
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৫৩
যে স্বপ্নাভর কথা আগের পর্বে লিখেছি, সেই স্বপ্নাভ রায়চৌধুরীই কিন্তু জীবনের একেবারে শেষে এমন একটা অবিশ্বাস্য কাজ করে চলে গেলো, যা আমি করতে পারবো বলে মনে হয় না। ওর মতো সাহস আমার নেই বোধহয়। ফুসফুসের ক্যানসারে চার পাঁচ বছর ধরে লড়াই করে চলে যাবার আগে কবি, গীতিকার, দুর্দান্ত টেবিল টেনিস খেলোয়াড় স্বপ্নাভ রায়চৌধুরী তার সম্পূর্ণ দেহ বিজ্ঞানের ও চিকিৎসা গবেষণার প্রয়োজনে দান করে চলে গেলো।
কুর্ণিশ জানাই আমার ইস্কুলের প্রিয় বন্ধুকে।
স্বপ্নাভ শেষ বারের মতো আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলো দুহাজার এগারোতে আমার রবীন্দ্রসংগীতের সিডি যখন কলকাতা প্রেস ক্লাবে প্রকাশিত হয়। অলক রায়চৌধুরীর সৌজন্যে কবিগুরুর কুড়িটা গান নিয়ে দুটো সিডি করেছিলাম। প্রেস ক্লাবে উদ্বোধন করলেন ইন্দ্রাণী সেন। গানও গাইতে হলো সেখানে। হঠাৎ দেখি, পিছনে এক কোণে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্বপ্নাভ। অনুষ্ঠানের শেষে দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরলাম।
বললাম, “এখন কেমন আছিস?”
ছেলেটা কখনো খারাপ থাকে না। একেবারে চলে যাবার আগেও বলে গেলো, “দারুণ আছি।”
সেই শেষ দেখা।
সেই ঊনিশশো পঁচাশি থেকে আজ এই দুহাজার তেইশ – এই আটত্রিশ বছরে প্রথম সেই দারিদ্র্য ও তুমুল লড়াইয়ের ন’বছর বাদ দিলে কতবার যে দেশে ফিরে ফিরে গেছি, তার হিসেব রাখিনি। কত হাজার ডলার যে আমরা খরচ করেছি দেশে আসতে ও আমেরিকায় ফিরে যেতে, তার একটা জমাখরচের হিসেব রাখলে ভালো হতো। খরচ হয়েছে যা, জমা তার তুলনায় কী হলো – মাঝে মাঝে প্রশ্ন করি নিজেকে।
যদিও বলছি জমা আর খরচ, আর কত ডলার খরচ করেছি এই প্রায় চল্লিশ বছরে অন্ততঃ কুড়িবার ভারতে ফিরে যেতে – সেকথাও বলেছি যদিও, কিন্তু আসল জমা আর খরচের হিসেব সেটা নয়। রূপক হিসেবে ব্যবহার করছি। খরচ হয়ে গেছে দেশটা, দেশের মানুষের ভালোবাসা, নিজের লোক বলে মনে করার অতি সাধারণ কিন্তু অতি তীব্র টান। দেশের সেই “চেনা দুঃখ চেনা সুখ চেনা চেনা হাসিমুখ, চেনা আলো চেনা অন্ধকার, চেনা মাটি, চেনা পাড়া চেনা পথে কড়া নাড়া চেনা রাতে চেনা চিৎকার” কবে যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।

চেনা পথে হেঁটে যাওয়া
