
সৌরিন ভাস্করের পূর্বপুরুষেরা তিন-চার প্রজন্ম ধরে আইভরির কাজ করেছেন
দিল্লির দরবার যখন জমজমাট, ভাগীরথী তীরের মুখসুদাবাদ নেহাতই জঙ্গলে ঘেরা একটি জনপদ। পূর্ববঙ্গের জাহাঙ্গীর নগর (ঢাকা) ছিল তদানিন্তন বাংলার রাজধানী। ১৭০৪ নাগাদ মুর্শিদকুলি খাঁ-র পা পড়ল মুখসুদাবাদে। ঢাকা থেকে তিনি সরিয়ে নিয়ে এলেন রাজধানী, নয়া নাম পেয়ে মুখসুদাবাদ হয়ে উঠল মুর্শিদাবাদ। আর হয়ে উঠল সুবে বাংলার রাজধানী। (ঐতিহাসিকদের মতে, মুর্শিদকুলি খাঁর নাম অনুযায়ী মুখসুদাবাদের নাম হয় মুর্শিদাবাদ।) নবাবী আমলে নানা ধরনের কুটির শিল্পের আঁতুড়ঘর হয়ে উঠেছিল মুর্শিদাবাদ। ব্রিটিশ শাসনকালে আরও উচ্চতায় পৌঁছয় মুর্শিদাবাদের কুটির শিল্প। সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছিল হস্তিদন্ত শিল্প (আইভরি)।

কোরিয়ান স্টোন কোনও প্রাকৃতিক জিনিস নয়, ‘ম্যান মেড’ স্টোন। যা উৎপাদন করে কোরিয়া। সৌরিন ভাস্কর কোরিয়া থেকে এগুলি কেনেন। ব্লক আকারে পাথর আসার পর, তার মধ্যে আঁকা হয় এবং সেই অনুযায়ী কেটে নানান ধরনের গয়না, মূর্তি বানান তাঁরা।
বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদ (Murshidabad)-এ স্থানান্তরিত হওয়ার সময়ই ঢাকা থেকে হস্তিদন্ত শিল্পীরা জিয়াগঞ্জ ও কাশিমবাজারে চলে আসেন। নবাবের পৃষ্ঠপোষকতাতে জিয়াগঞ্জে এই শিল্পের প্রসার ঘটে। বাড়িতে বাড়িতে হাতির দাঁত থেকে মূর্তি, গয়না, নানা ধরনের সামগ্রী তৈরি হতে শুরু হয়। কদরও বাড়তে শুরু করে। ধাপে ধাপে বহরমপুর, কাশিমবাজার-সহ মুর্শিদাবাদ জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে হাতির দাঁতের কাজ। চোখ ধাঁধানো সেই সব কারুকার্য কাশিমবাজারে ব্যবসা করতে আসা বণিকদের মনে ধরেছিল। তারাই ছিল প্রাথমিক ক্রেতা। বণিকরা বরাত দিতেন। কারিগররা সেই মতো শিল্প সামগ্রী গড়ে, বণিকদের হাতে তুলে দিতেন। দিনে দিনে চাহিদা আরও বৃদ্ধি পেল। পলাশি পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ ১৭৫৭-র পর সাহেবদের হাত ধরে বিদেশেও খ্যাতি পেয়েছিল মুর্শিদাবাদের হাতির দাঁতের নানা শিল্প সামগ্রী। অভিজাত ধনীরা হাতির দাঁতের নানা ধরনের জিনিসে বাড়িতে সাজিয়ে রাখতেন। হস্তিদন্ত শিল্প হয়ে উঠেছিল আভিজাত্য প্রদর্শনের হাতিয়ার। স্বাধীনতা-উত্তর যুগে ধাপে ধাপে হস্তিদন্ত শিল্প নিজের সিংহাসন হারায়। প্রসঙ্গত, ১৯৮৯ সালে বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধ করা হয় হাতির দাঁতের বাণিজ্য। ১৯৯২ সালের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনের জেরে এ দেশে ধাক্কা খায় হস্তিদন্ত শিল্প। মোটামুটি নয়ের দশক থেকে একেবারে বন্ধ হয়ে যায় শিল্পটি। আড়ি, কলম, থাপি, গিরদি, চোরসের মতো যন্ত্রগুলোর প্রয়োজন ফুরোয়। মুর্শিদাবাদ, বহরমপুরের গজদন্ত শিল্পীরা কর্মহীন হয়ে পড়েন। অনেকে পেশা বদলেও ফেলেন। কিন্তু পারিবারিক ঐতিহ্য, হস্তিদন্ত শিল্পকে কেউ কেউ চিরতরে ছেড়ে দিতে পারেননি। মাধ্যম বদলে সজীব রেখেছেন শিল্পকে। যেমন সৌরিন ভাস্কর। তাঁরা কয়েক পুরুষ ধরে হস্তিদন্ত শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখন তিনি কোরিয়ান স্টোনের মাধ্যমে সেই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। সৌরিনদের বানানো গয়না, মূর্তি দেখলে মনে হয় যেন হাতির দাঁত দিয়ে তা তৈরি হয়েছে, সাদা ধবধবে অবিকল আইভরি। কিন্তু তা নয়!
সৌরিনের পূর্বপুরুষেরা তিন-চার প্রজন্ম ধরে আইভরির কাজ করেছেন। তাঁরা অনেকেই রাজ্যের তরফে পুরস্কৃত হয়েছেন। সৌরিনের দাবি, ভিক্টোরিয়া, হায়দ্রাবাদ, মুর্শিদাবাদের হাজারদুয়ারি প্যালেসের মিউজিয়ামে খুঁজলে, তাঁর বাবা বা দাদুর তৈরি কিছু না কিছু ভাস্কর্যের দেখা পাওয়া যাবেই। এখন আর হস্তিদন্ত শিল্পের কাজ হয় না, আটের দশকে সে পাঠ চুকে গিয়েছে। প্রায় চোদ্দ বছর ধরে কোরিয়ান স্টোন থেকে গয়না বানাচ্ছেন সৌরিন। সৌরিন বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, “আমরা আসলে মুর্শিদাবাদের আইভরি আর্টিস্ট। আমার বাবা, দাদু সবাই হাতির দাঁতের শিল্পী ছিলেন। আমরা ছোটো থেকে দেখেছি এসব বাড়িতে তৈরি হচ্ছে। কিন্তু নিজে সেটা পাইনি। তাই কোরিয়ান স্টোনকে বেছে নেওয়া। আমি কোরিয়ান স্টোন মুম্বই থেকে সংগ্রহ করি। এটা হাতির দাঁতের একটা বিকল্প ব্যবস্থা।”

