
এই সমীকরণ নিশ্চয়ই পুরুষ বনাম নারীর নয় বরং তার পুরো কাঠামোটাই ক্ষমতা ও ক্ষমতাহীনের
(হ্যাশট্যাগ মিটু : আড়াল আবডাল- প্রথম পর্বের পর আজ শেষ পর্ব)
আর সেটা তো সত্যিই এক আবহমান ধারা। চেতনার ‘মারীচ সংবাদ’ নাটকটা হয়তো অনেকেই দেখেছেন। সেখানে মারীচ-এর ওপর অন্যায় ক্ষমতার প্রয়োগ করে তাকে বাধ্য করা হয়েছিল অনৈতিক কাজে। এইরকম ‘মারীচ’রা যে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে আছেন এবং ক্ষমতার কাছে নতজানু হতে বাধ্য হন, এই বার্তাই দেওয়া হয়েছিল সেই নাটকে। বাস্তবিকই অবস্থার সুযোগ নিয়ে ক্ষমতার ওপরের স্তর তাদের অধীনস্থ স্তরকে নিজের প্রয়োজনমত ব্যবহার করে, তাদের ওপর নানা ধরনের অন্যায় নির্যাতন করে, বেআইনি কাজ করতে বাধ্য করে— এটা বোধহয় খুব নতুন ব্যাপার নয়। অন্তত আমাদের দেশের সামগ্রিক কাঠামো বিবেচনা করলে হাজারো এমন উদাহরণ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কারণ এখানে সমস্তস্তরে বৈষম্য এবং তার পাশে রাষ্ট্রের ভূমিকা খুব সদর্থক নয়। নজরুলের একটা খুব খ্যাত কবিতা শুরু হয়েছিল এইভাবে : দেখিনু সেদিন রেলে/ কুলি বলে এক বাবুসাব তারে /ঠেলে দিল নিচে ফেলে। এখানে বাবুসাব না হয়ে মেমসাবও অনায়াসে হতে পারে কারণ শ্রেণিগত অবস্থানে বাবু আর বিবির কোনও তফাত নেই। আর যদি কুলি না হয়ে তিনি কামিন হতেন তাহলে সেই বাবুসাবের বিরুদ্ধে আইনি অভিযোগ জানানোর কোনো স্পর্ধা সেই যুবতী দেখাতে পারতেন— এই সম্ভাব্যতা নজরুলের যুগ থেকে এই বিশ্বায়নের যুগেও একইরকম নেতিবাচক।
আরও পড়ুন
হ্যাশট্যাগ মিটু : আড়াল আবডাল
তাহলে তো বিষয়টা সেই একই জায়গায় এসে দাঁড়ায়। ফিল্ম ডাইরেক্টর বা সংবাদপত্র সম্পাদক ছেড়েই দিন, রাজ্যে প্রচুর ইটভাটা আছে যেখানে একটা বিশেষ সময়ে ভিনরাজ্যের নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা কাজে আসেন। স্থানীয়ভাবে তারা কয়েকমাস থাকেন। নারীশ্রমিকদের কাউকে কাউকে ভাটা মালিকের ভোগে লাগতেই হয়, দূর এলাকার ইটভাটায় অত আইনকানুন চলে না। আবার ক্ষমতার চূড়োয় বসে যারা অধস্তনদের দিয়ে বেআইনি কাজ করান, দুর্নীতির সলতে পাকান অন্যদের তা মুখ বুজেই মেনে নিতে হয়। তারা এসেন্সিয়ালি পুরুষ নন। সম্প্রতি এই রাজ্যের একদা-ক্ষমতাবান এক মহিলা আইপিএসের নানা কুকীর্তি উন্মোচিত হয়েছে। তার সাগরেদরা অনেকেই পুরুষ পুলিশ আধিকারিক, তাতে কিছু এসে যায়নি। এমনকি স্কুলের দিদিমণিরা যখন লিঙ্গ-নির্বিশেষে শিশুপড়ুয়াদের শারীরিক নিপীড়ন করেন সেও কিন্তু এক ক্ষমতারই আস্ফালন। কারণ তারা জানেন ওই পড়ুয়া কিছু প্রতিবাদ করতে পারবে না, তার জামাপ্যান্ট বা ফ্রক খুলে নিয়ে প্রকাশ্যে উলঙ্গ করেও শাস্তি দেওয়া যায়, প্রয়োগ করা যায় নানা নির্যাতনের উপায়। হতে পারে, তেমনই কোনও ছাত্র সময়ান্তরে তার মাস্টারমশাইকে চোখ রাঙিয়ে বলবে, ‘আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি!’ এই একই গল্প পাওয়া যাবে থানাগারদে বন্দি নিপীড়নে, সেটাও সম্পূর্ণ বেআইনি; কিন্তু লকআপে লালচোখ বড়বাবু-মেজবাবুর সামনে বন্দি কি সেই কথা তাদের মনে করিয়ে দিতে পারে? তবু শেষ অবধি তা ক্ষমতার দিকবদলেরই গল্প। আবার নানা ক্ষমতার এই রকম রক্তচোখের দাপটেই তো নিভিয়ে দেওয়া যায় নানা জনস্বার্থ-বিরোধী দুর্নীতির তদন্তের আঁচ, হারিয়ে যায় ফাইল, লোপাট হয় প্রমাণ, উধাও হয় সাক্ষী। এই সমীকরণ নিশ্চয়ই পুরুষ বনাম নারীর নয় বরং তার পুরো কাঠামোটাই ক্ষমতা ও ক্ষমতাহীনের। তাই এরকম কেউ আজও “মি টু” তালিকায় নাম লেখাতে পারেননি, পারবেন কী করে? যারা এখনো শিরোনামে আছেন তারা এক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে অন্য ক্ষমতার কেন্দ্রে সরে গেছেন, অন্তত এখন তারা নিরাপদ। কিন্তু ওই নারী শ্রমিকটি নন, নন ওই বেচারি হোমগার্ড বা কোনো সরকারি পদাধিকারী, কাজ হারানো শ্রমিকের পরিবারগুলিও নন।
তাই কেবলই গুলিয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা। পীড়ক পুরুষ আর পীড়িত নারীর এই বানানো ছকের মধ্যে কি আসলে তরল করে দেওয়া হচ্ছে মূল দ্বন্দ্বের কাঠামোটাই! তাহলে কি এটা এক অভিসন্ধিময় নির্মাণ? যেভাবে আকাশচুম্বী বহুতলের আড়ালে ঢেকে যায় মাটি-ছোঁওয়া ছোট্ট বাসাগুলো? ভাবছি।
