
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৪৬
নতুন জীবন শুরু হলো নিউ ইয়র্ক রাজ্যের রাজধানী অলব্যানি শহরে।
নতুন কাজ, নতুন সমাজ। মার্কিনি সমাজে দিনের আট ঘণ্টা – সকাল ন’টা থেকে বিকেল পাঁচটা। আর তারপর … পরিবারের সঙ্গে কয়েকটা ঘণ্টা সময় কাটানো।
মেয়ের বয়স এখন পাঁচ। তাকে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছে বাড়ির কাছেই ব্লু ক্রীক এলিমেন্টারি স্কুলে। হলুদ রঙের বাস আসে সকাল আটটায়।
নভেম্বর মাসের শেষ দিকে এসে পৌঁছেছিলাম এই ট্রাই-সিটি অর্থাৎ অলব্যানি-স্কেনেকটাডি-ট্রয় শহরে। তখনই এখানে রীতিমতো ঠাণ্ডা পড়ে গেছে। অমিতাভ চক্রবর্তীর বাড়ি পৌঁছে যখন আরো কয়েকটা বাঙালি ফ্যামিলির সঙ্গে পরিচয় হলো, তখন দীর্ঘ এক হাজার মাইল যাত্রাশেষে একে তো ক্লান্ত শরীর, তার ওপর উত্তর নিউ ইয়র্কের জমে ওঠা ঠাণ্ডা। দক্ষিণ ইলিনয়ের মৃদু আবহাওয়াতে শরীর মন কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে গিয়েছিলো এই কয়েকটা বছরে। আবার সেই ভীষণ শীত।
হাডসন নদীর তীরে হাডসন ভ্যালি শহরগুলি
বন্ধুরা হাসলেন। মনে করিয়ে দিলেন শীতাংশু ঘোষ, যিনি আমাকে এই অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের হদিশ দিয়েছিলেন।
“পার্থ, এখানে কিন্তু অনেক বরফ পড়বে। স্নো।” বলে, একটু হাসলেন। তখন কি জানতাম, স্নো পড়া মানে কী জিনিস!
হাডসন নদী সেই উত্তরের লেক শ্যাম্পলেন নামক হিমবাহ-হ্রদ থেকে যাত্রা শুরু করে এই ত্রি-জনপদের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে একটু একটু করে দক্ষিণে। ছোটো ছোটো শহর আর গ্রামের নিশ্চিন্ত নির্জনতার বুক চিরে উত্তর আর মধ্য নিউ ইয়র্কের ছবির মতো সুন্দর উপত্যকা আর তারপর ক্যাটস্কিল নামক অনুচ্চ ঘন সবুজ গিরিশৈল ভেদ করে শেষে গিয়ে পড়েছে সুবিশাল মহানগরী নিউ ইয়র্কে।
পথে পড়বে বিখ্যাত গায়ক-অ্যাক্টিভিস্ট পীট সীগারের বাসভূমি-কর্মভূমি ক্লিয়ারওয়াটার। এখানেই হয়েছিল তাঁর শেষ জীবনের আমার নদী, আমার জীবন আন্দোলন। হাজার হাজার নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়ে সামিল হয়েছিল দূষিত নদী হাডসন দূষণমুক্ত করার লড়াইয়ে। সে দূষণের ক্রিমিনাল আমাদের এই স্কেনেকটাডি নামক অর্ধমৃত শহরেরই একমাত্র কর্পোরেশন – বহুজাতিক মহাকর্পোরেশন জেনারেল ইলেকট্রিক। তাদের বিশাল কারখানার সমস্ত বর্জ্য পদার্থ তারা ঢেলে চলেছিল স্বচ্ছতোয়া নদীর বুকে। দু’পাশের বাসিন্দারা