মেরিকামায়া সাতকাহন : গ্রাম্য ইলিনয় ছেড়ে “আসল আমেরিকার” সঙ্গে পরিচয় হবে এবার

ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ৪৪

উঁচু থেকে নিউ ইয়র্ক স্টেটের রাজধানী অলব্যানি’র রূপ

ত্রয়শ্চত্বারিংশ পর্বের পর

নিউ ইয়র্ক রাজ্যের রাজধানী অলব্যানি। তখনও ইন্টারনেট আসেনি। গুগল হোয়াটস্যাপ ফেসবুক স্কাইপ সুদূর ভবিষ্যতের গর্ভে।

তাও, খুঁজে খুঁজে অলব্যানি জায়গাটা কেমন দেখার জন্যে বোধহয় ট্রিপল-এ নামক ট্যুরিস্ট ম্যাপ কোম্পানির সাহায্যপ্রার্থী হয়েছিলাম। কার্বনডেলে তাদের অফিসে গিয়ে সংগ্রহ করলাম কিছু ছাপানো ফটো। দেখলাম, বিরাট বিরাট কয়েকটা বাড়ির ছবি। গ্রাম্য দক্ষিণ ইলিনয় আর তার চারপাশের অ্যানা-জোন্সবরো, মুনমুনদের পশ্চিম টেনেসীর জ্যাকসন, আর বিভাস-শুক্লাদের কেন্টাকি দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম শহর কলকাতার আমি।

তাই অ্যাটলানটা থেকে যখন অ্যানোফিলিস মশার ওপর ট্যাক্সনমি আর এভল্যুশন গবেষণা করার জন্যে ডঃ আলতাফ প্রস্তাব করলেন ফোনে, সেখানে যাবার লোভ হয়েছিল খুবই। ওহ, ভেবেছিলাম, অত বিশাল এক শহরে থাকার সৌভাগ্য হবে। এই অজ পাড়াগাঁ থেকে মুক্তিলাভ ঘটবে। “আসল আমেরিকার” সঙ্গে পরিচয় হবে এবার। যদিও আসল আমেরিকা ব্যাপারটা যে কী, সে সম্বন্ধে কোনো ধারণাই তখনো হয়নি।

আর নিউ ইয়র্ক? রবীন্দ্রনাথের গান চুরি করে বলতে পারি, নিউ ইয়র্ক তখন ছিল “কে জানিত আসবে তুমি গো অনাহূতের মতো।” নিউ ইয়র্ক? সেই একবার গিয়েছিলাম বোটানিক্যাল গার্ডেনে রিসার্চ করতে গিয়ে। সেই এক মাস থাকা, প্লেনে করে সেন্ট লুইস থেকে নিউ ইয়র্কের বিমানবন্দরে নেমে প্রায় হারিয়ে যাবার অবস্থা। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো সাবওয়ে চেপে আর পায়ে হেঁটে।

আমার ছোট্ট মেয়ে কখনো এক মাস ধরে আমার অনুপস্থিতি অনুভব করেনি। মাঝে মাঝেই ফোন করতো, আর জিজ্ঞেস করতো, “বাবা, কবে আসবে?”

একবার তার কিণ্ডারগার্টেন ইস্কুল থেকে ফিরে তার মা’কে বললো, “আজকে বাবা নিউ ইয়র্ক থেকে ফোন করেছিল আমাকে স্কুলে।”

মুক্তি তো অবাক। “সত্যি?”

আমাকে নিশ্চয়ই ভীষণভাবে মিস করে, সে ভাবলো। তাই থাকতে না পেরে মেয়ের ইস্কুলেই ফোন করে বসেছে।

কিন্তু তার পরদিন মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে জানতে পারলো, পুরোটাই বানানো। মেয়ে কল্পনা করেছে বাবা ফোন করেছে, আর বাবা চলে আসবে এবার নিউ ইয়র্ক থেকে। চাইল্ড সাইকোলজি আমরা কত কম বুঝি!