তিনিই জানালেন, কোরিয়ান স্টোন কোনও প্রাকৃতিক জিনিস নয়, ‘ম্যান মেড’ স্টোন। যা উৎপাদন করে কোরিয়া। সৌরিন কোরিয়া থেকে এগুলি কেনেন। যা কখনও মুম্বই হয়ে আসে আবার চেন্নাই হয়েও আসে কখনও কখনও। ব্লক আকারে পাথর আসার পর, তার মধ্যে আঁকা হয় এবং সেই অনুযায়ী কেটে নানান ধরনের গয়না, মূর্তি বানান তাঁরা। সৌরিন সহ প্রায় দশ-বারোজন কারিগর এসব বানান। সকলেরই হাতে খড়ি সৌরিনের বাবার কাছে। নকশার উপরে নির্মাণের সময় নির্ভর করে। সুক্ষ্ম কাজ হলে সময় বেশি লাগে। গয়নার মধ্যে রয়েছে নানান ধরণের কানের দুল, বিভিন্ন ধরনের চুড়ি, বালা। সৌরিন বলছিলেন, তাঁরা প্রায় কুড়ি-পঁচিশ রকমের চুড়ি বানান। কানের দুল তৈরি হয় দশ-পনেরো রকমের। এছাড়াও ঝোলানো কানের দুল, পেনডেন্ট তৈরি হয়।
দাম প্রসঙ্গে তিনি বললেন, “কোরিয়ান স্টোনের গয়নার দাম তিনশো টাকা থেকে শুরু। ডিজাইনের উপর দরদাম নির্ভর করে। দু-পাঁচ হাজার টাকা থেকে এক-দেড় লক্ষ টাকাও হতে পারে।” সৌরিন আরও বলেন, “কোরিয়ানা স্টোনের গয়নার চাহিদা খুব। এটা লাইফ-টাইম মেটিরিয়াল। কোনও দিন নষ্ট হয়ে যাওয়ার নয়।” কোরিয়ানা স্টোনের গয়না অফলাইন, অনলাইন দু-ভাবেই বিক্রি হয় তবে অনলাইনে বিক্রি একটু কম।
কোরিয়ান স্টোনের কারুকার্য বানিয়ে জেলাস্তরে একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন সৌরিন। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে দু-বার সেরার শিরোপা তথা স্টেট অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছেন। সৌরিন গড়ে তুলেছেন মেরি হ্যান্ডিক্র্যাফট আর্ট গ্যালারি। বলছিলেন, “পরিবারের অনেকেই অন্যান্য পেশায় যুক্ত। আমি শুধু এই শিল্পটাকে নিয়ে আছি। আমি এই শিল্পকে ভালোবাসি। কাজটাকে ভালোবাসি আর কিচ্ছু না… এই শিল্পটাকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।”

হস্তিদন্ত শিল্পের ইতিহাস সুপ্রাচীন। রামায়ণ, চানক্যের অর্থশাস্ত্র, বাৎস্যায়নের কামসূত্রের মতো ঐতিহাসিক দলিলে হস্তিদন্ত শিল্পের উল্লেখ আছে। হরপ্পা-মহেঞ্জোদরোর খননে হস্তিদন্ত শিল্পের নিদর্শন মিলেছিল। শ্রীহট্ট ও ত্রিপুরা অঞ্চলে হাতির দাঁতের শিল্পীদের বসবসা ছিল। ১৬০০ সালে বঙ্গের রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হলে শ্রীহট্ট, ত্রিপুরার হস্তিদন্ত শিল্পীরা ঢাকায় চলে যান, ফিরে আসেন মুর্শিদকুলি খাঁ-র আমলে। একবিংশ শতকে মানুষ ইতিহাস, অতীতকে ফেলে এগিয়ে চলেছে। মেটা-এআইয়ের দাপটেও সৌরিন পারিবারিক ঐতিহ্যকে হারিয়ে যেতে দেননি। আইন মেনে মাধ্যম বদলালেও শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তাঁর চেষ্টায় আইভরির স্বাদ এখনও পাচ্ছেন মানুষ। হোক না কোরিয়ান স্টোন। বাংলার শিল্প তো বেঁচে রইল। এই বা কম কীসের!