ঘাটের কথা : বাগবাজার-কুমোরটুলি-শোভাবাজার-আহিরীটোলা
মুঠোফোনে থাকা অ্যাপ জানান দিচ্ছে শহরে গরমের অনুভূতি ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাপিয়ে গিয়েছে, কিন্তু পঞ্জিকা বলছে চৈত্র মাস অর্থাৎ ঘোর বসন্ত। শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া আর শিমূল গাছগুলো ছাড়া আর কেউ কি বসন্তের আসা-যাওয়া টের পায়? সদা ব্যস্ত, ছুটে চলা এই কলকাতায় কি বসন্ত আসে?
আসে। কেবল আসেই না! ৩৬৫ দিন বিরাজ করে ঋতুরাজ। কংক্রিট আর কর্পোরেট ডেডলাইনের এই শহরে বসন্তের আনাগোনা দেখা যায় পড়ন্ত বিকেলের গঙ্গার ঘাটে। জীবন থেকে রং নিয়ে মহানগরের গঙ্গার ঘাটগুলো যেন রঙিন হয়ে ওঠে শেষ বিকেলের রোদে। মস্ত এক প্যালেট হয়ে ওঠে কলকাতা। জীবনের রঙে টইটম্বুর তুলির আঁচড় গিয়ে পড়ে ব্যস্ত দিনের ক্যানভাসে। ফুটে ওঠে দৃশ্যকল্প। ধরা দেয় ভারতবর্ষ, যে ভারতের আদত সম্পদ বৈচিত্র্য আর বহুত্ববাদ।

গঙ্গার ঘাট দেখেই মনে হল যেন কোনও দরবেশের আলখাল্লা। নানা রঙের কোলাজ। কলেজে পড়া তরুণ-তরুণী, সদ্য কর্মজীবনে প্রবেশ করা যুবক-যুবতীদের ভিড়। গোটা সপ্তাহের ক্লান্তি মেটাতে তাঁরা যেন ‘রিফ্রেশ’ হতে এসেছেন।
কলকাতার বয়স কয়েকশো বছর। জোব চার্নকের পা রাখা থেকে করোনা অতিমারি, সিরাজের আক্রমণ থেকে আমফান; সব সহ্য করেছে এ শহর। সেসব স্মৃতি আগলে রেখেছে আবহমানকাল ধরে বহমান গঙ্গা এবং তার ঘাটগুলো। কত কত কাহিনি তারা লুকিয়ে রাখে। জোয়ার-ভাটা আসে, জল এসে ধাক্কা দেয় সিঁড়িতে। দিনবদল হয়। নতুন নতুন গপ্পের জন্ম হয় রোজ। প্রতিটি বিকেল যেন সেই গল্পে রঙিন ‘ইলাস্ট্রেশন’ এঁকে দিয়ে যায়। বাগবাজার-কুমোরটুলি-শোভাবাজার-আহিরীটোলা; এই চত্বরে বেশ কয়েকটি ঘাট রয়েছে। বিকেল হলেই সেখানে লাল-নীল-সবুজের মেলা বসে। এমনই এক মেলার দেখা মিলল কুমোরটুলি ঘাট-এ, চৈত্রের এক রবিবাসরীয় বিকেলে।
আরও পড়ুন: গঙ্গার তুমি ছুঁয়ে আছো জনপদের ইতিহাস
গঙ্গার ঘাট দেখেই মনে হল যেন কোনও দরবেশের আলখাল্লা। নানা রঙের কোলাজ। কলেজে পড়া তরুণ-তরুণী, সদ্য কর্মজীবনে প্রবেশ করা যুবক-যুবতীদের ভিড়। গোটা সপ্তাহের ক্লান্তি মেটাতে তাঁরা যেন ‘রিফ্রেশ’ হতে এসেছেন। কুড়িয়ে নিয়ে যেতে এসেছেন আগামী সপ্তাহের রসদ। কেউ প্রেমিকের কথা শুনছেন মন দিয়ে, কারও কারও মুখে হাসি, কেউ কেউ অভিমানে মুখ ফুলিয়ে আছেন। কারও মুখ ভার, কেউ হেসে গড়িয়ে পড়ছেন। কোনও প্রেমিক তাঁর প্রেমিকার ডিপি বদলানোর ছবি তুলে দিতে ব্যস্ত, একের পর এক ভঙ্গিতে ছবি তোলার হুকুম জারি হচ্ছে। বাধ্য প্রেমিক সে হুমুক তামিল করে গেলেন। প্রেমিকাদের শাসনে কেউ কেউ মুখ কাচুমাচু করে বসে রইলেন। কেউ কেউ স্রেফ ঝগড়াই করে গেলেন। কারও প্রেম হয়তো দানা বাঁধলো, কারও প্রেমের ঘুড়ি ভোকাট্টা হয়ে গেল।
একটু বিকেল গড়াতেই ঘাটে এসে বসলেন শঙ্কর ভট্টাচার্য, বছর সত্তরের এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ। তাঁর পেশা পৌরহিত্য। তাঁর আগমনের হেতু খোদ্দের ধরা। সকালবেলা আশেপাশের ঘাটে তিনি শ্রাদ্ধ-শান্তির কাজ করান। বললেন, “সন্ধ্যাটা এসে বসি। বহু লোক আসে। যজমান পাওয়া যায়।”