অলব্যানিতে এসে এখন আবার এক মাস থাকতে হবে জন হেনসের বাড়িতে। উষ্ণ, অতিথিপরায়ণ জন। সর্বদা হাস্যমুখ, কিছুটা আদুরে আদুরে, একটু ফ্যাঁসফ্যাঁসে কন্ঠস্বর। একমুখ কাঁচাপাকা দাড়ি কিন্তু স্টাইলিশ, একটু বাবরি মতো কাঁচাপাকা চুল। বয়স হবে পঞ্চাশ কি পঞ্চান্ন। 

অলব্যানি শহরের স্থাপত্য

খুব তাড়াতাড়ি আবিষ্কার করলাম, জন এবং তার বৌ দুজনেই ভারতীয় রান্নার সমঝদার এবং গুণগ্রাহী রসিক। আমাকে তার বাড়িতে রাজার হালে রেখেছিলো। কিন্তু অলিখিত শর্ত হলো, মাঝে মাঝে আমাকে একটু স্পাইসি ইন্ডিয়ান ডিশ রেঁধে খাওয়াতে হবে। অবশ্য, না রাঁধলেও ওরা কিছুই মনে করতো না। আমার খুব ভালো লাগে তখন রান্না করতে। আর ওদের বিশাল রান্নাঘর, এলাহী আয়োজন। বেস্ট কোয়ালিটি চিকেন অপর্যাপ্ত নিয়ে এলো জন আমাকে নিয়ে গিয়ে সুপারমার্কেট থেকে। রোদে শুকোনো অরগ্যানিক টমেটো। তার সঙ্গে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের হাজার রকম মশলা। আপেল, নাসপাতি, খেজুর, কিসমিস চারদিকে ছড়ানো।

ওরা খেতে খুব ভালোবাসে, কিন্তু ইন্ডিয়ান রান্নার এবিসিডি কিছুই জানে না। আমার হাতের রান্না খেয়ে ওরা তো শুধু নাচতেই বাকি।

জন হেনসের বাড়ি ডিনারে। সঙ্গে তাঁর মেয়ে, এবং সামনে আমার শিশুকন্যা

জনের বাড়িতে থাকে আশ্রিতা এক শ্বেতাঙ্গ মার্কিনি যুবতী। একেবারে নিজের মেয়ের মতোই থাকে। তার সঙ্গে এসে একদিন জুটলো জনের দুই মেয়ের এক মেয়ে। সে তখন অনেক দূরের কোনো কলেজে পড়ে, আর থ্যাংক্সগিভিং ক্রিসমাসের সময়ে বাড়ি আসে। আমি অক্টোবর মাসের শেষ থেকে বোধহয় ডিসেম্বর মাসের গোড়া পর্যন্ত ওদের বাড়ি ছিলাম। সুতরাং সেবারে থ্যাংক্সগিভিং ডিনার জনের বাড়িতেই কাটলো। আমেরিকার চিরাচরিত টার্কি ডিনার, তার সঙ্গে পামকিন পাই, ক্র্যানবেরি সস, ম্যাশড পটেটো, রেড ওয়াইন ইত্যাদি।

জন আমাকে বললো, “আমার মেয়েটা এমনিতে খুব ভালো। কিন্তু এক্সট্রা কিছু টাকা রোজগারের জন্যে বারে ড্যান্স করে।”

আমি ততদিনে আমেরিকা সম্পর্কে একটু জ্ঞানলাভ করেছি। নরমাল ব্লুমিংটনের সেই ইডিয়ট আমি তখন আর নেই।

আমি বললাম, “তাতে কী হয়েছে?” আহা, যেন কত উদারপন্থী আমি! বারে নাচে তো কী হয়েছে? আমিও তো … ইয়ে …

