পাকিস্তান-করাচির ‘মিনি বাংলাদেশ’ : ৩০ লাখ বাঙালির রোজনামচা

কেমন আছে পাকিস্তানের তৃতীয় প্রজন্মের বাঙালিরা?

পাকিস্তানের বন্দর নগরী করাচি। করাচির মৎস্য শিল্পের মেরুদণ্ড বলা হয় বাঙালিদের। শোনা যায়, বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে মাছ ধরার কাজে বাঙালির পারদর্শিতার জন্য, বর্তমান বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল থেকে জেলেদের নিয়ে যেতেন করাচির উর্দুভাষী ব্যবসায়ীরা। বাঙালি জেলেদের জন্য একটি কলোনিও গড়ে তোলা হয়েছিল। বর্তমান পাকিস্তানের অর্থনৈতিক রাজধানী এবং সবচেয়ে ঘন জনবসতিপূর্ণ শহর করাচি তখনও কলুষিত হয়নি। বর্তমানে মাচ্ছি কলোনি, বাঙালি কলোনি, বাংলাবাজার কলোনি, চিটাগং কলোনি, মুসা কলোনি, ইব্রাহিম হায়দারির মতো প্রায় ১৩২টি বাঙালি কলোনি আছে করাচির আশপাশে।

ইব্রাহিম হায়দেরি এলাকায় বেশির ভাগই বাঙালির বসবাস। করাচি শহরের কেন্দ্র থেকে ইব্রাহিম হায়দেরি এলাকায় যেতে গাড়িতে লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। এক সময় জায়গাটি ছিল ছিমছাম একটি জেলে পল্লী। তবে বর্তমানে এটি হয়ে উঠেছে নোংরা ঘিঞ্জি একটি জনপদ। রাস্তা ধরে সাগরের দিকে যেতে থাকলে, পরিবেশে, গন্ধ, দৃশ্য, শব্দ সবই বদলে যেতে থাকে। যেখানে সেখানে নোংরা জল জমে আছে। তার ওপর ভাসছে আবর্জনা। আর রাস্তার দুপাশে বস্তির মত সার সার ঘর। এঁদের বেশির ভাগই ভারত ভাগের পর থেকেই বংশ পরম্পরায় সেখানে বসবাস করছে, তাদের মধ্যে রয়েছে বাঙালিও। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাগের পর অনেকেই করাচি শহরে চলে আসে। কিন্তু লাখ লাখ বাঙালিকে পাকিস্তান এখনও তাদের নাগরিক হিসেবে মর্যাদা দেয়নি। পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়া এই বাঙালিদের দুর্বিষহ জীবন নিয়ে ২০১৭ সালে  ‘বিশ্বাসঘাতকের তকমা ঘোচেনি করাচির ১৫ লাখ বাঙালির’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিসি। এছাড়াও বহু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এ বিষয়ে অহরহ লেখালিখি চলছেই। এই বঞ্চনার সঙ্গে যতটা না রয়েছে জাতিসত্তার সম্পর্ক, তার চেয়ে বেশি রয়েছে পাকিস্তানের জটিল ইতিহাসের।

২০১৭ সালে পাকিস্তানের সামা টিভির এক খবরে বলা হয়, দেশটির নাগরিকত্ব যাচাইকরণ সংসদীয় কমিটি পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে আটকে পড়া বাঙালিদের বৈধ করার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে বিষয়টি সহজ নয়। এজন্য পাকিস্তানের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করতে হবে। সে কাজ আজও বিশবাঁও জলে। অন্যদিকে, ‘দ্য ইকোনোমিস্ট’ পত্রিকার ইনটেলিজেন্স ইউনিট-এর ২০১৮ সালে করা এক সমীক্ষায় দাবী করা হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক শহর হল পাকিস্তানের করাচি। আন্ডারওয়ার্ল্ডের গ্যাংওয়ারের জন্য বিখ্যাত। প্রতিনিয়ত খুনোখুনি লেগেই থাকে। 

