বাবার সঙ্গে ছিন্ন হল সম্পর্ক, তবু পছন্দের মানুষকেই বিয়ে করলেন লীলা মজুমদার

আজ লীলা মজুমদারের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী

ছোটোবেলা থেকেই খেয়ালি কল্পনার প্রতি আগ্রহ। পরিণত বয়সেও সে অভ্যাস ছিল পুরোদমে। বানানো গল্প আর মিথ্যে কথার পার্থক্য কী, স্পষ্ট করে বুঝতে সময় লেগেছিল। কৈশোরে বানিয়ে বানিয়ে কল্পনার মোড়কে ঘটনার বিবরণ দিয়ে মায়ের বকা খেয়েছেন অনেকবার। বেশ দুরন্তও ছিলেন তখন। দাদা-দিদিকে ধরে পেটাতেন। মার খেতেন মায়ের কাছে। তাঁর গোটা সাহিত্যকীর্তি জুড়েই শিশুসুলভ দুষ্টুমি ছড়িয়ে আছে।

বলছি লীলা মজুমদারের কথা। জন্মের সময় অবশ্য ‘মজুমদার’ ছিলেন না। কলকাতার বিখ্যাত রায় পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। বাবা প্রমদারঞ্জন। কাকা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। খুড়তুতো দাদা সুকুমার রায়।

শিলংয়ের পাহাড় ঘেরা পরিবেশে শৈশব কেটেছে লীলার। ফ্যান্টাসিকে উসকে দেওয়ার সব রকম উপাদান সেখানে ছিল। দুটো পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বইলে গোঁ গোঁ শব্দ হত। ছোট্ট লীলার মনে হত, ওইখানে কোনও গোপন জায়গায় শিকল দিয়ে দৈত্য বাঁধা আছে, ছাড়াবার চেষ্টা করছে। শিলংয়েই লরেটো স্কুলেই তাঁর ছাত্রজীবন শুরু হয়। বাবা কলকাতায় বদলি হলে গড়পার রোডে উপেন্দ্রকিশোরের বাড়িতে চলে আসেন। পড়াশোনা চলতে থাকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন। দার্জিলিংয়ের এক স্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন আরম্ভ করলেও রবীন্দ্রনাথের ডাকে চলে যান শান্তিনিকেতনে। কিছুদিন কলকাতার আশুতোষ কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। যুক্ত ছিলেন বেতারেও।  

১৯৩৩ সালে হার্ভার্ড ফেরত দাঁতের ডাক্তার সুধীরকুমার মজুমদারকে বিয়ে করেন লীলা। পাত্র তিনি নিজেই পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু হিন্দুর সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দিতে রাজি ছিলেন না গোঁড়া ব্রাহ্ম প্রমদারঞ্জন। লীলার সঙ্গে তিনি সব সম্পর্ক ছিন্ন করেন। অবশ্য বিয়েতে হাজির থেকে আশীর্বাদ করেন খোদ রবীন্দ্রনাথ।

‘সন্দেশ’ পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়েছিল কাকা উপেন্দ্রকিশোরের হাত ধরে। যা তখন বাংলার শিশুসাহিত্যে বিপ্লব আনে। সাহিত্যচর্চায় লীলারও হাতেখড়ি হয় এই পত্রিকাতেই। ১৪-১৫ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প ‘লক্ষ্মীছাড়া’। পরে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় সহ-সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন। 

লেখালেখি ছাড়াও রান্না করতে ভালোবাসতেন লীলা মজুমদার। নানা রকম রেসিপি নিয়ে লিখে ফেলেন ‘রান্নার বই’। সব মিলিয়ে তাঁর বইয়ের সংখ্যা ১০০-র বেশি। তার মধ্যে আছে ‘বদ্যিনাথের বাড়ি’, পদপিসির বর্মিবাক্স’, ‘হলদে পাখির পালক’, ‘মাকু’, ‘টংলিং’-এর মতো অসংখ্য মণিমাণিক্য।  ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’, ‘আনন্দ পুরস্কার’, ‘দেশিকোত্তম’-সহ নানান সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

২০০৭ সালের ৫ এপ্রিল লীলা মজুমদার আমাদের ছেড়ে চলে যান। আজ তাঁর ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই কিংবদন্তি সাহিত্যিকের প্রতি রইল বঙ্গদর্শনের শ্রদ্ধার্ঘ্য।

তথ্যঋণ – আনন্দবাজার আর্কাইভ 
 

Developed by DXDasia