
ভাবনা ও রূপায়ণে জয় আইচভৌমিক
‘জীবনের ওঠাপড়া যেন গায়ে না লাগে’ – লাইনটা শুনলেই কীসের কথা মনে পড়ে বাঙালির? ‘বঙ্গ জীবনের অঙ্গ বোরোলিন’। ‘উল্টে দেখুন, পাল্টে গেছে’ আজও কি এই লাইনখানা ভুলতে পেরেছে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি? না! উল্টে দেখুন, পাল্টে গেছে শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আনন্দলোক পত্রিকার প্রচ্ছদ। এই সব ক্যাচলাইনের নেপথ্যে ছিল রাম রে-র রেসপন্স ইন্ডিয়া গ্রুপ। রেসপন্স-র বিজ্ঞাপন মানেই ছিল নজরকাড়া ক্যাচলাইন। গুঁড়ো মশলার বিজ্ঞাপনে বলা হত যোগ করলে গুণে বাড়ে, আবার ‘সাধ্যের মধ্যে সিদ্ধালাভ’ ছিল রিয়েল এস্টেট সংস্থার ক্যাচলাইন। রেসপন্সের কপিরাইটার হিসেবে বেশ কিছু চমকপ্রদ ক্যাচলাইন লিখেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। রবীন্দ্রনাথ থেকে প্রেমেন্দ্র মিত্র, শ্যামল গুপ্ত থেকে রাজশেখর বসু, সত্যজিৎ রায় থেকে নারায়ণ দেবনাথ, বাংলা সাহিত্যের দিকপালেরা বিজ্ঞাপন জগতে কপিরাইটার হিসেবে কাজ করেছেন, কেউ ক্যাচলাইন লিখেছেন কেউ বা ছবি এঁকেছেন। মৃত্যুঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়, রঘুনাথ গোস্বামীর মতো অ্যাডম্যানরা সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা বিজ্ঞাপনের ইতিহাসকে।
বাংলা বিজ্ঞাপনের কিছু স্মৃতিধন্য ক্যাচলাইন বা ট্যাগলাইন নিয়ে অনুষ্ঠিতব্য অভিনব এই প্রদর্শনীর নাম দেওয়া হয়েছে বাংলা বিজ্ঞাপনের পঙক্তি ভোজন, লাইনে আসুন! ভাবনা ও রূপায়ণে বাংলা বিজ্ঞাপনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব জয় আইচভৌমিক।
‘ভালো রান্না করতে লাগে একটুখানি কুকমি’ বা ‘ছোট্ট টিপ হালকা লিপস্টিক আর যামিনী’ অথবা ‘গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা, কেসি পালই ভরসা’ – বাঙালির মনে গেঁথে গেছে। কুকমির আরেকটি ক্যাচলাইন ছিল, ‘সবার রুচিকেই কুকমি পরিতৃপ্ত করে’ (১৯৬৮, কাফি খাঁ-র আঁকা বিজ্ঞাপন)। সানরাইজের ট্যাগলাইন ছিল, ‘উৎসবের আনন্দ সম্পূর্ণ করে তোলে সানরাইজ গুঁড়ো মশলা’। গরম পড়লেই মনে পড়ে, ‘মুখে দিলে গোলে যায় আহারে কি পুষ্টি!’ কোয়ালিটির এই ক্যাচলাইন যেন অমোঘবাণী হয়ে রয়েছে আজও। গত শতকের শেষ লগ্নে মার্গো এক মারাত্মক ক্যাচলাইন ব্যবহার করত, ‘দেখতে খারাপ, মাখতে ভালো।’ ‘পুরো মাখন’ প্রায় বছর দশেক আগে বাটার বাইট বিস্কুটের বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হয়েছিল এই ক্যাচলাইন। ‘কেনাকাটার আনন্দ নিকেতন শ্রীনিকেতন’, ‘এলিট মানে পায়ে পায়ে আনন্দ’, ‘এমামি চোখে জল মুখে হাসি’—নিছক ক্যাচলাইনের পরিচিতি ভেঙে এগুলো এখন বাঙালির স্মৃতির দলিল।