করাচি এলাকায় ‘পাকিস্তানি বেঙ্গলি অ্যাকশন কমিটি’ নামে বাঙালিদের একটি সংগঠনের সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করেন জয়নুল আবেদিন। সালোয়ার-কামিজ এবং কোটি পরা জয়নুল আবেদিনকে সাধারণ একজন পাকিস্তানির মতই লাগে। তবে চেহারায় বাঙালির ছাপ। তাঁর কথায়, “বাঙালিদের সিংহভাগই বয়সে তরুণ। এরা সব পাকিস্তানে তৃতীয় প্রজন্মের বাঙালি। আমরা খারাপ ছিলাম না এক সময়। জাতীয় পরিচয়পত্র জোগাড় করতে কর্মকর্তাদের কিছু ঘুষ দিতে হতো। তাছাড়া ঠিকঠাকই চলছিল। তবে করাচিতে সন্ত্রাস এবং জঙ্গি তৎপরতা বাড়তে থাকায় জীবনযাপনের সেই স্বস্তি দিন দিন উবে  যাচ্ছে। ভুয়ো জাতীয় পরিচয়পত্র জোগাড় করাও পাকিস্তানের বাঙালিদের জন্য এখন প্রায় অসম্ভব।” 

এই তরুণ বাঙালি নেতা মনে করেন, সস্তা শ্রমের সুবিধার জন্য পাকিস্তানে কেউ চায় না বাঙালিরা দেশ ছেড়ে চলে যাক, কিন্তু বৈধতার জন্য কেউ তাদের জন্য কিছু করছেও না। বাঙালিরা নাগরিক নয়, সুতরাং তাদের ভোট নেই। ফলে, রাজনীতিকরা তাদের নিয়ে মাথা ঘামায় না।

লাখ লাখ বাঙালিকে পাকিস্তান এখনও তাদের নাগরিক হিসেবে মর্যাদা দেয়নি। পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়া এই বাঙালিদের দুর্বিষহ জীবন নিয়ে ২০১৭ সালে ‘বিশ্বাসঘাতকের তকমা ঘোচেনি করাচির ১৫ লাখ বাঙালির’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিসি।

আমারা ইউসুফ নামে বাঙালি কলোনির এক মহিলা তার ঘরের ভেতরেই একটি স্কুল চালান। দু’বছর আগে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর তার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। কারণ, পরিচয়পত্র না থাকায় কোনো কলেজ তাকে ভর্তি করেনি। নাগরিকত্বের প্রশ্নে প্রতি বছর হাজার হাজার বাঙালি তরুণ-তরুণী কলেজ থেকে বেরিয়ে পেশাগত সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। আমারা ইউসুফের কথায়, “আমারা মনে করি, পাকিস্তানে বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর কোনো ভবিষ্যৎ নেই, কারণ তারা শিক্ষার মত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।”

পাকিস্তানি এক ভ্লগারের ভিডিও-তে দেখা যায়, নিজের ঘরের সামনে ছোটো এক উঠোনে কার্পেট বোনেন নাসিমা। তাঁর ঘরের অবস্থা জরাজীর্ণ। নাসিমা তাঁর বয়সের তুলনায় বয়স্ক, ক্লান্ত। জানালেন, একটি কার্পেট শেষ করতে চার থেকে ছয় সপ্তাহ লাগে। তা বেচে যা আয় ছ’শ রুপি।  তাতে সংসার চলে না। “আইডি কার্ড না থাকায় আমার ভাই কোনো চাকরি পায় না, আমার বাবা পেনশন পায় না। এই কার্পেট বোনা ছাড়া উপায় কী?”

পুলিশের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে নাসিমার বাবা, ভাই এলাকার বাইরে খুব একটা বেরোয় না। ফলে কলোনির ভেতরেই যেসব ছোটোখাটো ফ্যাক্টরি আছে, সেখানে নামমাত্র পয়সায় খাটতে হয় অধিকাংশ বাঙালিকে। পাকিস্তানে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান আসাদ ইকবাল বাট নিজেই সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, একজন অবাঙালি শ্রমিক যেখানে মাসে ১২-১৩ হাজার রুপি মজুরি পায়, একজন বাঙালি পায় তার অর্ধেক। সমস্যা হচ্ছে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর পাকিস্তানে বাঙালিরা ঘৃণার শিকার হয়ে পড়ে। তাদেরকে ছোটো চোখে দেখা শুরু হয়, বিশ্বাসঘাতক হিসেবে দেখা শুরু হয়। রাখঢাক না রেখেই বৈষম্য শুরু হয়। বাঙালি মেয়েরা ফ্যাক্টরি, বাড়িতে বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে। শুধু যে পয়সা কম তা নয়, যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে তারা।

