
লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসের হুবহু অনুকরণে বাড়ির লোহার ফটকের গায়ে একটা বৃত্তাকার মেডেল-নকশাগুণে লুকিয়ে রয়েছে এক গর্ব
বাড়ির নাম এমারেল্ড বাওয়ার বা মরকত কুঞ্জ।বর্তমানে বি.টি.রোড এর রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণের ভেতরে অবস্থিত। সেই বাড়ির প্রধান ফটক। লন্ডনের বাকিংহাম প্যালেসের হুবহু অনুকরণে তৈরি এই ফটকের গর্ব লুকিয়ে রয়েছে এর নকশাগুণে। লোহার এমন ফটকের গায়ে একটা বৃত্তাকার মেডেলে লেখা হেভেন’স লাইট আওয়ার গাইড। এমন কথা প্রমাণ করে এ বাড়ির মালিকেরা মানে প্রদ্যোত কুমার ঠাকুর অথবা অন্যান্যরা সকলেই পেয়েছিলেন অর্ডার অফ দ্যা স্টার অফ ইন্ডিয়া নামের খেতাব। সেই খেতাব দানের উদ্দেশ্য ছিল একটা ভাবনাকে শহরের শিক্ষিত ও বিত্তবান মানুষের মনের মধ্যে গেঁথে দেওয়া। সেই ভাবনাটা হল ‘হেভেন’স লাইট আওয়ার গাইড’। এমন মরকত কুঞ্জের বাড়িতেই বাল্য কালে রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রকে। এমন বাড়িতেই এসে থাকতেন হায়দ্রাবাদের নিজাম। এমন বাড়িতেই বসতো বিদ্বান মানুষদের আলোচনা সভা। বাড়ির এমন অলঙ্কারময় দরজা তৈরি হয়েছে রাশিয়ায় রাজা জারের আমলে। তাই এর বৈভবই আলাদা।
তত দিনে শহর কলকাতার সাদা অঞ্চল আর কালো অঞ্চল ভাগ হয়ে গিয়েছে। এসপ্ল্যানেড চত্বর থেকেই বলতে গেলে হোয়াইট টাউনের দিক নিশানার শুরু হয়ে যায়। অন্য দিকে চিতপুরের তাবৎ অঞ্চল ব্ল্যাক টাউন নাম নিল সাহেবদের মুখের ভাষায়। এরই মধ্যে বইতে লাগলো এক ভিন্ন বাতাস। একটা ধারণা। একটা মানস ভাবনা।
পরে ছড়িয়ে পড়ে ঘর বাড়ি, আসবাব পত্র, পোশাক-আশাক সর্বত্র। সেই ভাবনা দাপটের সঙ্গে নিজেকে জাহির করতে থাকে সব খানে। ফলশ্রুতিতে পাল্টায় মানুষের রুচি, পাল্টে যায় ঘর বাড়ির চেহারা। সর্বোপরি পাল্টে যায় মানুষের মন। এরকম ঘটনা সেইদিন হতে লাগলো নগর কলকাতার বুকেও। পাশ্চাত্যের বিবিধ ভাবনা শহরের মানুষকে নানা কারণে প্রভাবিত করল। মানুষ এমনও ভাবতে শুরু করল যে ইংরেজ আমাদের দেশে স্বর্গ থেকে আলো বয়ে এনেছে। তাঁর দেখানো পথেই চলা শ্রেয়। দিকে দিকে ছড়িয়ে গেলো সেই বানী ‘হেভেন’স লাইট আওয়ার গাইড’। বাড়ির দেওয়ালে দরজায় প্রতিধ্বনিত লাগলো সেই অমোঘ বাণী। এই ভাবনা থেকে বেড়িয়ে আসতে অনেকটা সময় লেগেছে দেশের মানুষের।
আজ আর সেই খেতাব দানের যুগ নেই। দরজার গায় শব্দটি পড়ে দেখারও সময় নেই কারও। কিন্তু উনিশ শতকের মানুষের ইংরেজ আনুগত্যের সেই মানসিকতার প্রতীক হয়ে আর সেই ইতিহাস হয়ে আজও দরজার গায় বেঁচে রইল শব্দক’টি।
