চার্লস ডিকেন্সের চিঠিতে কলকাতা

বাইশ বছর বয়সী ডিকেন্স-পুত্র এখন কলকাতার সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমেট্রিতে

আপনি কি জানেন কেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্স তাঁর ছেলেকে কেন কলকাতায় পাঠিয়েছিলেন? 

ভিক্টোরীয় যুগের বিশিষ্ট ঐতিহাসিক চার্লস ডিকেন্স। তাঁর পেনের আচড়েই সৃষ্ট হয়েছে ইংরেজি সাহিত্যে প্রবাদপ্রতিম বেশ কয়েকটি উপন্যাস ও চরিত্র। তার মধ্যের উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলি হল – ডেভিড কপারফিল্ড, আ টেল অব টু সিটিজ, অলিভার টুইস্ট, দ্য ওল্ড কিউরিয়োসিটি শপ ইত্যাদি। কিন্তু এই স্রষ্টা কখনও কি ভেবেছিলেন, তাঁর নিজের ছেলেও একদিন ইতিহাসের পাতায় একটি চরিত্র হয়ে যাবে? সুদূর ইংল্যান্ডে বসবাসকারী চার্লসের জীবনে কলকাতা একটি গভীর দাগ কেটে যাবে, ভেবেছিলেন চার্লস ডিকেন্স? 

চার্লস ডিকেন্সের একটি দুঃখের স্মৃতি ধারণ করে রেখেছে কলকাতা। এই বিশিষ্ট ঐতিহাসিকের কাছে কলকাতার পরিচয় পুত্রবিয়োগের স্থান হিসাবে। কেন পাঠিয়েছিলেন চার্লস তাঁর পুত্র ওয়াল্টার ল্যান্ডার ডিকেন্স’কে কলকাতায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাইলে, যেতে হবে কলকাতার সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমেট্রিতে। 

কলকাতায় বৃষ্টির সূচনা হয়ে গেছে। সাউথ পার্ক স্ট্রিটে এখন ঘুরতে গেলেই এই দৃশ্য দেখা যায়। একদল ছোট-ছোট ছেলে জলের মধ্যেই ফুটবল খেলছে। এরা বেশির ভাগই সমাধিস্থলে কর্মরত লোকজনের ছেলে। এখানেই শায়িত আছেন আরেক ‘দুষ্টু ছেলে’ ডিকেন্স ওয়াল্টার ল্যানডোর। তিনি বিখ্যাত ঔপন্যাসিক চার্লস ডিকেন্সের দ্বিতীয় পুত্র। তাঁর এই ছেলে ধুলো ও কাদায় খেলতে ভালোবাসত। কিন্তু আজ সেই ছেলের সমাধিতেই অবহেলার ছাপ। প্রায় মুছে যেতে বসা নামলিখন, আর ভেঙে যাওয়া স্তম্ভ মনে করিয়ে দেয় এক ইতিহাসের কথা।

চার্লসের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন ডিকেন্স ওয়াল্টার ল্যানডোর। চার্লস তাঁর এই আদরের ছেলে বিদেশ-বিভুঁইয়ে পাঠিয়েছিলেন দেশের সেবা করতে। তখন ভারতবর্ষ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে। ইতিমধ্যে শুরু হল সিপাহী বিদ্রোহ। এমন অবস্থায় বিদ্রোহ দমন করার জন্য ইংল্যান্ড থেকে একের পর সেনাবাহিনী বোঝাই জাহাজ ভিড়তে শুরু করল কলকাতায়। আর এই বাহিনীতেই দেশের হয়ে লড়তে আসেন চার্লস ডিকেন্সের ছেলে। কিন্তু যুদ্ধে নামার আগেই অসুখে মৃত্যু হয় ওয়াল্টারের।

সেইসময় কলকাতা ছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হেডকোয়ার্টার। ইংল্যান্ড থেকে আগত ব্রিটিশ সেনাদের প্রথমে কলকাতায় থাকতে হত। তারপর সেখান থেকে বিভিন্ন স্থানে। ওয়াল্টারকে চিঠি পাঠিয়ে নিযুক্ত করেছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাদল। কিন্তু কলকাতায় আসার পর থেকেই ওয়াল্টারের শরীর ভালো চলছিল না। ক্রমাগত রক্তবমির জন্য ভর্তি হলেন সেনাবাহিনীর হাসপাতালে। আর সেখানেই ১৮৬৩ সালে মাত্র বাইশ বছর বয়সে মারা যান। ওয়াল্টারের দেহকে সমাধিস্থ করা হয় ভবানীপুরে সেনাবাহিনীর নিজস্ব সমাধিস্থলে। দীর্ঘদিন এই কথা কলকাতার মানুষের কাছে বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। এরপর ১৯১১ সালে হঠাৎ নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত একটি খবর বিশ্বের তথা কলকাতার মানুষের কাছে এই ইতিহাসের পাতা উন্মোচন করে। এই পত্রিকায় ‘ডিকেন্সের সেনাপুত্র’ নামে একটি লেখা প্রকাশিত হয়। আর সেখানেই উল্লিখিত হয় যে, ডিকেন্সের পুত্রের দেহ সমাধিস্থ আছে কলকাতা ভবানীপুরের সেনাবাহিনীর সমাধিস্থলে।

এবার অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এই সমাধি ভবানীপুর থেকে সাউথ পার্ক স্ট্রিট সমাধিস্থলে এল কী করে? এক্ষেত্রে বলে রাখি, ব্রিটিশ যুগের এই সেনাসমাধিস্থলটি অনেকবছর আগেই বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে ১৯৮৭ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী তাদের প্রিয় লেখক পুত্রের এই সমাধিটি সরিয়ে নিয়ে যায় সাউথ পার্ক স্ট্রিট সেমেট্রিতে। এখন সাউথ পার্ক স্ট্রিটে গেলে দেখা মেলে এই সমাধির।

প্রিয় পুত্রের আকস্মিক মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছিলেন ডিকেন্স। তিনি পুত্রকে উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লিখেছিলেন। এই চিঠিতে উল্লিখিত আছে কলকাতার কথা। আর অকালে ফুরিয়ে যাওয়া একটি জীবনের কথা, যার ভবিষ্যৎ কী হতে পারত, জানে না কেউই। শুধু শেষ চিহ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গেল আমাদের শহরের নাম।

Post Tags
Developed by DXDasia