
মেলা চলবে ৯-১৩ জানুয়ারি
স্বমহিমায় শুরু হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি আয়োজিত সাহিত্য উৎসব ও লিটল ম্যাগাজিন মেলা ২০২৬। স্থান: নন্দন-রবীন্দ্র সদন চত্বর। আজ অর্থাৎ ৯ জানুয়ারি থেকে মেলা শুরু হল, চলবে আগামী ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত, বিকেল ৩টে থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, অসম এবং বাংলাদেশের প্রায় ৫০০টি লিটল ম্যাগাজিনের সম্ভার, প্রায় নয় শতাধিক কবি-লেখকের সম্মিলন, তাঁদের গল্প ও কবিতাপাঠ, নানান বিষয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা, গ্রন্থ প্রকাশ এবং গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় আয়োজিত একটি প্রদর্শনী এ বছরের লিটল ম্যাগাজিন মেলার অন্যতম আকর্ষণ।
লিটল ম্যাগাজিন। বিশ্ব সাহিত্যে যার মূল্য অপরিসীম। সে তার সমস্ত জেদ আর অহংকার নিয়ে যুগের পর যুগ এগিয়ে চলেছে গুটি গুটি পায়ে৷ কে তার পাশে রইল, কে এলো-গেলো; এসব হিসেব লিটল ম্যাগাজিন রাখে না। কারণ তার নিজস্ব একপ্রকার যাপন আছে। কবি ভাস্কর চক্রবর্তী যেমন কবিতাযাপন প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, বিখ্যাত বিখ্যাত আর বিখ্যাত হওয়ার মধ্যে একটা অশ্লীলতা আছে। লিটল ম্যাগাজিন বাঁচে, তাকে বাঁচতে হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। টিকিয়ে রাখেন প্রবীণ থেকে তরুণ থেকে অতি-তরুণরা।
পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, অসম এবং বাংলাদেশের প্রায় ৫০০টি লিটল ম্যাগাজিনের সম্ভার, সাত শতাধিক কবি-লেখকের সম্মিলন, তাঁদের গল্প ও কবিতাপাঠ, নানান বিষয়ে মনোজ্ঞ আলোচনা, গ্রন্থ প্রকাশ এবং গগনেন্দ্র প্রদর্শশালায় আয়োজিত একটি প্রদর্শনী এ বছরের লিটল ম্যাগাজিন মেলার অন্যতম আকর্ষণ।
‘দেশ’ পত্রিকায় ১৯৫৩ সালের মে মাসের এক সংখ্যায় ‘সাহিত্য পত্র’ প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, “এক রকমের পত্রিকা আছে, যা আমরা রেলগাড়িতে সময় কাটাবার জন্য কিনি, আর গন্তব্য টেশনে নামার সময় ইচ্ছে করে গাড়িতে ফেলে যাই, যদি না কোনো সতর্ক সহযাত্রী সেটি আবার আমাদের হাতে তুলে দিয়ে বাধিত ও বিব্রত করেন। আর এক রকমের পত্রিকা আছে যা স্টেশনে পাওয়া যায় না, ফুটপাথে কিনতে হলেও বিস্তর ঘুরতে হয়, কিন্তু যা একবার আমাদের হাতে এলে আমরা চোখ বুলিয়ে সরিয়ে রাখি না, চেয়ে দেখে আস্তে আস্তে পড়ি, আর পড়া হয়ে গেলে গরম কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে ন্যাপথলিনগন্ধী তোরঙ্গে তুলে রাখি, জল, পোকা আর অপহারকদের আক্রমণ থেকে বাঁচাবার জন্যে।”
এই ধরনের পত্রিকাই আসলে লিটল ম্যাগাজিন, অন্তত বুদ্ধদেব বসু তারই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এটাই লিটল ম্যাগাজিনের অহংকার। অনলাইনের যুগেও অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সম্পাদকরা প্রকাশ করে চলেছেন বহু মূল্যবান সংখ্যা। লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্রের কর্ণধার প্রয়াত সন্দীপ দত্তের প্রস্তাবেই ১৯৯৮ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির উদ্যোগে ১৯৯৯ সালের ৯ জানুয়ারি লিটল ম্যাগাজিন মেলার পথ চলা শুরু হয়। এই লিটল ম্যাগাজিন মেলার প্রদীপে প্রথম সলতে জ্বালিয়েছিলেন কিংবদন্তি কবি অন্নদাশংকর রায়।
একতারা মুক্তমঞ্চে লিটল ম্যাগাজিন মেলা উদ্বোধন করবেন সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন কবি সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি রাজ্যের মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন, সভামুখ্য হিসেবে উপস্থিত থাকবেন রাজ্যের মন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির সভাপতি ব্রাত্য বসু এবং বাংলা আকাদেমির সচিব বাসুদেব ঘোষ। পরপর পাঁচদিন নানান বিষয়ে অনুষ্ঠান চলবে একতারা মুক্তমঞ্চ, বাংলা আকাদেমি সভাঘর, জীবনানন্দ সভাঘর এবং অবনীন্দ্র সভাঘরে।
প্রয়াত সন্দীপ দত্ত একবার লিখেছিলেন, “এইসব খাদ্য-অখাদ্য তিমিরাভিসারের (বাণিজ্যিক পত্রিকাকে ইঙ্গিত করেছিলেন) পাশে প্রকাশ পায় চেহারায় চাকচিক্যহীন, মশলাদার প্রচ্ছদহীন অন্যরকম ভাবনার, চিন্তনের, মনন সমৃদ্ধ লিটল ম্যাগাজিন। তার পাঠক বহুধা, বিচিত্রগামী। সিরিয়াল পাঠক নন, সেরিব্রাল পাঠক। শিক্ষিত পাঠক।” লিটল ম্যাগাজিন তার যুগ হারিয়েছে, একথা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবুও যে উচ্চমানের গুটিকয়েক পত্র-পত্রিকা ব্যাটন শক্তহাতে তুলে আছেন, তাঁদের কুর্ণিশ জানানোর মঞ্চ এই সাহিত্য উৎসব, বাংলা ভাষার বৃহত্তম সাহিত্য পার্বণ।
প্রবীণ-নবীন কবি, গল্পকার, সম্পাদকের ভিড়ে নতুন ছন্দে মুখরিত নন্দন চত্বর। স্টলে চেয়ার পাওয়া নিয়ে খানিক ঝামেলা চলছে, পত্রিকায় লেখা মনোনীত হয়নি দেখে খানিক অভিমান করছেন নবীন কবি, কবিতা পাঠের নিমন্ত্রণ না পেয়ে কেউ গোঁসা করছেন, পুরোনো বন্ধুকে দেখে কেউ ঝাঁপিয়ে পড়লেন বন্ধুর কাঁধে, কেউ স্টল না পেয়ে এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত ফেরি করছেন স্বপ্নের পত্রিকা… এসব যদ্দিন থাকবে, লিটল ম্যাগাজিনেও প্রাণ থাকবে তদ্দিন। সমস্ত হাইরাইজ আর কংক্রিট পার করে লিটল ম্যাগাজিন থেকে যাবে মাটির হৃদয়ের চাষে-আবাদে। শুধু মুশকিল একটাই, আজকাল লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকরা পত্রিকার নতুন সংখ্যা ছাপার চেয়ে গ্রন্থ প্রকাশে তুলনামূলক বেশি মন দিয়েছেন। তাই স্টলগুলিতে নতুন বই যত আছে, পত্রিকা তত নেই। লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদের এ-নিয়ে ভেবে দেখা উচিত।