আক্রান্ত হচ্ছিলো ক্যানসার ও নানা ভীষণ রোগে। মাছ কিংবা সীফুড খেয়ে, কিংবা নদীর জল ব্যবহার করে। তারপর শুরু হলো অন্ততঃ এক দশকব্যাপী জলবায়ু ও পরিবেশ আন্দোলন পীট সীগার, উডি গাথরির ছেলে আরলো গাথরি এবং আরো বহু এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকটিভিস্টের নেতৃত্বে। শেষ পর্যন্ত ক্রিমিনাল মামলায় জেনারেল ইলেকট্রিক সরকারের সঙ্গে এক চুক্তিতে এসে কয়েকশো মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিয়ে রেহাই পেয়েছিলো।
১৯৭৫ সালে পিট সিগার। হাডসন নদীর তীরে পিসিবি (polychlorinated biphenyls) ডাম্পিং-এর প্রতিবাদে একদল শিশুকে গান শোনাচ্ছেন
এসব কথা অবশ্য আমি জেনেছি অনেক পরে। মনে হয় না অলব্যানির বাঙালি বা ভারতীয়দের কারুর কাছে এসব খবর আমি পেয়েছিলাম। দু একজন জানতো, যাদের নাম আমি এ স্মৃতিকথায় পরে বলবো। তাঁরা ছিলেন বলেই অলব্যানির সাত বছর সহনীয় হয়েছিল। না হলে… যাক সে কথা এখনকার মতো।
নিউ ইয়র্ক শহরে ঢোকার ঠিক আগে হাডসন দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়ে নগরীর একদিকে ইস্ট রিভার আর একদিকে সমান্তরাল ওয়েস্ট রিভার নাম নিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মনোরঞ্জনের নিমিত্ত। শেষকালে ম্যানহাটান নামক সরু এক দ্বীপ, যার অন্য নাম গমগমে নিউ ইয়র্ক সিটি – তাকে দু’পাশ দিয়ে আদর করে ওয়াল স্ট্রীটের গালে একটা চুমু খেয়ে আবার গিয়ে পড়েছে ব্রুকলিন-উপকূলের মোহানায়।
নিউ ইয়র্ক সিটিতে একবারই থেকে গিয়েছি এর আগে – সেই যখন এক মাসের জন্যে স্কলারশিপ নিয়ে সাদার্ন ইলিনয় থেকে ব্রঙ্ক্স বোটানিক্যাল গার্ডেনে রিসার্চের কাজ করতে এসেছিলাম। তখন স্বপ্নেও ভাবিনি, সেখানে আবার কখনো আসতে পারবো, থাকতে পারবো।
পঁচাশি থেকে বিরানব্বই – সাত বছর কেটে গেলো। এবারে নতুন বছর ঊনিশশো তিরানব্বই শুরু হচ্ছে। পয়লা জানুয়ারি, নববর্ষ। আমেরিকায় ইংরিজি নতুন বছর বিশেষ কোনো বার্তা নিয়ে আসে না। আমাদের মতো প্রাক্তন ঔপনিবেশিক দেশেই তার রমরমা বেশি। এখানে বহু মানুষ তাদের ঘরবাড়ি আলো দিয়ে সাজায়, সামনের লনে ফাদার ক্রিসমাসের শ্বেতশুভ্র মূর্তি ও তার কল্পিত রেন ডিয়ার-চালিত শকট। এদেশে ফাদার ক্রিসমাস পরিণত হয়েছেন সেন্ট নিকোলাস, এবং তার থেকে স্যান্টা ক্লসে। অলব্যানির বাসিন্দাদের সামনের ও পিছনের লন এই সময়ে তুষারাবৃত। মাঝে মাঝেই বাচ্চাদের তৈরি করা স্নো-ম্যান চোখে পড়ে।
