বইমেলার প্রেম আজীবন রঙীন, হলদেটে হয় না

পুবের আলো ক্ষীণ হয়ে এসেছে। আলো জ্বলে উঠেছে গোটা মাঠে। ঠান্ডা হাওয়া বইছে। সেই হাওয়াতে শিরশিরানি নেই। তবুও আদুরে হাওয়া বারবার উদাসী করে তুলছে। ডান দিকে তাকালেই উঁচু উঁচু সরকারি অফিস। কিছু শৌখিন ফ্ল্যাট। সামনে দিয়ে ছুটে যাওয়া মেট্রো। অটো, বাসের ভিড়। বাড়ি ফেরার তাড়া। ফেরার তাড়া তো তাদেরও, যারা গতবছর চিহ্ন রেখে গিয়েছিল এই মাঠেই। প্রতিদিনের থেকে বছরের এই সময়টা একটু আলাদা। সেন্ট্রাল পার্ক এই সময় সেজে ওঠে। বইয়ের পসরা নিয়ে হাজির হয় প্রকাশকরা। ভিড় করে আগ্রহীদের দল। ভিড় করে বইমুখো বাঙালির দল। বইয়ের খোঁজে আসে কত কেউ। দূরদূরান্ত থেকে মানুষজন ছুটে আসে। ছুটে আসে প্রথম দেখা হওয়া যুবক যুবতীরা। বইমেলাকে ঘিরে গড়ে ওঠে মিলন উৎসব। শুধু বইয়ের জন্য নয়, জীবনের জন্য কলকাতা বইমেলার গুরুত্ব অপরিসীম। (বইমেলার প্রেম)

বইকে ঘিরে যে ভালোবাসার জন্ম হয়, তা কোনওদিন পুরোনো হয় না। হতে পারে না। বইমেলার এই মাঠে কত কত সম্পর্ক গড়েছে, কত কত সম্পর্ক পরিণতি পেয়েছে, কত সম্পর্ক পায়নি তবুও সেইসব হিসেব রয়ে গিয়েছে মনের অতলান্তে।

কত লোকে বই কিনছে, কত লোকে সেই বই পড়ছে, এই তর্ক থেকে দূরে গিয়ে একটা অদ্ভুত জিনিস চোখে পড়ে। বইমেলা আদতে সম্পর্কের জন্ম দেয়। ভালোবাসার, ভালোথাকার জন্ম দেয়। বইমেলাকে ঘিরে যে সম্পর্কের জন্ম হয়, সেই সম্পর্ক কোনওদিন মুছে যায় না। যেতে পারে না। বইকে ঘিরে যে ভালোবাসার জন্ম হয়, তা কোনওদিন পুরোনো হয় না। হতে পারে না। বইমেলার এই মাঠে কত কত সম্পর্ক গড়েছে, কত কত সম্পর্ক পরিণতি পেয়েছে, কত সম্পর্ক পায়নি তবুও সেইসব হিসেব রয়ে গিয়েছে মনের অতলান্তে। কলকাতার এক নামকরা কবি, গীতিকার এই বইমেলায় খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর জীবনসঙ্গীকে। তিনি তখন কবিতা লেখেন। বইপত্তর বেরিয়েছে। নামকরা লেখকদের সঙ্গে ওঠাবসা করেন। তখন বইমেলা হত অন্য জায়গায়। কিন্তু আবেগটা একই ছিল। তখনও আসেনি এআই, সমাজমাধ্যম এত উন্নত নয়। তখন একটি ফর্সা, লম্বা মেয়ে বইমেলায় গিয়ে সেই কবির বই কিনেছিলেন। যদিও তার আগে সেই কবির লেখা পড়েছেন। কবি সম্পর্কে টুকটাক খোঁজখবর নিয়েছেন। সৌভাগ্যক্রমে কবি তখন স্বয়ং উপস্থিত সেই স্টলে। মেয়েটি কবির স্বাক্ষর নিয়েছিলেন বইটিতে। তারপর মেয়েটি আর ফিরে যায়নি। রোদে ভেজা এই শহরে তারা বাসা বেঁধেছে। ভালোবাসা বেঁধেছে। এখনও বইমেলা এলে কি তাঁদের মনে শিহরণ জাগে? কে জানে, তবে এই বইমেলাকে ঘিরে প্রতিবছর ভালোবাসা তৈরি হয়। যে ভালোবাসার ছাপ রেখে যায় প্রতিটি বইমেলায়। হয়তো এই বইমেলায় প্রথম দেখা, হয়তো এই বইমেলায় প্রথম পাশাপাশি হাঁটা। হয়তো একসঙ্গে স্টল নম্বর খোঁজা। হয়তো বইমেলার গোলকধাঁধায় একসঙ্গে হারিয়ে যাওয়া। একে অন্যকে বই উপহার দেওয়া। সবটাই একটা অস্থায়ী বইমেলাকে কেন্দ্র করে। (বইমেলার প্রেম)

