
ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমেরিকা-জীবন এবং স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন – পর্ব ২১
আইএসইউ মিউজিয়াম
ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি ছেড়ে চলে এলাম চিরকালের মতো।
এই ডিপার্চার এ জীবনে চিরকাল চলেছে। কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়া, দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া, আবার আমেরিকায় এসেও এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় চলে যাওয়া। ধর্মান্ধতা ও ঘৃণার রাজনীতি ছেড়ে উদারনৈতিক জীবনে নতুন পদক্ষেপ। কলকাতায় ফিরতে পেরেছি হয়তো কিছুটা। কিন্তু সত্যিই কি সেরকম ভাবে ফিরতে পেরেছি? এ এক যন্ত্রণাময়, জটিল গল্প।
সে গল্পই বলার চেষ্টা করে যাচ্ছি এই জীবনকাহিনিতে।
আমেরিকাতে চলে আসার পরে সব মিলিয়ে দশ বারোবার জায়গা বদল করতে হলো। হয়তো আজকের পৃথিবীর আধুনিক জীবনযাত্রায় এ ডিপার্চার নতুন নয়, হয়তো আজকের দিনে এটাই স্বাভাবিক, এমনকী অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু আমি বলছি তিরিশ পঁয়ত্রিশ বছর আগের কথা। মাত্র তিন দশক আগেও পৃথিবীটা, বিশেষ করে আমাদের দেশের মানুষের জীবন এতো স্থায়িত্বহীন ছিল না। দেশভাগ হওয়ার আগে তো একেবারেই ছিল না। একটা স্থিতিশীলতা ছিলই। কলকাতার মানুষকে যদি কোনো কারণে বর্ধমান চলে যেতে হতো, তাহলেই মাথায় বাজ ভেঙে পড়তো সকলের। যশোর থেকে খুলনা চলে গেলে বাড়িতে শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হতো।
আর আমরা? চরৈবতি শব্দের যেন এক নতুন সংজ্ঞা।
কতজনকে, কত স্মৃতিকে চিরকালের মতো ফেলে এলাম সেই ছোট্ট, ঘুমন্ত শহর নরমাল-ব্লুমিংটনে। ওই আড়াই বছরেই কত বন্ধু – আত্মীয়ের মতো হয়ে গেছে যারা। বিশ্বদা, রেবেকা বউদি আর তাদের বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলো তো আছেই। আই এস ইউ ছেড়ে চলে আসার পরে কতকাল তাদের সঙ্গে আর দেখাই হয়নি! অন্ততঃ পাঁচ সাত বছর। দেখা হলো আবার সেই যখন মুক্তির বাবা-মা একবার আমাদের এখানে বেড়াতে এলেন। সে গল্প পরে বলা যাবে। গল্পই বটে!
ফেলে এলাম আমাদের খুব বন্ধু হয়ে ওঠা সেই মীনা আর জোনাথনের পরিবার, আমাদের অ্যাসিস্ট্যান্ট লাইব্রেরিয়ান বান্ধবী ক্রিস্টিন, মুক্তির সেই জীবনসংকটের সময়ে যে কত উপকার করেছিল। উপকার করেছিল ডঃ শারদ ও তাঁর স্ত্রী সুনীতি চিৎগোপেকার ফ্যামিলি, যাঁদের বাড়িতে মুক্তি আমাদের ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে আট দশদিন ছিল সেই জীবনসংকটের পর। তাদের সঙ্গে কোনোদিন আর দেখাই হল না। দেখা আর হল না কখনো আমার হোস্ট ফ্যামিলি ডঃ রবি কাটুর ও তাঁর স্ত্রী রাধার সঙ্গে। ফেলে এলাম আমার বন্ধু হয়ে ওঠা কয়েকটা দারুণ ভালো ছাত্রছাত্রী আর সহকর্মীকে – লিসা স্মিড, আয়েন ভ্যান্ডেনব্রুক, মার্জোরি, জেনিফার, লিণ্ডা, ডনা, কানিনিত, লা-অ, জিন সুন্ হান, আরো কত নাম। ফেলে এলাম সুনীতা, সৌমিত্র, রঞ্জন, গোবিন্দা, মূর্তি, আবু হায়দার, বিপুল সোলাঙ্কি, প্যালেস্টাইনের সেই বন্ধু মোহাম্মদ যে তার দেশের দুঃখের গল্প আমাকে বলে শোনাতো। যে প্রথম আমাকে প্যালেস্টাইন-জর্ডান-ইজরায়েল রাজনীতি সম্পর্কে আমাকে পাঠ দিয়েছিলো। বলেছিলো, তাদের প্যালেস্টাইনের আর কোনো সরকারি অস্তিত্ব নেই – তারা জর্ডানের পাসপোর্ট ব্যবহার করে। অদ্ভুত লেগেছিলো শুনে!