এখনো সে মহানগর আমার অধরা। আমরা থাকি কলকাতা থেকে বেশ কিছুটা দূরে – বর্ধমান কিংবা বহরমপুর। নিউ ইয়র্ক থেকে অলব্যানির দূরত্ব প্রায় দেড়শো মাইল। বহুদিন পরে বহুবার সে দূরত্ব পাড়ি দিয়েছি – সেই ক্যাটস্কিল পাহাড় পার হয়ে। কিন্তু সে গল্পও এখনকার মতো তোলা থাক।
শীত শুরু হলো। কুচো কুচো বরফ তুলোর আঁশের মতো গাড়ির উইন্ডশিল্ডের ওপর উড়ে এসে পড়ে। মনে পড়ে যায় ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সেই প্রথম জীবনের কথা। সেই নভেম্বর মাসের শেষদিকে সেখানেও শুরু হতো তুষারপাত। একাকীত্ব আরো ঘন হয়ে বসতো কম্বল মুড়ি দিয়ে।
এদিকে নিউ ইয়র্ক স্টেট বায়োলজিক্যাল সার্ভেতে শুরু হলো আমার কাজ। জন হেন্সের তত্ত্বাবধানে সার্ভের মিউজিয়ামের তিনতলার সংগ্রহশালায় আমার ঘর। ঠিক সেই শিকাগো মিউজিয়ামের মতোই মডেল, যেখানে কার্বনডেল থেকে গিয়ে একবার গবেষণার কাজ করে এসেছি গ্রেগ মুয়েলারের কাছে। এখনও মনে পড়ে, গ্রেগ সাদরে গ্রহণ করেছিল আমাকে — বিশেষ করে আমিও তার মতোই এস আই ইউ’তে ওয়াল্ট সান্ডবার্গের ছাত্র বলে। শিকাগোর বিখ্যাত পিৎজা চেন উনো'তে নিয়ে গিয়েছিলো সন্ধ্যেবেলায় সহধর্মিণী বেটি স্ট্র্যাক আর আমাকে সঙ্গে করে। শীতের শিকাগোতেও ডিসেম্বর মাসে সেই দোকানের সামনের ফুটপাথে – অর্থাৎ আমেরিকার ভাষায় সাইডওয়াকে সর্পিল, লম্বা লাইন। ওয়াকি-টকির দিন তখন। ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে ওয়্যারলেস টেলিফোন হাতে উনোর ইউনিফর্ম পরা স্টাফরা – প্রতীক্ষারত ক্রেতাদের টেবিল খুঁজে দেওয়ার জন্যে। একতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় চলে গেছে সে লাইন। পুরো বাড়িটা ম-ম করছে পিৎজার চীজ আর ডো’এর গন্ধে।
বায়োলজিক্যাল সার্ভে ও নিউ ইয়র্ক স্টেট মিউজিয়ামের বাড়ি। এখানেই প্রথম পোস্ট ডক্টোরাল ফেলোশিপ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম।
গ্রেগের কাছে কাজ করতে আসতো একটা হাই স্কুলের মেয়ে। এক বিশেষ শ্রেণীর মাশরুমের ওপর মলিকুলার বায়োলজির প্রয়োগ করে সে বিবর্তনধারার বৃক্ষ, যাকে ইংরিজিতে বলে এভোলিউশনারী ট্রি – তার বর্ণনা করে ফেললো। এবং সারা আমেরিকার হাই স্কুল স্টুডেন্টদের ইন্টেল রিসার্চ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে কয়েক হাজার ডলার পুরস্কার পেলো। গ্রেগ আলাপ করিয়ে দিলো মেয়েটার সঙ্গে। হাসিখুশি, ফুর্তিবাজ মেয়ে। কে বলবে, বিজ্ঞানী হতে চলেছে সে!