কেবল গত শতক আরও পিছিয়ে যেতে হয়। কলকাতায় প্রথম সোডা ওয়াটারের প্রচলন হয়েছিল ১৮১১ সালে। তখন বিলেত থেকে সোডা আমদানি করায় অন্যতম ছিল টালক কোম্পানি। তারা এই সোডা ওয়েটারের বিজ্ঞাপনে লিখত, উৎকৃষ্ট পানীয় ও হজমের মহৌষধি। বলাবাহুল্য এটিই তাদের ক্যাচলাইন ছিল। সিকে সেনের জবাকুসুম তেলের জন্য ক্যাচলাইন লিখেছিলেন শরৎ পন্ডিত- এটি সাধনে জবাকুসুম আর ঐটি হল প্রসাধনে জবাকুসুম। হেমেন্দ্রমোহন বসুর কুন্তলীন তেলের প্রচারে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন-
কেশে মাখ কুন্তলীন
রুমালেতে দেলখোস
পানে খাও তাম্বুলীন
ধন্য হোক্ এইচ বোস।

এমন বহু ব্র্যান্ডের হয়েই ট্যাগলাইন লিখেছিলেন রবি ঠাকুর। ১৯৭৫ সালে অলউইন কোম্পানির ফ্রিজ কলকাতায় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। অলউইনের বিজ্ঞাপনে লেখা হত, গুণে অতুলনীয়, প্রকারভেদে অদ্বিতীয়। আপাতভাবে সাধারণ পণ্য, সেগুলোর নির্মাতা বা উৎপাদকেরাও ক্যাচলাইন ব্যবহার করত। বঙ্গলক্ষ্মী হারিকেন চিমনির বিজ্ঞাপনে লেখা হত ‘বাংলার গৌরব বঙ্গলক্ষ্মী’। ব্রাইটলাইট হ্যারিকেনের বিজ্ঞাপনে লেখা হত নিরাপদ নির্ভরযোগ্য উজ্জ্বল। তথাকথিত ক্যাচলাইন হিসেবে হয়ত এদের জন্ম হয়নি। তখনকার বিজ্ঞাপন একটা দাবি করা গোছের ব্যাপার থাকত, আজও তাই-ই যে যার নিজের পণ্যকেই সেরা বলে দাবি করেন। তবে বিশ শতকের বিজ্ঞাপনে দাবির ব্যাপারটা থাকত সরাসরি। ডি. গুপ্ত টনিকের লেবেলে কাঠখোদাইয়ের লেখা থাকত ‘ফলেন পরিচায়তে’। ওটাই তাঁদের ট্যাগলাইন। ডা: সি মজুমদারের অ্যান্টি ব্যাকটিনের বিজ্ঞাপনে লেখা হত, ‘বিনা কষ্টে বিনা অস্ত্রে রোগমুক্তি’। কুইনাইনের সঙ্গে সরাসরি রেষারেষি করে বিজয়া বটিকার বিজ্ঞাপনে লেখা হত- ‘কুইনাইন খাইয়া যে জ্বর যায় নাই, বিজয় বটিকায় সহজে ও শীঘ্র তাহা বন্ধ হইবে।’ আদতে নিজেদের উৎকৃষ্ট দাবি করে যা লেখা হত, সেটাই ব্র্যান্ডের ট্যাগলাইন হয়ে উঠত।

সে যুগের ট্যাগলাইন ভাষাও ছিল সহজ, সরল, গতিময়। ১৩৬১ সনের ভারতবর্ষ পত্রিকায় ছাপা সানলাইট সাবানের বিজ্ঞাপনে লেখা হত, ‘দ্রুত-ফেনিল সানলাইট না আছড়ে কাচলেও সাদা ও ঝকঝকে করে দেয়’। কাপড় কাচার আরেক সাবান ছিল অ্যাসকো সাবান। তাদের ট্যাগলাইনটি বেশ সাদামাটা ছিল, ‘অ্যাসকো সাবানে কাচাই সহজ’।
আদতে বিজ্ঞাপন একটি সহজ, সরস ও স্বতন্ত্র শিল্পমাধ্যম। যেকোনও পণ্যের বিজ্ঞাপনে মিশে থাকে মেধা ও সৃজনশীলতা, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত ছবিতে, পণ্যের ক্যাচলাইনে। তিন থেকে চারটি শব্দের একটা বাক্য, তাতেই কেল্লাফতে। ক্যাচলাইন যত ছোটো আর বুদ্ধিদীপ্ত হবে ততই মানুষকে আকর্ষণ করবে, সব মিলিয়ে বিক্রি বাড়বে। তবেই না ক্যাচলাইনের সমার্থকতা। বিজ্ঞাপনের এমন অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ক্যাচলাইন নিয়ে এবার প্রদর্শনী আয়োজিত হতে চলেছে কলকাতা