নন্দলালের করা আবদুল গফ্ফর খানের এই লিনোকাট মাধ্যমের অনবদ্য প্রতিকৃতিটি ঠায় দেখতে দেখতে কিছু আরবি হরফ নজরে আসে
১৯৩৬, নন্দলাল বসুর লিনোকাটে ধরা পড়লেন এক মহামহিম ব্যক্তিত্ব খান আবদুল গফ্ফর খান। লিনোকাটে কাজটি করার আগে খান সাহেবের এমন একটি প্রতিকৃতি পেনসিলেও স্কেচ করেছিলেন নন্দলাল বসু। সেই স্কেচটিও ছিল লিনো কাটটির হুবহু। পেনসিল স্কেচটি সম্পর্কে ১৯৩৫-র ১৫ এপ্রিল মহাদেব হরিভাই দেশাইকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘ এ ডিলাইটফুল পেনসিল স্কেচ’। লিনোকাটের কালো প্রেক্ষাপটে সাদা তরঙ্গের লেখায় যে ভাবে ছবিটি শিল্পী অঙ্কন করেছেন তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় খান সাহেবের চরিত্রের অনমনীয় কিন্তু সারল্যের দিকটি। মানুষটি যে বিনয়ী তাও ধরা যায় রেখার শান্ত নমনীয় চলন শৈলীতে।
খান আবদুল গফ্ফর খান ছিলেন পাখতুন আন্দোলনের অহিংসবাদী নেতা। প্রবল পরাক্রমশালী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইয়ের এক মাত্র অস্ত্র ছিল- অহিংসার বাণী। তাঁর এই অহিংসবাদী আন্দলনের কারণে সাহেবী তকমায় তাঁকে বলা হত ‘ফ্রন্টিয়ার গান্ধী’ । আর দেশী তকমায় তাঁকে নাম দেওয়া হয়েছিল ‘সীমান্ত গান্ধী খান’। শুধু তাই নয় মহান করুণাময় আল্লাহ্-র নাম নিয়েই তাঁর যাবতীয় লড়াই। ধর্ম নয় শান্তির বাণীই ছিল খান সাহেবের জীবনমন্ত্র। সেই ভাবনা থেকেই ১৯২৯ সালে নির্মাণ করেছিলেন ‘খুদাহি খিদমতগার’ নামের একটি সংগঠন। কথাটির অর্থ দাঁড়ায় সবাই আল্লাহ্-র সেবক। অন্যদিকে কথাটির অন্তর্নিহিত মানে হল- দেশের মানুষ না ব্রিটিশের সেবক, না ব্রিটিশের দাস। দেশের মানুষ পরম করুণাময়ের সেবক আর দেশ হল পরম করুণাময়ের জাগ্রত পূন্য ভূমি।
এই ভাব ধারাকেই ছবির ভেতরে ঢুকিয়ে দিলেন নন্দলাল এক অদ্ভূত উপায়ে। দূর প্রাচ্যের চীনা- জাপানি লিপি লেখ নিয়ে যে মানুষটির দখল প্রশ্নাতীত সেই মানুষটিই এবার যেন একটু ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মধ্য প্রাচ্যের আরবি-ফার্সি লিপি নিয়ে। ছবিটির মধ্যে সুতোর মত বুনে দিলেন আরবি হরফ। মনে হয় যেন ‘আলিফ’ চর্চায় মেতে উঠেছেন শিল্পী। আসলে এবার মধ্য প্রাচ্য যেন শিল্পীর মনে বাসা বাঁধতে চাইলো। ছবিতে ঢুকে যায় হরফের ইতিহাস। মনে পড়ে যায় ওটোমান রাজত্বের ইব্রাহিম মুনিফের কথা। যিনি ‘দিওয়ানি’ লিপির নকশায় মুগ্ধ করেছিলেন বিশ্ববাসীকে। আরও মনে পড়ে যায় বসরা এবং কুফত নগরী পত্তনের সাথে সাথে মধ্য প্রাচ্যে তৈরি হল ‘কুফি অক্ষরমালা’। এ সব অক্ষরমালার কেউ বাতাসের রেখা- মরুভূমির বুকে, কেউ সমুদ্রের ঢেউ যুক্ত, কেউবা আবার খাপখোলা তলোয়ার। এবার শুধু মাত্র সীমান্ত গান্ধীর ছবিটি বানাবেন বলে এসব নিয়ে মেতে উঠলেন নন্দলাল। নতুন ভাবে বুঝতে পারলেন ‘প্রাচ্য এক’। তাই দেখা গেল আবদুল গফ্ফর খানের রেখাচিত্র ও লিনোকাটেই সযুক্ত করলেন আরবি ক্যালিগ্রাফির বিন্যাস।
বিশিষ্ট শিল্পকলা-ঐতিহাসিক সত্যজিৎ চৌধুরী জানাচ্ছেন- ‘নন্দলালের করা আবদুল গফ্ফর খানের এই লিনোকাট মাধ্যমের অনবদ্য প্রতিকৃতিটি ঠায় দেখতে দেখতে কিছু আরবি হরফ নজরে আসে। ভালো করে পরীক্ষায় ধরা যায়- কলম না তুলে গোটা লেখাঙ্কন সম্পূর্ণ করার নিয়ম নন্দলাল মানেননি। আরবি লিপিকলার প্রসিদ্ধ কোনো শৈলীর সঙ্গে তাই এ কাজ হুবহু মেলানো যাবে না। একে বরং আরবি লেখাঙ্কনের স্বাধীন- সছন্দ প্রয়োগ বলা যায়। নন্দলাল আরবি-ফার্সি ক্যালিগ্রাফির ঢেউ খেলানো রেখার ঋজুতা, নমনীয়তা ও নানা চিহ্নের খোঁচ নিপুণ ভাবে কাজে লাগিয়ে এই ছন্দোময় প্রতিকৃতিটি সৃষ্টি করেছেন। রেখার তরঙ্গে বিভিন্ন আরবি-ফার্সি হরফের আভাষ নজরে এলেও মাত্র একটি শব্দ “আ ল্লা হ্” নির্দিষ্ট ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।’
গলার নীচে, বুকের পাশে, জামার হাতায় বা কুর্তার নীচের দিকে ‘আল্লাহ্’ শব্দের বিন্যাস পড়তে পারা যায়। আসলে নন্দলাল বোঝাতে চেয়েছিলেন যে আবদুল্ল গফ্ফর খান হলেন একজন ঈশ্বর প্রেমি সন্ত ও বিপ্লবী। তাই তাঁর গোটা শরীর জুড়েই শিল্পী বুনে দিয়েছিলেন পরম করুণাময় ঈশ্বরের নাম। হঠাৎ কাপড়ের ভাঁজ থেকে কিংবা অঙ্গ-প্রতঙ্গের কোনও জায়গা থেকে সহসাই যেন পড়তে পারা যায় সেই করুণাময়ের নাম।