শিকাগো মিউজিয়ামের মডেলেই এই অলব্যানির স্টেট মিউজিয়াম। নীচের একতলায় বিরাট হলঘর। না, সেখানে শিকাগো বা নিউ ইয়র্কের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের মতো সুবিশাল ডাইনোসরের কঙ্কাল রাখা নেই দর্শনার্থীদের জন্যে। কিন্তু দ্রষ্টব্য আরো অনেক কিছু আছে। উদ্ভিদ, প্রাণী, মাছ, অক্টোপাস, ছত্রাক, পাখি, প্রজাপতির আলাদা আলাদা ঘর। তিনতলায় আমরা সেসব স্পেসিমেনের রক্ষণাবেক্ষণ করি, রিসার্চ করি।
জন এখানে ছত্রাক বিভাগের স্থায়ী কিউরেটর। আমি তার পোস্ট-ডক্টরাল অ্যাসিস্টেন্ট। প্রজাপতি ও পতঙ্গ বিভাগের কিউরেটর এক স্মিতভাষী যুবক, তার নাম টিমোথি ম্যাককেব, সংক্ষেপে টিম। আমার সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। টিমের ল্যাবে চারদিকে কাচের চ্যাপ্টা টেবিলের ভেতরে আলপিন দিয়ে অসংখ্য জেনাস ও স্পিসিসের প্রজাপতি সংরক্ষণ করা। আর তার গায়ে লাগানো বৈজ্ঞানিক নাম ও ফ্যামিলির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লেবেল।
ডঃ জন হেন্স (বসে বাঁদিকে), যাঁর কাছে আমেরিকার প্রথম আসল চাকরি শুরু করেছিলাম
আর বন্ধুত্ব হলো ডিপার্টমেন্টের স্থায়ী রিসার্চ অ্যাসিস্টেন্ট লোরিন্ডা, অর্থাৎ লোরির সঙ্গে। এবং বায়োলজিক্যাল সার্ভের আর্টিস্ট প্যাট্রিসিয়া বা প্যাট। বহুকাল পর্যন্ত প্যাট এবং লোরির সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থেকেছে। ওরা নিউ ইয়র্ক শহরেও আমাদের বাড়ি এসেছে, আমরা গিয়েছি ওদের বাড়ি। আমি নিউ ইয়র্কে চলে আসার পর মুক্তি এক সময়ে মাসখানেকের জন্যে মেয়েকে নিয়ে থেকেছে প্যাটের অলব্যানির বাড়িতে।
এই ডিপার্টমেন্টে প্রায় সবাই স্থায়ী স্টাফ, বৈজ্ঞানিক। সবাই নিউ ইয়র্ক স্টেট গভর্ণমেন্টের সায়েন্টিফিক অফিসার। কেউ বোটানির, কেউ জুলজির, কেউ হয়তো মস ফার্নের বিশেষজ্ঞ, কেউ বা প্রত্নতত্ত্বের। আর কয়েকজন সেক্রেটারি। আমিই বোধহয় সেখানে একমাত্র দু বছরের পোস্টডক নিয়ে এসেছি। সবাই জানে, আমি অস্থায়ী। তাও, লাঞ্চের সময়ে একটু গল্পসল্প হয়। ইন্ডিয়া সম্পর্কে জানার আগ্রহ আছে কয়েকজনের। বাকীদের নেই। মার্কিন মিডিয়া কখনো ভারত বা অন্য দেশের কথা বলে না। আগ্রহ তৈরি করার কোনো চেষ্টাই এদেশের সিস্টেমের নেই। যারা জানতে চায়, তারা হয়তো অন্য কোনো দেশে গিয়ে থেকে এসেছে যুদ্ধের কারণে, বা অন্য কোনো কারণে। এছাড়া, সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে পৃথিবীর সম্পর্কে ধারণা মিডিয়াতে যা শোনে, বা পড়ে, তার বাইরে কিছু নেই।
গত বছর বিরানব্বইতে মুক্তির মা বাবাকে নিয়ে এসেছিলাম তিন মাসের জন্যে আমাদের সেই ফেলে আসা কার্বনডেলে। দেশে যাওয়া আমাদের পক্ষে এখনো ঠিক সম্ভব হচ্ছে না। গ্রীন কার্ড ছাড়া দেশে যাওয়া রিস্কি। সেই একবার ক্যানাডাতে গিয়ে ভিসা পাওয়ার চেষ্টা করেও সফল হইনি।