আমাদের রুমমেট ইথিওপিয়ার আবাবা, যে আমাকে কখনো স্যার ছাড়া অন্য নামে ডাকেনি। বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের প্রফেসরদের মধ্যে যাঁদের চিরকাল মনে থাকবে, সেই রজার অ্যান্ডারসন, ম্যাথু নাডাকাভুকারেন, নতুন আসা যুবক অধ্যাপক স্টিভ জুলিয়ানো যার কমিউনিটি ইকোলজি ক্লাস নিতে গিয়ে আর একবার অসুস্থ হয়ে পড়বার উপক্রম হয়েছিল কিন্তু এবারে লড়ে গেছি আর ছেড়ে দিয়ে পালিয়ে যাইনি। পক্ষীতত্ত্ববিদ ডঃ থমসন, সেই ফিল্ম অধ্যাপিকা ক্যাথি গাইস্ট।

স্টিভ জুলিয়ানো
আর কখনো দেখা হলোনা আমার ড্রাইভিংয়ের প্রথম শিক্ষিকা সেই লিসা হ্যারিসকে, ওয়াকার হলে একসঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করা বান্ধবী স্যারা ক্যাথরিন। আর ভুলে যেতে পারি না আমাদের আই এস ইউ’এর ছোট্ট মিউজিয়ামে আমাকে একটা নিশ্চিন্ত কাজ দেওয়া কর্মাধ্যক্ষ হাসিমুখের বন্ধুর মতো অ্যাবিকে। তার সঙ্গে কত গল্প করেছি ভারত নিয়ে, কলকাতা নিয়ে। কখনো মনে হয়নি সে আমার বস, আর আমি তার স্টুডেন্ট ওয়ার্কার। ন্যূনতম মজুরির থেকে একটু বেশি দিতো আমাকে। আমিও মনের সুখে ক্যাম্পাস থেকে একটু দূরে অ্যাডলাই স্টিভেনসন হলে বসে গল্পের বই পড়তাম, আর কদাচিৎ কোনো ভিজিটর এলে তাকে মিউজিয়াম ঘুরিয়ে দেখতাম। মিউজিয়াম মানে পুরোনো দিনের আমেরিকার পোশাক কেমন ছিল, বিয়ে কেমন করে হতো, পুরোনো গাড়ির ছবি, প্রগতিশীল ডেমোক্রেটিক পার্টির পঞ্চাশের দশকে এই এলাকার জননেতা অ্যাডলাই স্টিভেনসনের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ডোয়াইট আইজেনহাওয়ারের কাছে পরাজয়ের সংরক্ষিত ভিডিও, এইসব।

অ্যাডলাই স্টিভেনসন ও আইজেনহাওয়ার
কদাচিৎ দু’চারজন আসতো মিউজিয়াম দেখতে। তাদের নাম লিখে রাখতাম একটা রেজিস্ট্রি খাতায়। তাদের বলা হতো শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা লিখতে, যদিও তা বাধ্যতামূলক ছিল না। ঠিকানা বা টেলিফোন নম্বরও তাই – ঐচ্ছিক। এই মিউজিয়ামের কাজ করতে করতে আমেরিকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রথম আলাপ। বিরাট বিলাসবহুল গাড়িতে করে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে এলেন। দেখলাম শিক্ষাগত যোগ্যতা ক্লাস এইট পর্যন্ত। ঠিক যেমন সুনীতার হোস্ট ফ্যামিলির বাড়ি গিয়ে দেখেছিলাম আমেরিকার সম্পন্ন চাষী পরিবার। সে গল্পটা বলে আইএসইউ প্রসঙ্গে ইতি টানবো।