আধুনিক নগরজীবনে বইমেলা শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, বরং শহরের বুকে গড়ে ওঠা এক বিরল মানবিক পরিসর। নগর সমাজতত্ত্ব বলছে, বড়ো শহরে যতই বহুতল বাড়ি, শপিং মল আর ব্যক্তিগত জায়গা বাড়তে থাকে, ততই কমে যায় মানুষের স্বাভাবিক মেলামেশার মুক্ত ক্ষেত্র। সেই শূন্যতার মধ্যেই বইমেলা কয়েক দিনের জন্য শহরবাসীর কাছে হয়ে ওঠে এক খোলা, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক আশ্রয়। এখানে কেউ চাকরি, পরিচয় বা সামাজিক অবস্থানের ভার নিয়ে আসে না। সবাই পাঠক, সবাই কৌতূহলী মানুষ। অপরিচিতের সঙ্গে কথা বলা এখানে অস্বাভাবিক নয়, একা ঘোরা দৃষ্টিকটু নয়, নিজের পছন্দ-অপছন্দ প্রকাশ করাও নিরাপদ। শহরের যে সামাজিক বন্ধনগুলো দৈনন্দিন ব্যস্ততায় আলগা হয়ে যায়, বইমেলা সেগুলোকে আবার কিছুক্ষণের জন্য জুড়ে দেয়। তাই বইমেলা শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়। এটি নগর সংস্কৃতির ভেতরে মানুষের সম্পর্ক, বিশ্বাস আর সহাবস্থানের চর্চাকে বাঁচিয়ে রাখার এক অস্থায়ী অথচ গভীরভাবে প্রয়োজনীয় পরিসর।বই দুজন মানুষকে কাছে আনতে পারে। তাদের এক সূত্রে গাঁথতে পারে। দুজন মানুষ একে অন্যকে বুঝতে পারে একটি বইয়ের মাধ্যমে। (বইমেলার প্রেম)

বইমেলা এলেই প্রতিবছর দাবি করা হয়, কেউ বই পড়ছে না। বই বিক্রি কমেছে। লোকে মেলায় যাচ্ছে শুধু ছবি তুলতে। রিলস বানাতে। চটজলদি খাবার খেতে। আবার এইসব দাবি নস্যাৎ করে প্রকাশকরা হিসেব দিচ্ছেন কত টাকার বই বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু এইসবের মাঝে কেউ একবারও বলছে না, একটা বইমেলায় কত সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। কত প্রেম জুড়ে যাচ্ছে। কত প্রেম পূর্ণতা পাচ্ছে।

‘আমি অমুক স্টলে আছি, অমুক গেট দিয়ে ঢুকে ডানদিকে’ এই কথাটা বইমেলার আগ্রহীদের জানা কথা। এমন কত লেখক, লেখিকা আছেন যাদের শুধুমাত্র দেখার জন্য বইমেলায় ভিড় হয়। হয়তো তাদের লেখা আগ্রহী ব্যক্তি বা মহিলা একবারও পড়েননি, শুধুমাত্র তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়েছে। সেই সৌন্দর্যকে পরখ করার জন্য বইমেলার গোলকধাঁধা পেরিয়ে তার কাছে যাওয়া। তাকে কাছ থেকে দেখা। আবার কোনও পাঠক লেখকের লেখা পড়েছে অথচ কোনওদিন তাকে দেখিনি, সেই দেখার জন্য বইমেলায় যাওয়া। এখন সব রাস্তা গিয়ে মিশবে বইমেলায়। সব বাস, অটো, মেট্রোর একটাই গন্তব্য। বইমেলা, ভালোবাসার বইমেলা। ক্যাফেটেরিয়া ছেড়ে এখন কয়েকটা দিন বইমেলা ঠিকানা হবে প্রেমিক-প্রেমিকাদের। আবার বইমেলায় এমন কোনও কাউকে ভালো লেগে যাবে, বাড়ি ফিরে তাকে হাতড়ে খুঁজতে হবে সমাজমাধ্যমের বিভিন্ন সাইটে। এটাই তো বইমেলা। আবার এমন কাউকে দেখতে পাব যে আমার সমাজমাধ্যমেই আছে। তার সঙ্গে হয়তো কথা শুরু হবে এই বলে যে, ‘আপনাকে তো বইমেলায় দেখলাম।’ এই বইমেলাকে ঘিরে কতকিছু ঘটে, কতকিছু রটে।

বড়ো শহরে যতই বহুতল বাড়ি, শপিং মল আর ব্যক্তিগত জায়গা বাড়তে থাকে, ততই কমে যায় মানুষের স্বাভাবিক মেলামেশার মুক্ত ক্ষেত্র। সেই শূন্যতার মধ্যেই বইমেলা কয়েক দিনের জন্য শহরবাসীর কাছে হয়ে ওঠে এক খোলা, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক আশ্রয়।

