
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৪৮
সেই যে জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন, “সে আগের জিনিসকে পাছে ও পাছের জিনিসকে আগে সাজাইতে কিছুমাত্র দ্বিধা করে না,” আমার জীবনকাহিনির গতিপ্রকৃতিও ঠিক সেই রকম। আমি ছবি আঁকি। আমার দেখা ছবি। আমার মতো করে জীবনকে দেখার ছবি। আমি ইতিহাস বই লিখছি না।
মহাকবি শুনিয়েছেন আশ্বাসবাণী। “বস্তুত তাহার কাজই ছবি আঁকা, ইতিহাস লেখা নয়।”
সুতরাং, বাঁধন ছেঁড়ার সাধন হবে। মা ভৈ রবে। এ’ও মহাকবিরই আশ্বাস। বন্ধন ছিঁড়ে ফেলা যাক।
দেশের বন্ধন অনেককাল আগেই ছিঁড়েছি। এই অলব্যানির গল্প লেখার সময়ে তখনই দেশ ছেড়ে চলে এসেছি আট বছর। এর মধ্যে প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদও এসেছে।
অলব্যানির মন্দিরে আমরা
প্রথম মৃত্যুসংবাদ এসেছিলো আমরা যখন কার্বনডেলে, সেই শেষ বছরটাতেই। মুক্তির যে কাকা, ফুলকাকু, দেশ থেকে চলে আসার সময়ে তাঁর পরিচিত দোকানে গিয়ে আমাকে গরম জামাকাপড় কিনে দিয়েছিলেন, যে কাকা ছিলেন সবচেয়ে প্রাণোচ্ছ্বল, যিনি বিয়েবাড়িতে গিয়ে অনাদর দেখে মুখের ওপর বলে দিতে পারতেন, “দাঁড়ান আমি ভালো পাঞ্জাবিটা পরে আসি, তারপর আমাকে হয়তো আপনাদের পোলাও কালিয়া একটু দেবেন,” সেই কাকা।
তাঁর ছিল একটা চায়ের দোকান। কাঠের বাক্সতে দার্জিলিং, শিলংয়ের চা রাখা থাকতো। হাওড়া শহরের বাইরে এক এঁদো গলি পেরিয়ে এক বাস রাস্তার ওপর ছিল তাঁর দোকান। সিপিএমের পার্টি অফিস দোতলায়। একতলায় ভট্টাচার্য্য টি মার্ট। কঠোর পরিশ্রমে এবং সৌজন্যমূলক ব্যবহারে দোকান একটু একটু করে লাভের মুখ দেখছিলো। কিন্তু বিধাতা অন্য ব্যবস্থা করেছিলেন।
এক ঘোর বর্ষার ভোরে রমেন্দ্রকুমার যখন দোকান খোলার জন্যে রাস্তায় বেরিয়ে এক হাঁটু জমা জলে পা দিয়েছেন, ওপর থেকে ছিঁড়ে পড়া হাই ভোল্টেজ বিদ্যুতের তারে তিনি এক মিনিটের মধ্যে তড়িৎস্পৃস্ট হয়ে মারা গেলেন। সিপিএম কিছুই করতে পারলো না। তাদের মিউনিসিপ্যালিটি, তাদের সরকারের বিরুদ্ধে সরকারি অভিযোগ রেকর্ড করতে রমেন্দ্রনাথের দাদা পার্টি হোল টাইমার সমরেন্দ্র রাজি হলেন না। কোনো ক্ষতিপূরণ তাঁরা পাননি। সংসার পড়লো ভয়ানক দুর্যোগে। রমেন্দ্রর দোকানই এখন হয়ে দাঁড়িয়েছিল সে পরিবারের খুঁটি। এক দাদা ধর্মঘটের নেতা। আর এক দাদা পূর্ব পাকিস্তান থেকে সবে পশ্চিমবাংলায় আসা উদ্বাস্তু, স্ত্রী পুত্রকন্যা সহ।
খবর আমরা পেলাম আমার শ্বশুরমশাইয়ের লেখা একটা হাওয়াই পত্রতে। এক লাইনের একটা খবর। “তোমারে একটি দুঃখের খবর দিই। তোমার ফুলকাকু গত মাসে এক দুর্ঘটনায় …” ইত্যাদি। ফুলকাকুর মেয়ের বয়স হয়তো তখন দশ। ছেলেটার বয়স পাঁচ।
খবর পেয়ে আমরা স্তব্ধ হয়ে আবার বসে থাকলাম আলো নিভিয়ে।
এরকম খবর আরো কত যে এসেছে এই মেরিকামায়া সাতকাহনের বছরগুলোতে।
