
গণিত নয়, মধুসূদনের আগ্রহ ছিল সাহিত্যে
সালটা ১৮৩৩, কলকাতায় এসে খিদিরপুর স্কুলে দু’বছর পড়ার পর মধুসূদন ভর্তি হলেন তৎকালীন হিন্দু কলেজে (অধুনা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়)। তাঁর বহুমুখী প্রতিভার বিকাশের সূত্রপাত এই অধ্যয়নকালেই। কলেজে সহপাঠী হিসাবে পেলেন রাজনারায়ণ বসু, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, গৌরদাস বসাকের মতো একঝাঁক জ্যোতিষ্কদের। তবে ওই বয়সেই স্বকীয় মেধায়, মননশীলতায় তিনি ছাপিয়ে গিয়েছিলেন বাকিদের। ভর্তির পরের বছরেই কলেজের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে নিজের লেখা ‘নাট্য-বিষয়ক প্রস্তাব’ আবৃত্তি করে হয়ে উঠলেন সকলের মধ্যমণি।
পাশাপাশি সেইসময় হিন্দু কলেজে আধিপত্য করছেন ডিরোজিও’র অনুগামীরা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন মধুসূদনও যোগ দিলেন ইয়ং-বেঙ্গলে। সমাজের গোঁড়া ধর্মান্ধতা, কুসংস্কারের বিপ্রতীপে শিক্ষা আর যুক্তির স্বচ্ছ আলোয় শানিয়ে নিতে শিখলেন দেখার চোখ। তাঁর ধারণা ছিল, বিদেশে যেতে পারলেই বড়ো কবি হওয়া যাবে। তাই তখন থেকেই ভারতীয় রীতিনীতির চেয়ে যা-কিছু ইউরোপীয়, তার উপরেই ছিল ‘মনের যোল আনা টান, আঠারো আনা আস্থা’।
একবার কলেজ চত্বরে খবর ছড়াল, স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ে ইংরাজিতে একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা হবে, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানাধিকারীকে সোনা এবং রুপোর মেডেল দিয়ে পুরস্কৃত করবেন রামগোপাল ঘোষ। সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারবে কেবলমাত্র প্রথম আর দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রেরাই। তবে খবরটা কানে পৌঁছানো মাত্র দুই শ্রেণিরই ইয়ং বেঙ্গল-ঘেঁষা ছাত্ররা জানিয়ে দিল, তারা প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না। অধিকাংশ ছাত্ররাই যোগ দিতে অনিচ্ছুক দেখে বন্ধু তথা সহপাঠী মধুসূদনকে অনেক বুঝিয়ে শেষমেশ রাজি করালেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়।
যথাসময়ে প্রতিযোগিতা হল, এবং কিছুদিন পর ফলাফল বেরোতে দেখা গেল, মধুসূদন প্রথম হয়েছেন। ইংরাজি ভাষায় তাঁর অসাধারণ দক্ষতার পুরস্কার স্বরূপ স্বর্ণপদক পেলেন মধুসূদন। তবে সোনার মেডেল পাওয়ার পরেও এমন সোনার টুকরো ছাত্রকে নিয়ে মিস্টার রিজ কিন্তু মনে মনে অখুশিই। ডি. এল. রিজ তখন হিন্দু কলেজের প্রথম আর দ্বিতীয় শ্রেণীর অঙ্কের শিক্ষক। ক্লাসে ঢুকেই দেখেন, গণিত গেছে চুলোয়, মধুসূদন পড়ছেন ইংরাজি সাহিত্যের বই। শেক্সপিয়র অথবা মিলটন। আবার কোনো কোনো দিন হয়তো নিজেই কবিতা লিখছেন। দ্বিতীয় শ্রেণিতে একই বেঞ্চে পাশাপাশি দুই বন্ধু, অর্থাৎ মধুসূদন এবং ভূদেব। অঙ্কের প্রতি বন্ধুর এমন অমনোযোগ দেখে তিনিও বেশ বিচলিত হয়ে ওঠলেন। মধু যদি আদৌ মন না দেয়, তাহলে তো পরীক্ষায় নির্ঘাত ফেল। কী করে বাঁচানো যায়?