যাদের বাড়ি একদিন যে কোনো দুপুরবেলা ভেতরের ঘরে ঢুকে গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়া যেতো, আর যাদের মা বাবার অসুখে রাস্তায় মাইলের পর মাইল হেঁটে গিয়ে ওষুধ কিনে নিয়ে আসা যেতো, যাদের বাড়ির সামনের রকে বিকেলবেলায় বসে আড্ডা দিতাম আর ক্যারম খেলতাম, আর আমাদের সেই দেড়তলা ফ্ল্যাটের জানালার গরাদ ধরে পা ঝুলিয়ে বসে বর্ষাকালে ঘোলা জল হাইড্রেন্টের মধ্যে একটা লাট্টুর মতো কেমন করে ঘুরে ঘুরে ঢুকে যাচ্ছে তাই দেখতাম, সেই দেশটার মানুষ এখন আমাদের সঙ্গে বছরে একবার বা দু বছরে একবার দেখা হলে বলে, “আবার এসেছিস? কবে এলি? কদিন থাকবি এবার?” এপ্রিল কিংবা মে মাসের গরমে আমাদের জিজ্ঞেস করে, “তোদের ওখানে কি এখন বরফ পড়ছে নাকি? শুনলাম, ওখানে নাকি খুব ভালো চিংড়ি মাছ পাওয়া যায়? আমাদের এখানে তো যা দাম …”
যে বন্ধুর সঙ্গে গোয়াবাগান পার্কের বেঞ্চির পিঠটার ওপর উঠে বসে আড্ডা দিতাম নিয়ম করে সন্ধ্যে সাতটা থেকে আটটা, তারা হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে বলে, “দেখি, পারলে একদিন আসবো। আছিস কদিন এবার?”
আমরা অনেক দূরের মানুষ হয়ে গেছি এখন।
তার মধ্যেও ওই স্বপ্নাভর মতো যারা, সুব্রতর মতো যারা, তারা আলাদা। কিংবা আমার মাসি শোভার মতো। অথবা আমাদের বাড়িতে কাজের দিদি যারা কাজ করে গেছে বছরের পর বছর, তারা। তারা বুঝতে পারে না আমরা কোথায় থাকি, সে কতটা দূর। তাদের সঙ্গে রাস্তায় দেখা হয়ে গেলে তারা ঠিক সেই আগেকার দিনের মতোই কথা বলে। বলে, “দাদা কেমন আছো? শুনলাম তোমরা নাকি এখন দিল্লিতে থাকো? মাঝে মাঝে আসো তো? বাবাকে দেখে যেও এসে। মেসোমশাই তোমাদের কথা সবসময়ে বলে।”
হ্যাঁ, আমার বাবা চিরকাল আমাদের কথা বলে এসেছেন। ঠিক যেমন মুক্তির বাবা বা চিরকাল ওর কথা বলে এসেছেন। তাঁদের জীবনে আমরাই সব।
বিদেশে থাকতে থাকতে অনেক পরিষ্কার হয়ে আসে ছবিটা। ঘোলা জলের সেই সমবৃত্তাকার ফানেলের মধ্যে থাকলে যেমন তার বাইরে আর কোনোকিছু বোঝা যায় না, সেখানে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ, কিন্তু তার বাইরে থেকে যারা দেখছে তারা বুঝতে পারছে চোরাস্রোত কোনদিকে যাচ্ছে, এবং কেমন করে খোলা হাইড্রেন্ট সমস্ত কিছু প্রচণ্ড টানে টেনে নিয়ে যাচ্ছে, তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কোন পথে, ঠিক তেমনই দেশ থেকে বাইরে, অনেক দূরে চলে যাবার পর দূর থেকে দেশের জীবনটা অন্য এক চোখ দিয়ে দেখতে শিখেছি। খড়কুটো তলিয়ে যাওয়ার মতো মানুষগুলো যে তলিয়ে যাচ্ছে, তা বুঝতে শিখেছি।
কিন্তু না, সে জীবনটাকে এক মুহূর্তের জন্যেও অবজ্ঞা, অবহেলা করিনি। ভালোবেসে এসেছি চিরকাল ঠিক আগের মতোই।
কত বছর ধরে কতবার স্বপ্ন দেখেছি, দেশে ফিরে গেছি। ফিরে গেছি আমার সেই সুন্দরবন কলেজের অধ্যাপকদের মেসে। ভিজে ভিজে দেওয়াল। স্যাঁতস্যাঁতে ঘর। তার মধ্যে ছোটো ছোটো খাটে ওরা সব আধশোয়া হয়ে আছে। দড়ি থেকে জামাকাপড় ঝুলছে। কে একজন বললেন, “আপনি ফিরে এলেন নাকি আমেরিকা থেকে?”