আলো নিভিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম আমি আর মুক্তি ত্রিবান্দ্রমের সায়েন্স ইনস্টিটিউট থেকে দুটো সরকারি চাকরির নিয়োগপত্র পাবার পর। মেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন তার বয়স প্রায় ছয়। দেশ থেকে আর একটা দাদু আসবে, তাতেই সেই উৎফুল্ল। গত বছর কার্বনডেলে সেই মাত্র কয়েক মাসের জন্যে দাদু আর দিদা এসেছিলো, আর আনন্দে স্নেহে ভরিয়ে তুলেছিল তার আত্মীয়স্বজন, প্রিয়জন-বঞ্চিত শৈশব। কিন্তু তারা বড্ড তাড়াতাড়ি চলে গেলো আবার। এখন আবার এই দাদু আসবে।
আমাদেরও আজ পাঁচ বছর অসীম কষ্ট ও দারিদ্র্য সহ্য করার পরে একটা জীবিকা তৈরি হয়েছে। একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। আমার চাকরি। সে মাইনে যতই অকিঞ্চিৎকর হোক না কেন। আমি জন হেন্সকে বোঝাচ্ছি আমাকে গ্রীন কার্ড করিয়ে দেওয়ার জন্যে তাঁর সাহায্য কী ক্রিটিকাল! জনকে বেশি বোঝাতে হয়নি। তিনি নিজেই চান, পার্থ’র মতো একটা ছেলে যেন স্থায়ীভাবে আমেরিকায় বসবাসের সুযোগ পায়।
আমরা ভাবছিলাম, কী করবো এখন? দেশে ফিরে যাবার এতো বড় সুযোগ! পরামর্শ দেবারও কেউ নেই। তখন আমাদের আর বিশ্বদা-রেবেকা বৌদির শিকাগো ফ্যামিলির সঙ্গে আর তেমন যোগাযোগ নেই। কার্বনডেল শিকাগো থেকে বড্ড দূর, আগেও বলেছি। আমাদের গাড়ি তিনশো সাড়ে তিনশো মাইল যাবার মতো ছিলো না। যখন নিসান গাড়িটা হলো, তখন আমার পিএইচডির গবেষণা শেষ করা এবং থিসিস লেখার শিরে সংক্রান্তি। তার মধ্যে মুক্তির বাবা মা’কে দেশ থেকে আমেরিকায় নিয়ে আসার মতো একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। তার মধ্যেও একবার কোনো প্রকারে সময় বের করে ওদের নিয়ে গেলাম দু’দিনের জন্যে। দেখানো হলো মিশিগান লেক, দেখানো হলো উচ্চতম এক আকাশঝাড়ু ইমারত সিয়ার্স টাওয়ার। নিয়ে যাওয়া হলো সেন্ট লুইস শহরের সেই বিখ্যাত গেটওয়ে আর্চ দেখাতে, তারপর একটা ছুটির দিন বিভাস আর শুক্লার বাড়ি সেই অজ পাড়াগাঁ কেন্টাকির পাডুকায়। কিন্তু তখন আমি চাকরি পাওয়া তো দূরের কথা, পিএইচডি ডিগ্রীই পাইনি।
সেন্ট লুইস শহরের বিখ্যাত গেটওয়ে আর্চ
এখন আমাদের পরামর্শ দরকার। নির্ভেজাল, সৎপরামর্শ। যা কেবলমাত্র বিশ্বদার মতো লোকের কাছেই পাওয়া যায়। কিন্তু … কিন্তু … কিন্তু …
শেষ সিদ্ধান্ত তো নিজেদেরই নিতে হবে। সেই যে পঁচাশি সালে আমেরিকায় আসার পর প্রথম কয়েকটা মাসের ভীষণ টানাপোড়েন। মানসিক যন্ত্রণায় ছটফট করছিলাম, যখন বিশ্বদা এসে বললো, ভাই, ফিরে যেতে চাও, যাও। তোমার টাকা নেই টিকিট কেনার? টাকা আমি দিয়ে দেবো। কিন্তু ভেবে দেখো, এতো কষ্ট করে, এতো প্রচণ্ড পরিশ্রম করে আমেরিকায় পড়তে এসেছো। এই সুযোগ হাতছাড়া করবে? আর কি কখনো পাবে এমন সুযোগ?