জন ওর স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে একটু দ্বিধাগ্রস্তভাবে বললো, “আসলে, ও একটা ন্যুড বারে নাচে। আমি আর কী বলবো বলো, অ্যাডাল্ট মেয়ে।”

আমার উদারপন্থা হঠাৎ একটা হেঁচকি তুলেই থেমে গেলো।

আমি বললাম, “ওঃ, ইজ দ্যাট সো?” মন দিয়ে আপেল কাটতে লাগলাম রান্নাঘরে গিয়ে।

অথচ, জ্যানেট অর্থাৎ জনের সে মেয়ে কিন্তু আমাদের মধ্যবিত্ত বাঙালি ভারতীয় সংজ্ঞায় যাকে বলে খারাপ হয়ে যাওয়া, মোটেই তা হয়নি। একেবারে স্ট্রেটফরওয়ার্ড একটা শিক্ষিতা মেয়ে। হয়তো কুড়ি বাইশ বছর বয়েস। মায়ের সঙ্গে গল্পসল্প করে। আমি ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়াতে কাপ ডিশ ধুতাম, খাবার সার্ভ করতাম। দু একবার অতি কম মজুরিতে শ্বেতাঙ্গ বৃদ্ধবৃদ্ধাদের বাড়ির লনের ঘাসও কেটে দিয়েছি। 

তা, আমি যদি সে কাজ করতে পারি, জ্যানেট ন্যুড বারে নেচে একটু বেশি পয়সা রোজগার করতে পারবে না কেন?

ঢলাঢলি হয়না যে তা নয়। কিন্তু আইনকানুন খুব কড়া। কেউ কোনো মেয়েকে স্পর্শ করতে পারবে না। মাতলামি করে অশ্লীল আচরণ করলে বার থেকে বার করে দেবে। এখন এসব ব্যাপার আমাদের কলকেতা শহরের এঁদো গলিতেও লোকে জানে। বাউন্সার নিয়ে ঘুরে বেড়ায় গায়িকা আর নর্তকীর দল। কিন্তু আমাদের সময়ে তা আমাদের মতো ফ্যামিলির ছেলেদের কাছে স্বপ্নের অতীত ছিল।

অলব্যানিতে দিনগুলো কাটতে লাগলো। খুব শীঘ্রই আবিষ্কার করলাম, উত্তর নিউ ইয়র্কের এই প্রায়-ঘুমন্ত শহরে রবিমামা গায়ে রাঙা জামা নয়, গ্রে রঙের কম্বল মুড়ি দিয়ে হামা দেন বছরে ছ মাস। সেই রামায়ণের কুম্ভকর্ণের মতোই।

তা, তিনি একটু একটু করে ঘুমোতে শুরু করেছেন নভেম্বর মাসের শুরুতেই। ভোরবেলা ঘুম থেকেই উঠেই বুঝতে পারি, হিমশীতল আইসক্রীম চারদিকে। অনেকটা সেই ছোটবেলার মুজাফফরপুরের মতোই। জুতো পরে তবে মেঝেতে পা ফেলা। শিকাগোর বিশ্বদার বাড়ির মতোই। মাঝে চার সাড়ে চার বছর কার্বণ্ডেলের মৃদু আবহাওয়ায় থেকে অভ্যেস খারাপ হয়ে গিয়েছিলো আর কী। আবার সেই শুন্য ডিগ্রীর এ বুকে প্রাণপাখি মোর ফিরে আয় ফিরে আয়। বাড়ি থেকে বেরোলেই দাঁতের বাদ্যি হিহিহিহি।

জনের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট। আমার চা, ওর কফি। তারপর আমি আমার বিশাল ধড়াচুড়ো, আর জন তার ক্যাজুয়াল বাদামি লেদার জ্যাকেট, মাথায় টুপিটা পর্যন্ত নেই। ওর ডিজেল গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে একটু পরেই সানুনাসিক নিউ ইয়র্ক অ্যাকসেন্টে আমাকে ডাকে, “হে পার্থা, আর ইউ রেডি?”