“মধু, অঙ্কের দিকে তোমার মনোযোগ দেওয়া উচিত, না দেওয়ার ফল কী হতে পারে, তাও অজানা নয় তোমার”।
মধুসূদন নির্বিকার। তখনতার শয়নে-স্বপনে শুধুই শেক্সপিয়র আর শেক্সপিয়র। বিরক্ত হয়ে ভূদেব একদিন বলেই ফেললেন শেষ পর্যন্ত –
“দ্যাখো মধু, নিউটন ইচ্ছে করলে শেক্সপিয়রের মতো কবি হতে পারবেন, কিন্তু চাইলেই শেক্সপিয়র কখনোই নিউটন হয়ে উঠতে পারবেন না। গণিতের জন্যে দরকার দৃঢ় অধ্যবসায় আর মনোযোগ”।
নিজের কবি হওয়ার সংকল্পে অটুট থাকলেও, প্রিয় বন্ধু ভূদেবের কাছ থেকে এমন কঠিন ভর্ৎসনা যেন তাঁর বুকে বিঁধল বিষ-মাখানো তিরের ফলার মতো। জবাবে হয়তো ভেবেছিলেন বলবেন –
“দ্যাখো ভূদেব, আমি যে অঙ্ক পারি না বলেই করি না, তা ঠিক নয়। করি না, যেহেতু করতে পছন্দ করি না”।
কিন্তু কথায় জবাব না দিয়েই সেদিন বেরিয়ে গেলেন কলেজ থেকে। অমিত্রাক্ষর ছন্দের উদ্ভাবক তো আর এত সহজে হাল ছেড়ে দিতে পারেন না। মনের ভেতর-ভেতর শুরু করলেন এক যজ্ঞের আয়োজন। তিনি রোজকার মতো স্বাভাবিকভাবেই কলেজ যেতেন আবার ফিরে আসতেন। মাঝের সময়ে, কলেজের ক্লাসে যেমন তার কবিতায় তন্ময় হয়ে থাকা, তাও আগের মতই। ফলে কেউই টের পায় না, কতখানি দীর্ঘ সময় দিয়ে গোপনে তিনি চর্চা করে চলেছেন অঙ্কের জটিল সমস্ত সমস্যাবলী। তিনি পণ করছিলেন যেভাবেই হোক অঙ্ক তাকে শিখতেই হবে, সসম্মানে পাশ করতেই হবে অঙ্কে। তা না হলে যে অপমান হবে, সে তো শুধু তাঁর নয়, শেক্সপিয়রেরও।
এইভাবেই প্রায় মাস তিনেক কেটে গেছে। একদিন ক্লাসে এসে রিজ সাহেব এমন কঠিন একটা অঙ্ক দিয়েছেন, ক্লাসের বাঘা-বাঘা ছাত্ররাও কুপোকাত। পাশে বসা ভূদেব হঠাৎ অবাক হয়ে দেখলেন, মধুসূদন ঘাড় নুইয়ে অঙ্কের খাতায় নিবিষ্ট। শুধু নিবিষ্টই নয়, প্রায় শেষও করে এনেছেন উত্তর। তা দেখে বন্ধুর গর্বে গর্বিত ভূদেব রিজকে জানালেন,
“স্যার, মধু পেরেছে”।
“তাই নাকি? মধু?”
রিজ সাহেব ডাকলেন মধুসূদনকে।
“মধু, বোর্ডে অঙ্কটা কষে দেখিয়ে দাও তো সবাইকে”।
নিপুণ চিত্রকর যে ক্ষিপ্রতার সাথে ক্যানভাসে তুলির আঁচড় কাটেন, বোর্ডে গিয়ে মধুসূদনও ঠিক সেভাবেই এক নিঃশ্বাসে অঙ্কের সমাধান করে দেখিয়ে দিলেন যে তিনি চাইলেই তা পারেন। রিজের ঠোঁটের কোণে যেন ফুটে উঠল হালকা একটা হাসির রেখা। এদিকে ক্লাসের ছাত্ররা তো অবাক। এও কি সম্ভব? সারাদিন সাহিত্যে ডুবে থাকা মধু কষে ফেলল সবচেয়ে কঠিন অঙ্কটা?