তার আগে একটু এই মিউজিয়ামের কথা বলি। একটা পুরোনো কেল্লার মতো বাড়ি, তার ভিতরের একটা অংশে ইতিহাসের মিউজিয়াম। বাকীটা বোধহয় হিস্টোরিক্যাল সোসাইটির বাড়ি। এক অংশে সোসাইটির কর্মাধ্যক্ষ পরিবার নিয়ে বাস করে। তিনদিকে বাড়ির নানা অংশ, আর মাঝখানে খোলা উঠোনের মতো, চত্বরের মতো একটা জায়গা। বাড়ির পিছনে বিরাট ঘাসের মাঠ, সেখানে সামারে স্থানীয় লোকজন আসে, সানবাথ নেয়, ফ্যামিলি পিকনিক করে। আর এই ভেতরকার উঠোনটায়, এবং বাইরেও, প্রতিবছর সামার ব্রেকের সময়ে মুক্তমঞ্চ শেক্সপীয়ার ফেস্টিভ্যাল হয়। তখন লোকারণ্য।
এই ফেস্টিভ্যালে আমি দেখেছি কোনো একবছর টেমিং অফ দ্য শ্রু হতে। যদিও আমি মাত্র কয়েক মাস সে মিউজিয়ামে কাজ করেছি, কিন্তু আগের কয়েক বছর কী কী নাটক সেখানে অভিনীত হয়েছে, তার লিস্ট আমি দেখেছি। রোমিও জুলিয়েট, ওথেলো, ম্যাকবেথ, কিং লীয়ার, উইন্টার্স টেল, কমেডি অফ এরর্স – অনেক বিখ্যাত নাটক সেখানে হয়েছে। সবকিছুই ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক শিক্ষিকাদের অভিনীত, পরিচালিত। সেই কস্টিউম তৈরির ক্লাসের স্টুডেন্টরা সব তৈরি করেছে। তারাই লাইট দিয়েছে, সাউন্ড প্রোডাকশন করেছে। ইউনিভার্সিটির কমিউনিটি যে কত কী করতে পারে, আমেরিকায় এসে আমি তা দেখেছি।

আইএসইউ মিউজিয়াম-এর মুক্তমঞ্চে শেক্সপীয়ার ফেস্টিভ্যাল
সুনীতার হোস্ট ফ্যামিলি এক মার্কিন কৃষক পরিবার। একবার গেলাম ওর সঙ্গে নিমন্ত্রিত হয়ে – সেপ্টেম্বর না কি অক্টোবর মাসে। সেই ডঃ ওয়েবারের বাড়ির ডিনারের মতোই – ব্রেড ও বাটার, কর্নসেদ্ধ বাটিতে, ক্র্যানবেরি পাই, আপেল সাইডার, থ্যাংক্সগিভিং হলিডের ঠিক আগে চতুর্দিকে ছড়ানো ক্ষেতে ফলে থাকা হাজার কমলা-সোনালী রঙের পামকিন। সেই পামকিনের থেকে তৈরি করা নানারকম আমেরিকান মিষ্টি।

আমেরিকান ফার্মহাউস ও বার্ন
সন্ধে ছটা কি সাড়ে ছটার মধ্যেই ডিনার শেষ। সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসে দিনের আলো তখন রাত আটটা পর্যন্ত। হোস্ট ফ্যামিলির কর্তা আমাদের তাঁর চাষ আবাদ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখতে লাগলেন। ওখানে কয়েক একর জুড়ে আপেলের গাছ কয়েক হাজার। এদিকে পীচের গাছ, পেয়ার বা আমেরিকান প্রজাতির নাসপাতির গাছ। যতদূর দেখা যায়, ভুট্টার ক্ষেত। আমেরিকার এই মিডওয়েস্ট বা মধ্যপ্রতীচ্যের কর্ন ফীল্ড বিখ্যাত।
তারপর দেখলাম দূরে ওদিকে বিরাট একটা ঢাকা দেওয়া টিনের নাকি এ্যাজবেস্টসের শেড।
আমি বললাম, “ওটা কী স্যার?”
বৃদ্ধ ভদ্রলোক হাসলেন। বললেন, চল তোমাদের দেখাই। বলে, তাঁর গল্ফ খেলার ছোট্ট গাড়িতে করে নিয়ে গেলেন সেখানে। বিশাল এক ঢাকা দেওয়া কী যেন একটা বাড়ির মতো। তিনি রিমোট কন্ট্রোলে দরজাটা খুলে ফেললেন। ঘড়ঘড় করে দরজাটা উঠে গেলো ওপরে।
দেখলাম, ভেতরে রয়েছে একটা প্লেন। একটা আস্ত এরোপ্লেন।
সুনীতা বললো তার স্বভাবসিদ্ধ নিরুত্তাপ গলায়, “এটাতেই কি তুমি…?”