আর রেডি! রেডি না হয়ে উপায় আছে? একে তো চাকরির জায়গায় বস, তার ওপর গৃহস্বামী। ওর বৌ সাইকোলজিকাল কাউন্সেলর। সে তার নিজের গাড়ি চালিয়ে চলে যাবে প্রতিদিন সকালে প্রায় দেড় ঘণ্টা দূরে উডস্টকের অফিসে। হ্যাঁ, জন জানালো, এই সেই বিখ্যাত ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের পীঠস্থান উডস্টক।

এদিকে মাথার মধ্যে চিন্তা, এখানে তো বেশ কাটছে, কিন্তু ওদিকে সাদার্ন ইলিনয়ের গ্রামে বসে আছে আমার বউ আর মেয়ে। তাদের এবারে এখানে নিয়ে আসতেই হবে। নতুন বাড়ি ঠিক করতে হবে, আমাকে একবার যেতে হবে, তারপর সব জিনিসপত্র পাততাড়ি গুটিয়ে এভারগ্রীন টেরেসের স্টুডেন্ট অ্যাপার্টমেন্ট ইউনিভার্সিটির হাতে জমা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে সেই সুদূর কার্বনডেল থেকে এই অলব্যানিতে ফ্যামিলিকে নিয়ে আসতে হবে। এবারে আর সেই গর্ডন নেই যে সঙ্গে সঙ্গে আসবে পৌঁছে দিতে।

তাও করতে হলো। সব কিছুই করতে হয়। যখন করি, তখন বুঝি না কী অসাধ্যসাধন করছি। অনেক পরে বুঝি, যখন পিছন ফিরে তাকাই।

আমাদের মেয়ের আর একটি জন্মদিন পালন হলো এভারগ্রীন টেরেসে – তার বন্ধুদের সঙ্গে।

করলাম। জনের কাছে এক সপ্তাহের ছুটি নিয়ে ফিরে গেলাম আবার সেই অ্যামট্র্যাক ট্রেনে করে। কয়েকজন বন্ধু একটু সাহায্য করেছিল নিশ্চয়ই বাড়িটাড়ি পরিষ্কার করে দিতে। ঠিক যেমন আই এস ইউ থেকে চলে আসার সময়ে অনেক হেল্প করেছিল সুনীতা বসু, বিপুল সোলাঙ্কি, মীনা, আরো কয়েকজন। কোরিয়ার বান্ধবী জিন সুন্ হান। থাইল্যাণ্ডের বান্ধবী কানিনিত। আরো কয়েকজন। এই নামগুলো আবার একবার বললাম, কারণ আর তো কখনো বলা হবে না। এই স্মৃতিমধুর দিনগুলো এবারে একেবারেই শেষ।

মনে আছে, চলে আসার দিন নাসীম ভোরবেলায় এসেছিলো গরম কফি নিয়ে শেষ দেখা করতে। আমাদের তখন বাক্সবন্দী সবকিছু।

আমার মেয়ে নন্দিনী ও নাসীমের মেয়ে নাইরীন। ওদের জন্মদিন একই দিনে, একই বছরে।

নাসীম অনেকক্ষণ আমাদের সঙ্গে বসেছিল শোবার ঘরের মেঝেতে। খালি বাড়ি। কিছু কিছু জিনিস পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে মুভিং কোম্পানির মারফৎ। সে বিলাসিতা করার ক্ষমতা তখন আমাদের হয়েছে।

তারপর আমাদের সেই অর্ধ-নতুন নিসান গাড়িতে স্টার্ট।

আমাদের নিসান সেন্ট্রা গাড়ি

এবারে সত্যিই চোখের কোলে জল এসে পড়েছিল, স্পষ্ট মনে আছে।

(চলবে)

*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।

ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।

‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। 

Developed by DXDasia