সেবারেও দেশে ফিরে যাইনি। এবং যাইনি বলেই একদিন যা ছিল স্বপ্নের অতীত, আমেরিকার এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পুরস্কার সমেত ডক্টরেট ডিগ্ৰী লাভ করেছিলাম। না, আমার মা, আমার দিদিমা সে দিনটা দেখার জন্যে অপেক্ষা করে থাকতে পারেনি। কিন্তু আমি করেছি। শেষ হাসি হেসেছি গোরাচাঁদ বসু রোডের পেয়ারাবাগান মদের গলির রাস্তার রকে বসে আড্ডা দেওয়া আর ফুটবল ক্রিকেট খেলে বেড়ানো আমি বাবুয়া। পেরেছি তো? ফিরে গেলে কি পারতাম?
এবারেও ফিরে গেলাম না। অধ্যাপিকা লীলাবতীকে একটা এয়ার মেল চিঠি পাঠিয়ে জানিয়ে দিলাম, আপনার এই অসামান্য উপকার ও উদারতার জন্যে কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ। কিন্তু ব্যক্তিগত কারণে আমরা এখন দেশে ফিরতে পারলাম না। ভবিষ্যতে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ থাকবে, এই আশায় থাকলাম। আপনি আমাদের শ্রদ্ধাপূর্ণ নমস্কার জানবেন।
এমন মানুষও হয়? কোনো ইন্টারভিউ ছাড়া, অ্যাপলিকেশন ছাড়া নামকরা একটা রিসার্চ ইনস্টিটিউটে দুজনের দুটো স্থায়ী চাকরি হয়ে গেলো – সায়েন্টিস্ট ওয়ান আর সায়েন্টিস্ট টু গ্রেডে? মনেও নেই লীলাবতীকে আমাদের রেজুমে দিয়েছিলাম কিনা। বোধহয় দিয়েছিলাম। আর উনি আমাদের দেখেছিলেন খুব কাছ থেকে। আর উনি দেখেছিলেন দেশের প্রতি আমাদের তীব্র টান। সে টান এই প্রায় চল্লিশ বছরেও একটুও কমেনি।
কিন্তু স্বপ্ন একরকম, আর বাস্তব আর এক রকম। দেশের অবস্থা তখন কেমন, আমরা ভালো জানি না। যেতে পারিনি একবারও। কিন্তু আমেরিকায় প্রি-স্কুল থেকে, কিণ্ডারগার্টেন থেকে, একেবারে শিশু অবস্থা থেকে শিক্ষিকারা, টিচার্স এড’রা কীভাবে বাচ্চাদের দেখাশোনা করছে, পড়াচ্ছে, খেলতে নিয়ে যাচ্ছে, নানারকম ওয়ার্কশপ করাচ্ছে, এবং বাচ্চারা কীভাবে স্কুল নামক প্রতিষ্ঠানে ভয়ভীতিহীন ভাবে খোলা হাওয়ায় বড়ো হচ্ছে, তা আমরা নিজের চোখে দেখছি। আমাদের নিজেদের স্কুল জীবনের কথা, শাসন ও শাস্তির কথা, সিলেবাস নামক তোতাকাহিনির কথা বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে। সেই খাঁচায় আমাদের এই একমাত্র মেয়েটাকে আবার বন্দী করার জন্যে নিয়ে যাবো?
