দেওয়া অ্যপোয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে নিয়ে ভারতবাসীকে উদ্ধার করতে, এসেছেন বলাটা হয়তো ঠিক হবে না, বলা উচিত অবতীর্ণ হয়েছেন।
অটল বিহারী বাজপেয়ী এনডিএ-র কোয়ালিশন সরকার চালিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদী ওই ধরনের সকলের কথা শুনে সরকার চালানোয় কতটা দক্ষ, সেদিকে সকলের নজর থাকবে।
নরেন্দ্র মোদী গুজরাটে এবং দিল্লিতে যে এত দিন সরকার চালিয়েছেন, সেখানে কোথাওই সংখ্যার সমস্যা ছিল না। এবার ২৭২ পেরোতে না পারার ফলে জেডি (ইউ), শিবসেনা শিন্ডে গোষ্ঠী, রাষ্ট্রীয় লোকদল এমন সব ছোটো ছোটো আঞ্চলিক দলকে সঙ্গে নিয়ে সরকার চালাতে হবে। এবং সেই সব দল যাতে সমর্থন প্রত্যাহার করে না নেয় তাই প্রতিটি দলের এক বা একাধিক সাংসদকে মন্ত্রিসভায় জায়গাও দিতে হবে। আগেও এনডিএ ছিল। কিন্তু সেই এনডিএ-তে সঙ্গী দলের উপর বিজেপিকে নির্ভর করতে হত না। যেমন যখন কৃষি আইনের বিরুদ্ধে চাষিদের বিক্ষোভ হচ্ছিল, তখন শিরোমণি অকালি দল মোদীর মন্ত্রিসভা ছেড়ে চলে গিয়েছিল। তাতে বিজেপির কোনও অসুবিধা হয়নি। বরং সুবিধে হয়েছিল। এখন কিন্তু এরকম ঘটনা ঘটলে সরকারের সংখ্যা নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। আর এর ফলে বিজেপি যে আগাম ঘোষণা করে রেখেছে তারা ২০২৪-এ ক্ষমতায় এসে ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান পোল’ চালু করতে সংবিধান সংশোধন করবে, বা ‘অভিন্ন দেওয়ানি নীতি’ চালু করতে সংসদে বিল আনবে, সেই সব কাজে সঙ্গী দলগুলির অনুমোদন লাগবে। জোর করে করতে গেলে সরকার সংকটে পড়তে পারে। তবে মহিলা আসন সংরক্ষণ নিয়ে অবশ্য কোনও দলই হয়তো আর বাধা দেবে না। সামনের লোকসভা ভোটে এই সংরক্ষণ চালু হওয়ার কথা। সামনেই আরএসএস-এর শতবর্ষ। সেই উপলক্ষে কোনও বড়ো ধরনের হিন্দুত্ববাদী সিদ্ধান্ত বিজেপি কার্যকরী করে কিনা, সঙ্গী দলগুলি তখন কী ভূমিকা পালন করে, সেদিকে অনেকেই তাকিয়ে থাকবে। তবে সেখানেও খুব বিতর্কিত কিছু করতে গেলে সমস্যা হবেই। যদি না দল ভাঙিয়ে সংখ্যার সমস্যা আগাম মিটিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু সংখ্যাটা অনেক বড়ো, ৩০-এর বেশি। ফলে কাজটা অত সহজ হবে না।
অটল বিহারী বাজপেয়ী এনডিএ-র কোয়ালিশন সরকার চালিয়েছেন। নরেন্দ্র মোদী ওই ধরনের সকলের কথা শুনে সরকার চালানোয় কতটা দক্ষ, সেদিকে সকলের নজর থাকবে। কংগ্রেস ১৯৫২ থেকে শুরু করে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত ছ-বার ৩৫০-এর বেশি আসন পেয়েছে। ১৯৮৪-র পর থেকে কোনও রাজনৈতিক দলই আর সাড়ে তিনশো আসন সংখ্যা ছুঁতে পারেনি। বিজেপি ৩০০ অতিক্রম করে ৩০৩ আসন একবারই মাত্র পেয়েছিল, ২০১৯ সালে। এবারে নরেন্দ্র মোদীর ডাক ছিল ৩৭০-এর। কিন্তু বিজেপি আটকে গেল ২৪০-এ। প্রস্তুতি চলছে কোয়ালিশন সরকার তৈরির। ১৯৮৪ পরে কংগ্রেসও আর কখনও সাড়ে তিনশো আসন ছুঁতে পারেনি। ১৯৮৪-র পর কংগ্রেস মাত্র দু-বার ২০০ আসন সংখ্যা অতিক্রম করতে পেরেছে, ১৯৯১ এবং ২০০৯-এর লোকসভা ভোটে। ফলে কংগ্রেসকে ভোটে যেতে হয়েছে কখনও ইউপিএ বা এখন যেমন ইন্ডিয়া জোটের দল হিসেবে। তাহলে কি বিজেপিও সেই কোয়ালিশন যুগে ঢুকে পড়ল এবার? তার সম্ভাবনা প্রবল, তবে তা নিয়ে শেষ কথা এখনই বলা সম্ভব নয়।
বিজেপি ৩০০ আসন পেরোবে না সেটা মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। প্রধান কারণ, দক্ষিণে বিজেপি দুর্বল আর হিন্দি বলয়ে বৃদ্ধির সুযোগ খুব কম ছিল। বিহার এবং মহারাষ্ট্রে ২০১৯-এর মতো ফল করা প্রয়োজন। কিন্তু ওই রকম চমকপ্রদ ফল পরপর দু-বার সাধারণত করা যায় না।