মুক্তির বাবা-মা দেশে ফিরে যাচ্ছেন, সেন্ট লুইস এয়ারপোর্টে
পঁচাশি থেকে বিরানব্বই – সাত বছর কেটে গেলো। এবারে নতুন বছর ঊনিশশো তিরানব্বই শুরু হচ্ছে। পয়লা জানুয়ারি, নববর্ষ। আমেরিকায় ইংরিজি নতুন বছর বিশেষ কোনো বার্তা নিয়ে আসে না। আমাদের মতো প্রাক্তন ঔপনিবেশিক দেশেই তার রমরমা বেশি। এখানে বহু মানুষ তাদের ঘরবাড়ি আলো দিয়ে সাজায়, সামনের লনে ফাদার ক্রিসমাসের শ্বেতশুভ্র মূর্তি ও তার কল্পিত রেন ডিয়ার-চালিত শকট। এদেশে ফাদার ক্রিসমাস পরিণত হয়েছেন সেন্ট নিকোলাস, এবং তার থেকে স্যান্টা ক্লসে। অলব্যানির বাসিন্দাদের সামনের ও পিছনের লন এই সময়ে তুষারাবৃত। মাঝে মাঝেই বাচ্চাদের তৈরি করা স্নো-ম্যান চোখে পড়ে। সব পার্টি, সব আলোকসজ্জা মোটামুটি ক্রিসমাসের পরেই শেষ। নতুন বছর আসে অপেক্ষাকৃত শান্তভাবে। বাড়িতে বাড়িতে হয়তো ছোটো ছোটো পার্টি, আর নয়তো অবস্থাপন্ন পরিবারগুলো বেড়াতে চলে গেছে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছে – কেউ ফ্লোরিডা, কেউ ক্যালিফোর্নিয়া, কেউ টেক্সাস – অর্থাৎ উষ্ণ আবহাওয়ায়।
অলব্যানি, স্কেনেকটাডি, ট্রয় ঘুমিয়ে আছে। দোসরা জানুয়ারি থেকেই শুরু হয়ে যাবে আবার অফিস যাত্রা। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি অবশ্য ঘুমিয়ে থাকবে আরো দু এক সপ্তাহ। হাডসন নদী এই সময়ে একেবারেই বরফের মোটা কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে থাকে – নিস্তরঙ্গ, নিশ্চল। তার স্রোত একটু একটু করে আবার শুরু হবে সেই এপ্রিল মাসের শেষের দিকে, বা হয়তো মে মাসে।
বাবাকে এবারে দেশ থেকে নিয়ে আসার প্রস্তুতি চলেছে। এপ্রিল মাসের শেষের দিকে তিনি এসে পৌঁছোবেন আমাদের ল্যাথাম ভিলেজে। ভিসা করানো হয়ে গেছে কলকাতায়। ফোন করে আমরা যথাসম্ভব মানসিকভাবে প্রস্তুত করে দিচ্ছি বাবাকে। বলে দিচ্ছি এখানে কিন্তু এপ্রিল, মে, এমন কি জুন মাসেও দেশের শীতকালের মতো শীত। কলকাতার শীত নয়। পাটনা, বেনারস, দিল্লির মতো শীত।
এভাবেই মোটা বরফের চাদরে ঢেকে থাকে অলব্যানি, স্কেনেকটাডি, ট্রয়
কিন্তু মার্চ মাসে একেবারে শেষের দিকে ঐতিহাসিক তুষারপাত হলো। মনে আছে, যখন ভাবছি শীতটা এবারের মতো বোধহয় শেষ হতে চলেছে, ঠিক তখনই এক বা দুদিন ধরে ছাব্বিশ ইঞ্চি বরফ পড়লো একটানা। আমাদের গাড়ি, আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের সামনের জমিটা, আমাদের বাড়িতে ঢোকার দুটো তিনটে সিঁড়ি সবকিছু বিশাল বরফে একেবারে ঢেকে গেলো। মার্চ মাসে এই বিপুল তুষারপাত এখানকার লোকেরাও তেমন বেশি দেখেনি।
প্রকৃতিদেবী আর একবার আমাদের সঙ্গে রসিকতা করলেন। জানিয়ে দিলেন, আমাদের সংগ্রাম বাঁচার সংগ্রাম এখনো মোটেই শেষ হয়নি।
(চলবে)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