তারপর বলছে, “কিন্তু আপনার চাকরিটা তো পার্মানেন্ট হয়নি। অন্য একজনকে নেওয়া হয়েছে আপনার জায়গায়।”
স্বপ্ন দেখেছি, ভয়ঙ্কর বৃষ্টির মধ্যে আমি যাচ্ছি ট্রেন ধরে, এবং তারপর প্লাবনের মধ্যে পিছল ঘাটে খেয়া নৌকো ধরে। অনেক লোক সেই নৌকোয়। ভয় করছে ভীষণ। পা পিছলে যাচ্ছে ঘাটে। আমাকে যেতেই হবে। উপায় নেই। কিন্তু আমি তো সাঁতার জানি না।
যদি নৌকো ডুবে যায়?
স্বপ্ন দেখেছি, সায়েন্স কলেজে ফিরে গেছি। সেখানে আমার পিএইচডি রিসার্চের কাজ শেষ হয়নি। আমি আমেরিকা থেকে ফিরে এসেছি দেশে আবার। কিন্তু কী নিয়ে যে গবেষণা করছিলাম চলে যাবার আগে, কিছুতেই মনে করতে পারছি না। চারদিকে সবাই ভীষণ ব্যস্ত। কত ঘর, কত ল্যাবরেটরি, কতরকম জটিল কাচের যন্ত্রপাতি। আমি কিছুই চিনি না, কারুকে তেমন চিনি না। আমার পিএইচডি কি তাহলে আর কখনো হবে না?
ওই যে ডঃ সমাজপতি। কিন্তু উনি বললেন… কী যেন একটা বলে একটু হেসে চলে গেলেন।
তারপর ঘুম ভেঙে যায় হঠাৎ। মনে পড়ে, পিএইচডি তো শেষ করেছি সেই কার্বনডেলে। কোনো কিছু তো বাকী নেই।
শেষ এপ্রিলের, প্রথম মে মাসের প্রচণ্ড দাবদাহ কলকাতায়। তার মধ্যেই আমি ঘুরে ঘুরে বেড়াই। আমার নিজের দেশ, আমার নিজের শহর। উত্তর কলকাতায় সেই সর্পিল গলিগুলো। চণ্ডীবাড়ি স্ট্রীট আর তার শুরুতেই চণ্ডীমন্দির আর সেখানে সেই বিশাল জালার মতো ঢাক। তার সামনে প্যারীমোহন সুর লেন। সেখানে ইটের উইকেট পেতে ক্রিকেট খেলছে দশ বারো বছরের কতগুলো বাচ্চা ছেলে। আমি দাঁড়িয়ে পড়ে ছবি তুললাম। আমারই ছবি।
বাচ্চাগুলো বললো, “দাঁড়া দাঁড়া, পোজ দে একটু। কাকু ছবি তুলছে।”
তারপর শুরু করলো আবার তাদের খেলা।
সেখান থেকে আরো সরু গলি অবিনাশ ঘোষ লেনে ঢুকলাম। এখানে একটা বাড়ি ছিল। দুটো বাড়ি। পাশাপাশি। একটা রক। উড়িয়া রান্নার ঠাকুরদের মেস।
অবিনাশ ঘোষ লেন
আমি চুরানব্বই সালের তীব্র গ্রীষ্মের কলকাতা শহরে ঘুরে বেড়াই। উত্তর কলকাতায় বেশি। আবার ময়দানে যাই। মেট্রো সিনেমা ভেঙে ফেলা হচ্ছে। কলকাতা বদলে যাচ্ছে। আমি একটা কালো ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটতে শুরু করি। সবুজ শুনশান গড়ের মাঠ।