এ তো গেল নেতিবাচক দিক। করাচির ইতিবাচক দিকও আছে। ১৯৫৩ সালে যাত্রা শুরু করে আজ ৭০ বছর ধরে বিরতিহীন ভাবে চলছে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। প্রথম বিভাগীয় প্রধান ছিলেন অধ্যাপক সৈয়দ আলি আহসান। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক রাজধানী করাচিতে বাংলাদেশ থেকে আসা প্রায় পনেরো লক্ষ বাংলাভাষী মানুষের বাস। করাচির মচ্ছিবাজার থেকে লায়েরির বাঙালি মার্কেট – আজও বেশিরভাগ দোকানের সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা। বাংলা ভাষায় লিটল ম্যাগাজিনও প্রকাশিত হয় করাচি থেকে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য থেকে আধুনিক যুগের সাহিত্য ছাড়াও বিষয় বহির্ভূত অথচ প্রয়োজনীয় কিছু বিষয়ে পাঠদান করা হয় বিভিন্ন স্তরে।

সমাজ আর পরিবারের বেড়া ভেঙে পঁচিশ বছরের পাকিস্তানি যুবক মোহাম্মদ তাহির ওয়াহিদ পড়ছেন বাংলা সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জসিমউদ্দিন, ফারুক আহমেদ পাঠ করছেন মন দিয়ে। মোহাম্মদ তাহিরের (Mohammad Tahir) জন্ম লাহোর শহরের পাশে গুজরানওয়ালা গ্রামে। পাঞ্জাব সীমান্ত। জন্মসূত্রে পাওয়া ভাষা পাঞ্জাবি। আর জাতীয় ভাষা উর্দু। পরিবারে সাত পুরুষের কেউ বাংলা জানেন না। কিন্তু স্কুল জীবন শেষ করে তাহিরের ইচ্ছে হল জাতীয় ভাষা ছেড়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়বে। ইচ্ছে আর স্বপ্ন থমকে যায় সামান্য উপার্জিত অর্থে। পরিবারের সামর্থ্য নেই ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর, তাও আবার বাংলা! উর্দু বা ইংরেজির বাইরে পাকিস্তানের মতো দেশে বাংলা ভাষায় চাকরি পাবে কোথায়! অদম্য জেদ নিয়েই পরিবারের বেড়া টপকালেন তাহির। গুজরানওয়ালা ছেড়ে পড়তে আসেন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের (Karachi University) বাংলা বিভাগে। তাহিরকে যথাসম্ভব সাহায্য করেন বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান আবু তইয়ুব খান।

মোহাম্মদ তাহির বঙ্গদর্শন-এর প্রতিনিধি সুমন সাধুকে ফোনে বলছিলেন, “বাঙালি জাতি আর বাংলাদেশের ইতিহাস ভালোবেসে আমি বাংলা পড়তে এসেছি। একসময় পাকিস্তান-বাংলাদেশ এক ছিল। পরে পৃথক হয়েছে। এই পৃথক হওয়ার ইতিহাস আজকের প্রজন্ম অনেকেই জানে না। বাংলার মতো এত সমৃদ্ধ ভাষা সম্বন্ধে আমি আরও জানতে, পড়তে, বুঝতে চেয়েছিলাম। বোঝার চেষ্টা করেছিলাম এখনকার বাংলাদেশ আসলে পাকিস্তানকে কী চোখে দেখে!”

এই পৃথিবীতে একদিকে যখন রাত, অন্যদিকে দিন। সেরকম ভাবেই আমাদের সমাজে যা যা ঘটছে সবটা অন্ধকার হতে পারে না, অন্ধকারের ভিতর আলোও আছে। আমাদের তা খুঁজে নিতে হবে। 

_________________________

তথ্যসূত্রঃ

BBC
aljazeera.com
aninews.in
বঙ্গদর্শন আর্কাইভ
thewall.in
Life of Bangali People in Pakistan since 1971 (Vlog, Rehan Creations)

 

Developed by DXDasia