অলব্যানিতে মেয়ের নতুন বন্ধু কেটি গোল্ডস্টেন
আমাদেরও আজ পাঁচ বছর অসীম কষ্ট ও দারিদ্র্য সহ্য করার পরে একটা জীবিকা তৈরি হয়েছে। একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন। আমার চাকরি। সে মাইনে যতই অকিঞ্চিৎকর হোক না কেন। আমি জন হেন্সকে বোঝাচ্ছি আমাকে গ্রীন কার্ড করিয়ে দেওয়ার জন্যে তাঁর সাহায্য কী ক্রিটিকাল! জনকে বেশি বোঝাতে হয়নি। তিনি নিজেই চান, পার্থ’র মতো একটা ছেলে যেন স্থায়ীভাবে আমেরিকায় বসবাসের সুযোগ পায়। তিনি কথা দিয়েছেন, সব রকম সাহায্য করবেন। আমাদের এখন একটা ভালো ইমিগ্রেশন লইয়ার ধরতে হবে। সে খোঁজখবরও পাওয়া গেছে।
গ্রীন কার্ড হয়ে গেলে মুক্তি আর আমি দুজনেই মেয়েকে নিয়ে এদেশে পাকাপাকিভাবে থাকতে পারবো, আর যখন খুশি দেশে যেতে পারবো।
এই সময়ে ফিরে যাবো কী করে?
এই হলো আমাদের দেশে না ফিরে যাবার আসল গল্প। তাছাড়া, থিরুভানানথাপুরাম কোথায়, তা আমি বুঝতেই পারিনি। অনেক পরে জেনেছি, সে হলো আমাদের পরিচিত ত্রিবান্দ্রমেরই নতুন নাম। ভারত তখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আমরা অনেক, অনেক দূরে। তার খবর ঠিকমতো রাখি না।
বাবা এসেছেন কলকাতা থেকে। কিন্তু তিনিও জানতেন না, আর আমরাও জানতাম না, তিনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন ম্যালেরিয়া। যা আমেরিকায় হয় না, এবং আমেরিকার ডাক্তাররা সে রোগ ধরতেই পারেনি।
একজন তো বলেই দিলো, মনে হয় ক্যানসার। আহা, মার্কিন মেডিকেল বলে কথা!
দু-এক সপ্তাহ থাকার পরেই একদিন সকালে সুস্থ সবল জিতেন্দ্রনাথ হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন আমাদের শোবার ঘরের গদিটার ওপর। বমি হতে লাগলো। সঙ্গে প্রচণ্ড জ্বর।
ক্যানসার যে হয়নি, সে বিষয়ে নিশ্চিৎ হওয়ার জন্যে শেষ পর্যন্ত আমাদের বাঙালি ক্লাবের ডাক্তার রবীন চক্রবর্তীকে দেখানো হলো। রবীনদা এবং তাঁর স্ত্রী শোভাদি দুজনেই ডাক্তার। অলব্যানি থেকে আধঘন্টা ড্রাইভিং দূরত্বের অ্যামস্টার্ডাম নামক আরো ক্ষুদ্র শহরে তাঁদের বিশাল প্রাসাদের মতো বাড়ি। বাড়ির ভেতরে সুইমিং পুল, বাইরে বিশাল বাগান।
ডাঃ রবিন ও শোভা চক্রবর্তীর বাড়িতে
রবীনদা একটা ব্লাড টেস্ট করাতে বললেন। বললেন, “ম্যালেরিয়া মনে হচ্ছে।” আমরা বিশেষ ভাবে অর্ডার দিলাম সে পরীক্ষা যেন করা হয়।
কয়েক ডোজ মেফলোকুইন – যিনি কুইনিনের আধুনিক জাতভাই – পেটে পড়তেই বাবা চাঙ্গা হয়ে উঠলেন।
অলব্যানি ক্যাপিটল বিল্ডিং-এর সামনে বাবাকে নিয়ে ছবি
তাঁকে সুস্থ করে, এবং নিজেদের প্রায় হার্ট অ্যাটাক হয়ে যাওয়ার অবস্থা সামলে আমরা তাঁকে নিয়ে গেলাম নিউ ইয়র্ক শহরে বেড়াতে। তারপর একবার আমেরিকার রাজধানী ওয়াশিংটন। তারপর বস্টন। সেখানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় দেখে বাবা বললেন, “এ তো তীর্থস্থান।”
আর একটা জায়গায় যাওয়া বাকি আছে বাবাকে নিয়ে। তারপর তিনি দেশে ফিরে যাবেন।
(চলবে)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