১৯ এপ্রিল প্রথম দফা ভোটের পর দেখা গেল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর প্রচারের ভাষা বদলে ফেলেন। নির্বাচন ঘোষণার পরের দিন ১৭ মার্চ থেকে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে ৪০০-পার কথাটা ঘন ঘন আসছিল। ১৯ এপ্রিল থেকে তাঁর বক্তৃতার মূল বিষয় উঠল হিন্দু-মুসলমান। কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে কী কী ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটবে, হিন্দু নারীর মঙ্গলসূত্র, কৃষকের মোষ, গৃহস্থের সম্পত্তি ছিনিয়ে নিয়ে যাদের বেশি সন্তান জন্মায় তাদের দিয়ে দেবে কংগ্রেস, এই ধরনের কথা ক্রমাগত বলে চললেন প্রধানমন্ত্রী। কেন হঠাৎ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে এমন পরিবর্তন? জানা গিয়েছে দলের কাছে ভোট চলাকালীন খুশি না হওয়ার মতো বেশ কিছু খবর আসতে শুরু করেছিল।
উত্তরপ্রদেশে অর্ধেকের আসন বিজেপির হাত ছাড়া হওয়া মানে যোগীর আসনও যে টলমল করে উঠতে পারে তা বলাই বাহুল্য। প্রাথমিক খবর যা পাওয়া যাচ্ছে তাতে এটা স্পষ্ট যে দলিত ভোট ঘুরে যাওয়াতেই এই ধাক্কা।
বিজেপি যে এবারের ভোটে উত্তরপ্রদেশে এরকম ধাক্কা খাবে সেটা আগে বোঝা যায়নি। তবে নির্বাচন চলাকালীন দিল্লির সাংবাদিকদের দু-এক জন যারা গিয়েছিলেন নির্বাচন কভার করতে, তাঁদের কেউ কেউ এরকম আশঙ্কার কথা বলেছিলেন। উত্তরপ্রদেশে অর্ধেকের আসন বিজেপির হাত ছাড়া হওয়া মানে যোগীর আসনও যে টলমল করে উঠতে পারে তা বলাই বাহুল্য। প্রাথমিক খবর যা পাওয়া যাচ্ছে তাতে এটা স্পষ্ট যে দলিত ভোট ঘুরে যাওয়াতেই এই ধাক্কা। এর একটা কারণ ‘৪০০-পার’ মানে সরকার সংবিধান বদল করতে চায়, সংরক্ষণের ধারা বাতিল করতে, কংগ্রেসের এই অভিযোগ অনেক দলিত মনকে স্পর্শ করে। বিজেপির অন্তত তিন জন নেতা তার আগে বিবৃতি দিয়ে বলেছেন তাঁরা সংবিধান বদল করতে চান তাই ‘৪০০-পার’ আসন চাই। পরে অবশ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব একাধিকবার ঘোষণা করেছে তাঁরা সংবিধান বদল করতে চান না, কিন্তু ততদিনে যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এর ফলে এ-ও বোঝা গেল যে, নরেন্দ্র মোদীর মন-কি-বাত বলার যে ক্ষমতা পাঁচ-সাত বছর আগে ছিল, সেই দক্ষতায় মরচে পড়েছে। বরং উল্টে এটা বলা যায়, কংগ্রেস যে ক্রমাগত কাস্ট সেন্সাসের কথা বলছে, তার একটা প্রভাব দলিত, ওবিসি, পিছড়ে বর্গের মানুষের মধ্যে পড়েছে। ২০১৪ এবং ২০১৯-এ সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বিজেপি সমাজের এই অংশের বড়ো সংখ্যক মানুষকে হিন্দুত্বের ছাতার তলায় আনতে সক্ষম হয়েছিল। সেই ছাতাটা মনে হয় সরে যাচ্ছে।
বেশ কিছু দিন ধরেই নরেন্দ্র মোদী নিজের ইমেজ নিয়ে একটু বেশিই ঝুঁকি নিচ্ছিলেন। কর্নাটকের বিধানসভায় তিনি কার্যত নিজে হাতে তুলে নিয়েছিলেন প্রচারের দায়িত্ব। সফল হননি। কিন্তু তার পরেই মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, রাজস্থানে তিনি বিপুল ভাবে সফল হলেন ভোট বাড়াতে এবং প্রায় হাতের বাইরে চলে যাওয়া তিনটি রাজ্যে দলকে পুনরায় ক্ষমতায় ফেরাতে। রাম মন্দিরে প্রাণ প্রতিষ্ঠার কিছু আগে থেকেই তিনি বলতে শুরু করেছিলেন তিনি ঈশ্বরের নির্দেশ পালন করছেন। ইদানীং প্রতিটি জনসভায় তিনি আগের থেকে অনেক বেশি নিজের নাম নিজেই উচ্চারণ করছিলেন, নিজের গুণগান নিজেই বলে চলেছিলেন। কিন্তু ভারতের এক বিরাট সংখ্যক জনতা ইভিএম হাতে পেতেই বোতাম টিপে জানিয়ে দিলেন, তাদের বেশিরভাগই মোদীর গ্যারেন্টিতে বিশ্বাস করছেন না।
*মতামত লেখকের নিজস্ব