ক্লাস শেষে, স্যার বেরিয়ে যেতে মধুসূদন ঘুরে তাকালেন ভূদেবের দিকে।
“কেমন ভূদেব? শেক্সপিয়র যে চেষ্টা করলেই যে নিউটন হতে পারেন, প্রমাণ পেলে তো?”
ভূদেব আলিঙ্গনে জড়ালেন সুহৃদ মধুকে। তবে তাঁর জন্য আরও চমক তখনও অপেক্ষা করছে। মধুসূদন বললেন, “কিন্তু এটা আরম্ভ নয়। এইখানেই আমার গণিত শিক্ষার ইতি”।
ভূদেব যেন শুনলেন আরো একটু বেশি।
“আমি যে হতে চাই বিরাট কবি। গণিত কী করে হবে আমার অমৃত?”
এই অধ্যবসায়, জেদ আর মণীষাকে পাথেয় করেই কিছু বছরের মধ্যে রচনা করলেন ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক, প্রকৃত অর্থে সেটিই বাংলা ভাষার প্রথম মৌলিক নাটক। বাংলা সাহিত্যে বিষয়ভাবনাগত এবং শৈলীগত যে আড়ষ্টতা ছিল, মধুসূদন তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ও দক্ষতাগুণে তা দূর করেন। ১৮৬০ সালে গ্রিক পুরাণের কাহিনি অবলম্বনে রচনা করেন ‘পদ্মাবতী’, এই নাটকে তিনি প্রথমবার ইংরেজি কাব্যের অনুকরণে বাংলা ভাষায় সফলভাবে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রয়োগ ঘটালেন এবং এর সাথেই বাংলা কাব্যকে ছন্দের বন্ধন থেকে মুক্তি দিলেন। পরের বছর ১৮৬১ সালে রামায়ণের কাহিনি নিয়ে রচনা করলেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি, নয়টি সর্গে বিভক্ত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। এটি বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক মহাকাব্য। মনে করা হয়, আর কোন সাহিত্যকর্ম না করলেও কেবলমাত্র এই একটি কাব্য লিখেই মধুসূদন সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকতে পারতেন। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ রচনার মাধ্যমেই তিনি মহাকবির মর্যাদা লাভ করেন এবং উনিশ শতকের বাঙালি নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন।
পরবর্তীতে ব্যারিস্টারি পড়ার সময় ভার্সাইতে থাকাকালীন ইতালীয় কবি পেত্রার্কের অনুসরণে বাংলায় সনেট লিখতে শুরু করেন। বাংলা সাহিত্যে এও তাঁর এক অবিস্মরণীয় কীর্তি। এই সময় থেকে মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি নতুনভাবে টান অনুভব করতে শুরু করেন তিনি, যার চমৎকার প্রকাশ আমরা দেখি ‘কপোতাক্ষ নদ’, ‘বঙ্গভাষা’ প্রভৃতি সনেটে।
সব অর্থেই মধুসূদন ছিলেন বাংলা সাহিত্যের বাঁক নির্দেশক এক অনন্যসাধারণ প্রতিভা। তাঁর কাব্যের উপাদানসমূহ বিশ্লেষণ করলে সহজেই দেখা যায়, তা তিনি সংগ্রহ করেছিলেন প্রধানত সংস্কৃত কাব্য থেকে, কিন্তু সেগুলিকে পাশ্চাত্য সাহিত্যের আদর্শে সমকালীন শিক্ষিত বাঙালি সমাজের জীবনদর্শন ও রুচির উপযোগী করে কাব্যে রূপদান করেন এবং সূচনা করেন এক নবযুগের। আর এভাবেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে পাকাপাকিভাবে স্থান করে নিয়েছেন ‘মধুকবি’, তাই হয়তো আজও এ শহরে ‘মাইকেলের কবর ছুঁয়ে সন্ধে হয়’।
তথ্য ঋণ – ‘পুরনো কলকাতার পড়াশোনা’, পূর্ণেন্দু পত্রী