মনোবিজ্ঞানে বলা হয়, যখন দুজন মানুষ একই অর্থবহ অভিজ্ঞতার মধ্যে থাকে, তখন তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা দ্রুত তৈরি হয়। বইমেলা ঠিক সেই জায়গা। এখানে মানুষ আসে গল্প, কবিতা, চিন্তা আর অনুভব ভাগ করে নিতে। ফলে সম্পর্কের সূচনা হয় বাহ্যিক আকর্ষণ থেকে নয়, বরং একই বোধ ও রুচির জায়গা থেকে। এই ধরনের সম্পর্ক সাধারণত বেশি গভীর হয় এবং স্মৃতিতে দীর্ঘদিন থেকে যায়। বইমেলার পরিবেশ নিজেই মানুষের আবেগকে উস্কে দেয়। ঠান্ডা হাওয়া, আলোয় সাজানো মাঠ, ভিড়ের মধ্যে হাঁটা, স্টল খুঁজে বেড়ানো, এই সব মিলিয়ে শরীরে একধরনের শারীরিক উত্তেজনা তৈরি হয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যায় পরিবেশজনিত উত্তেজনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বইমেলা সামাজিকভাবে এমন একটি জায়গা যেখানে আবেগ প্রকাশের নীরব অনুমতি থাকে।

বইমেলা এমন এক পরিসর, যেখানে প্রেমকে আগে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে হয় না। এখানে ভালোবাসা নারী পুরুষের চেনা গণ্ডিতে আটকে থাকে না। সমপ্রেমও এই ভিড়ের মধ্যেই নিজের জায়গা খুঁজে নেয়। দু’জন ছেলে কিংবা দু’জন মেয়ের হাতে একই বই, একই লেখকের খোঁজে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে ঘোরা, এই দৃশ্য বইমেলায় অচেনা নয়। শহরের বাকি দিনগুলো যে অনুভূতিগুলো সাবধানে ঢেকে রাখতে হয়, বইমেলার আলোয় সেগুলো কিছুক্ষণের জন্য হলেও প্রকাশ পায়। কারও চোখে চোখ পড়া, বই নিয়ে কথা শুরু হওয়া, ভিড়ের চাপে হঠাৎ হাতটা ধরে ফেলা, এই ছোটো ছোটো মুহূর্ত থেকেই অনেক সময় সমপ্রেমের শুরু। বাইরে হয়তো সেই সম্পর্কের ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন, কিন্তু এই মাঠে তার প্রয়োজন পড়ে না। সমাজমাধ্যমে ফিরে গিয়ে পরে যাকে খুঁজতে হয়, সেই মানুষটাকে প্রথম চেনা যায় এই বইমেলাতেই। বইমেলার পরিবেশ প্রেমকে কোনও ছাঁচে ফেলে না, কোনও সংজ্ঞায় বেঁধে রাখে না।

মনোবিজ্ঞানে বলা হয়, যখন দুজন মানুষ একই অর্থবহ অভিজ্ঞতার মধ্যে থাকে, তখন তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা দ্রুত তৈরি হয়। বইমেলা ঠিক সেই জায়গা। এখানে মানুষ আসে গল্প, কবিতা, চিন্তা আর অনুভব ভাগ করে নিতে। ফলে সম্পর্কের সূচনা হয় বাহ্যিক আকর্ষণ থেকে নয়, বরং একই বোধ ও রুচির জায়গা থেকে।

১৯৭৬ সালে শুরু হওয়া এই বইমেলা জন্ম নিয়েছিল একেবারে ভিন্ন ধারণা নিয়ে, এটি কোনও পেশাদার প্রকাশনা-বাণিজ্যের মেলা নয়, বরং পাঠককেন্দ্রিক এক গণউৎসব। ইউরোপের ফ্র্যাঙ্কফুর্ট বা লন্ডন বুক ফেয়ারের মতো মেলাগুলি যেখানে মূলত প্রকাশক, এজেন্ট ও লেখকদের লেনদেনের জায়গা, সেখানে কলকাতা বইমেলা প্রথম থেকেই সাধারণ পাঠকের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এখানে লেখক-পাঠকের দূরত্ব ভাঙে, বই দোকানের কাউন্টারের এপার-ওপার মিলেমিশে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই মেলা কেবল বই কেনাবেচার জায়গা না থেকে হয়ে উঠেছে বাঙালির সামাজিক ক্যালেন্ডারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। রাজনৈতিক আড্ডা, সাংস্কৃতিক বিতর্ক, প্রজন্মের মেলবন্ধন, সবকিছুর সাক্ষী হয়ে উঠেছে এই মাঠ। বদলেছে স্থান, বদলেছে সময়, বদলেছে প্রযুক্তি, কিন্তু বইমেলার মূল চরিত্র বদলায়নি। আজও এটি এমন এক পরিসর, যেখানে শহর নিজেকে নতুন করে চেনে, নিজের পাঠাভ্যাস, চিন্তা আর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে জনসমক্ষে উদ্‌যাপন করে। তাই কলকাতা বইমেলা কেবল একটি বাৎসরিক আয়োজন নয়, এটি শহরের সামাজিক স্মৃতির ধারাবাহিক রেকর্ড।

Written by