মার্কিন চাষী বললেন, “হ্যাঁ, এটাই আমার শিকাগো যাওয়ার এয়ারপ্লেন।”
শুনলাম, তাঁর নিজের এই টুইন-ইঞ্জিন বিমান তিনি নিজেই চালান, এবং কৃষিকাজের প্রয়োজনে মাঝে মাঝে মধ্য ইলিনয় থেকে শিকাগো যান।
হাঁ করে তাকিয়ে থাকলাম। ভাবলাম, “মন রে, কৃষিকাজ জানো না।“”
সত্যিই জানি না।
গর্ডনের গাড়ি আর আমার লজঝড়ে প্লীমুথ ভ্যালিয়েন্ট প্রায় আড়াইশো মাইল যাত্রা শেষ করে কার্বনডেল নামক কয়লা শহরের এক প্রান্তে আমাদের পৌঁছে দিলো।
ব্যবস্থা হয়েছিল আগেই যে আমরা সাদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটির গ্র্যাজুয়েট হাউসিং সাদার্ন হিলসে একটা ওয়ান-বেডরুম অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে উঠবো। সেই অনেকটা কার্ডিনাল কোর্টের মতোই। তফাৎ হলো, নরম্যাল শহরে গাছপালা প্রায় নেই বললেই চলে। তুষারাবৃত ঘুমন্ত শহর। মিডওয়েস্টের কর্নফীল্ডের মধ্যে তৈরি হওয়া একটা ইউনিভার্সিটি টাউন। আর এখানে কার্বনডেল একটু হয়তো বড়ো শহর, একটু বড়ো ইউনিভার্সিটি। আর চারদিক সবুজ গাছপালায় ঢাকা। ডিসেম্বরের শেষে যদিও প্রায় সবই পত্রহীন হয়ে গেছে, কিন্তু সাদার্ন হিলসে আমাদের বাড়ির সামনে যখন গর্ডন আর আমাদের গাড়িদুটো গিয়ে পৌঁছলো, তখন সন্ধ্যের অন্ধকারেও দেখলাম, প্রচুর গাছ “সন্ধ্যে হলেই দুহাত তুলে জুড়তো ভূতের নাচের” মতো দাঁড়িয়ে আছে।
ইউনিভার্সিটি হাউসিংয়ের অফিস রাত বারোটা পর্যন্ত খোলা থাকে। সেখান থেকে পরিচয়পত্র দিয়ে ঘরের চাবি নিলাম। নতুন শহর, নতুন স্কুল, নতুন বাড়ি। নতুন গৃহপ্রবেশ। অবশ্য, শাঁখ কেউ বাজায়নি, কপালে চন্দনের ফোঁটা কেউ দেয়নি। উলুধ্বনি, নাঃ তাও নয়।
অন্ধকার ঘরে ঢুকে খুঁজে খুঁজে আলো জ্বালালাম আমরা।
আমাদের শিশুকন্যা তার ক্রেডলে ঘুমন্ত। একটু কথা, একটু কফি। তারপর হাস্যমুখ গর্ডন বিদায় নিলো মুক্তিকে বাও করে আর আমার সঙ্গে তার মজবুত হাতের হ্যাণ্ডশেক করে। ওকে এখন ফিরে যেতে হবে আবার আড়াইশো মাইল। এবারে একা।
এই বন্ধুর সঙ্গেও আর জীবনে কখনো দেখা হয়নি।
[সাতকাহনের এক কাহন – আই এস ইউ পর্ব – সমাপ্ত। এবারে দুই কাহন – এস আই ইউ পর্ব শুরু।]
(চলবে…)
*আমেরিকা-জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রখ্যাত মানবধিকার কর্মী ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কলামে চলছে ‘মেরিকামায়া সাতকাহন’।
ধারাবাহিকভাবে প্রতি শুক্রবার সন্ধে ৬টায় প্রকাশিত হচ্ছে শুধুমাত্র বঙ্গদর্শন-এ।
‘মেরিকামায়া সাতকাহন’-এর সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।