সেখানে আমি আসতাম। একটা আমার তিন মামার বাড়ি। এরা হলো আমার মায়ের জেঠামশায়ের তিন ছেলে। বড়মামা বীরেশ্বর, মেজোমামার কী যেন নাম ভুলে গেছি, আর ছোটমামা ভাস্কর। সেই যে ঘটিকাহিনিতে লিখেছিলাম এদের কথা। বীরেশ্বর মামার বইয়ের দোকান ছিল আমাদের স্কটিশ স্কুলের উল্টোদিকে – গ্রন্থ কুটির। তখন বাংলা বইয়ের দোকানের নাম বাংলা ভাষায় হতো। ভাস্কর মামা অবশ্য পাড়ার ফাংশানে মোহাম্মদ রফির গান গাইতো। মেজোমামার দুই যমজ মেয়ে। যমজ সন্তান কী ব্যাপার, জানতাম না। প্রথম এই বাড়িতেই জেনেছিলাম। ছাদের ওপর কীর্তন হতো। কীর্তনের রস প্রথম আস্বাদন করেছিলাম এই বাড়িতেই। লাল মেঝে। একটা টিয়াপাখি খাঁচায় ঝোলানো। আমার মামাতো দাদা বুবুদা, আর দিদি ইরাদি। এখনো তাদের সঙ্গে দেখা হয়। এরা আমার স্মৃতির সরণি। স্মৃতির সোপান।
গলির গলি তস্য গলি। এমন গলি যেখানে একজন মানুষের বেশি একসঙ্গে যাওয়া যায় না। আমার আবার সেখানেই বেশি ঘোরাফেরা। হয়তো মনের অসুখ। স্বপ্নগুলো যেমন হয়তো মনের নানা অসুখ। এই গলিগুলো আর এই স্বপ্নগুলো আমার মনের মধ্যে একটা বিশেষ জায়গা দখল করে আছে।
চেনা আলো
আমি চুরানব্বই সালের তীব্র গ্রীষ্মের কলকাতা শহরে ঘুরে বেড়াই। উত্তর কলকাতায় বেশি। আবার ময়দানে যাই। মেট্রো সিনেমা ভেঙে ফেলা হচ্ছে। কলকাতা বদলে যাচ্ছে। আমি একটা কালো ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটতে শুরু করি। সবুজ শুনশান গড়ের মাঠ। সেই প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেমায় দেখা পুকুরটা আর তার পাশে একটা ছত্রী, যেখানে দুপুরবেলা কতগুলো মার্কিনি হিপি নাচছিলো আর গাঁজা খাচ্ছিলো। তাদের কাছে একটা ঘুমন্ত গরিব আশ্রয়হীন লোক আর একটা গরু নাকি এনসিয়েন্ট সিভিলাইজেশন।
আমি এখন সেই মার্কিন মুলুকে নিজে থাকি।
আমি জানি ওরা কিছু না বুঝেই বলেছিলো। কিন্তু আমি এখন জানি আমার দেশ, আমার বাংলা, আমার ভারতবর্ষ আসল সভ্যতা।
আমার দেশ গরিব। আমার দেশ অনেক বদলে গেছে এই ন’টা বছরে।
চেনা চেনা হাসিমুখ
কিন্তু এই ঊনিশশো চুরানব্বইয়ের ভারতে ফিরে এসে এখনো আমি মনুষ্যত্বের সুবাস পাই।
আমি একটু শুয়ে থাকলাম সবুজ ঘাসের মধ্যে সেই শুনশান দুপুরে।
স্বর্গের পথে
তারপর কোণাকুণি হেঁটে পার হয়ে গেলাম ইডেন গার্ডেনের দিকে।
ময়দান প্রান্ত থেকে বল করতে ছুটে আসছেন রমাকান্ত দেশাই।
হো হো হো হো করে ওই জনতার গর্জন।
(আর দুই সংখ্যা পরে মেরিকামায়া এখনকার মতো শেষ হবে।)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