শহরে। বাংলা বিজ্ঞাপনের কিছু স্মৃতিধন্য ক্যাচলাইন বা ট্যাগলাইন নিয়ে অনুষ্ঠিতব্য অভিনব এই প্রদর্শনীর নাম দেওয়া হয়েছে বাংলা বিজ্ঞাপনের পঙক্তি ভোজন, লাইনে আসুন! ভাবনা ও রূপায়ণে বাংলা বিজ্ঞাপনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব জয় আইচভৌমিক। বাংলা বিজ্ঞাপন নিয়ে সম্ভবত এমন উদ্যোগ এই প্রথম আয়োজিত হচ্ছে। যাকে কেন্দ্র করে সমাজ মাধ্যমে রীতিমতো সাড়া জাগানো উৎসাহ, উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে।
বিগত কয়েক বছরে বাংলা বিজ্ঞাপনের ক্যাচলাইন হিন্দি ভাষার মেধাহীন বাংলা অনুবাদে জর্জরিত হতেও দেখেছি আমরা। বছর দুই আগে, কলকাতার রাস্তায় সর্বত্র বড়ো বড়ো করে হোর্ডিং পড়েছিল বেসরকারি একটি গাড়ি-কোম্পানির,। যেখানে কপিতে লেখা ছিল, “ভরোসা কোরে দেখুন”। হিন্দিতে মূল ট্যাগলাইন “ভরোসা কর কে দেখো”। এবার আপনারাই বলুন, এভাবে কি ভরসা করা যায়? বিষয়টি খেয়াল করলে দেখা যাবে হিন্দির উচ্চারণের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বাংলা ভাষায় সেটি করা হয়েছে “ভরোসা”, করে বানান ‘কোরে’। সাধারণ অক্ষর ও ভাষাজ্ঞান না থাকলে এই সাধারণ ভুলটা কেউ করতে পারে না।

বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোকে মনে রাখতে হবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যর পাশাপাশি বিজ্ঞাপনের ক্যাচলাইনে মিশে থাকে মেধা, শিল্পভাবনা ও নান্দনিকতা। কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন সমাজ ও সময়ের দলিলও হয়ে ওঠে। ক্যাচলাইনগুলোই সময়ের সফরের সাক্ষ্য বহন করে। কপিরাইটার তাঁর সমস্ত ভাবনা শক্তি, উদ্ভাবনী শক্তি ঢেলে দেন তবে জন্ম হয় দৃষ্টিআকর্ষণী ক্যাচলাইনের। তাদের মধ্যে কোনও কোনওটা কালোত্তীর্ণ হয়ে যায়। ক্যাচলাইনগুলো থেকে তদানিন্তন সময়ের ভাষার আদত রূপ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। ক্যাচলাইনের ভাষা যদি হয় বাংলা, তখন সত্যিই ‘এ স্বাদের ভাগ হবে না’। বাংলা বিজ্ঞাপনের ইতিহাস কয়েকশো বছরের প্রাচীন, হাজারও পণ্যের জন্য হাজার হাজার ক্যাচলাইন বা ট্যাগলাইন তৈরি হয়েছে বাংলা ভাষায়। পণ্যটি হয়তো হারিয়ে গেছে (উৎপাদন বন্ধ হয়েছে) বা জনপ্রিয়তা হারিয়েছে কিন্তু ক্যাচলাইন আজও জনপ্রিয় মানুষের মনে। তাই বাংলা বিজ্ঞাপনের সে’ব ইতিহাস ঐতিহ্যকে চাক্ষুষ করতেই ‘লাইনে আসুন!’ -প্রদর্শনীতে ঢুঁ মারতেই পারেন।
প্রদর্শনীর পাশাপাশি বিজ্ঞাপন নিয়ে প্রকাশিত হবে বাংলা বিজ্ঞাপনের মিনি গদ্য সংগ্রহ, তাতে লিখেছেন ৫৪ জন লেখক। প্রদর্শনীটি আরম্ভ হবে ১২ এপ্রিল সন্ধে ৬টায়, মায়া আর্ট স্পেস-এ। চলবে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত, ১৩ এবং ১৪ এপ্রিল দুপুর দু’টো থেকে রাত আটটা অবধি।