রূপচাঁদ পক্ষী এবং তাঁর দলবল থেকে একুশ শতকের প্রণয়-অভিজিৎ মাধ্যম বদলালেও জীবনের উদযাপন একই রয়েছে এ ঘাট-পাড়ায়।
অন্যদিকটায় তখন একের পর এক গান চলছে। রূপম ইসলাম, অনুপম রায়, সিধু, কবীর সুমন, শিলাজিৎ… সবই বাংলা গান। বছর আঠারো থেকে পঁচিশ বছর বয়সীই হবেন তাঁরা। মূলত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অনেকেরই হাতে গিটার। আমাদের সঙ্গে কথা বললেন, প্রণয় কুণ্ডু। প্রণয়ের বয়স আঠারো। গিরিশ পার্কে থাকেন, কলেজ পড়ুয়া। প্রায় বছর পাঁচেক ধরে তিনি নিত্যদিন এই ঘাটে আসছেন। গান-বাজনা করছেন। বললেন, “আমাদের আগের জেনারেশন এসেছে। আমরাও আসছি।” ততক্ষণে গান শুরু হয়ে গেল। ‘এই একলা ঘর আমার দেশ…’ গলা মেলালেন প্রণয়। প্রায় জনা পনেরো ছেলে। সকলেই গাইছেন। ঘাটে বসে থাকা অন্যান্যরা কেউ তাল দিচ্ছেন, কেউ বারবার ঘুরে দেখেছেন। কেউ কেউ নিজেদের কথায় মশগুল। আলো আরেকটু কমে এল। অনুপম রায়ের ‘বোবা টানেল’ শুরু হল কোরাসে। অভিজিৎ রায়ের সঙ্গে কথা হল। অভিজিৎ প্রায় তিন বছর ধরে আসছেন। গান গাইছেন। এঁরা কেউই কাউকে চিনতেন না আগে থেকে, এঁদের বন্ধুত্বের মাধ্যম হল গঙ্গার ঘাট ও গান। একদল তরুণের সুর আর গঙ্গার মৃদু-মন্দ হাওয়ায় এভাবেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল।
প্রজন্মের পর পর প্রজন্ম জুড়ে একদল তরুণ কীভাবে গানে গানে রঙিন সন্ধ্যা নামানোর দায়িত্ব নিয়ে নিল জানি না! প্রণয়রা একদিন যুবক হবেন, কর্মজীবনের ব্যস্ততায় হয়তো বন্ধ হবে ঘাটে আসা। আরেক দল তরুণ এসে পড়বে। তাঁরা দায়িত্ব নেবেন গঙ্গার ঘাটে রঙিন সন্ধ্যা আনার। রূপচাঁদ পক্ষী এবং তাঁর দলবল থেকে একুশ শতকের প্রণয়-অভিজিৎ মাধ্যম বদলালেও জীবনের উদযাপন একই রয়েছে এ ঘাট-পাড়ায়।
আরও পড়ুন: আদিগঙ্গার ইতিহাস
একদিকে যখন গিটারে সুর তোলা হচ্ছে, তখন কাগজে জীবন্ত হয়ে উঠছে গঙ্গার ঘাটের দৃশ্য। শুভেন্দু বণিক ও তাঁর স্ত্রী সুস্মিতা বণিক এসেছিলেন মানিকতলা থেকে। দুজনেই চিত্রশিল্পী। তিন-চার বছর যাবৎ তাঁরা আসছেন। শুভেন্দু পোর্ট্রেট আঁকছিলেন। তাঁদের সঙ্গে এসেছে দুই ছাত্র, সপ্তম শ্রেণির পড়ুয়া শুভঙ্কর নাগচৌধুরী এবং নবম শ্রেণির সৌমিক গুঁই। শুভঙ্কর ও সৌমিক, দুজনেই এঁকে চলল।

যে যার মতো কাজ করে চলছেন, কেউ ল্যাপটপে লিখছেন। কেউ ফোনে এই সব মুহূর্তকে বন্দি করতে ব্যস্ত। সারমেয়কুল রাজার মতো বিচরণ করছে। মালাইকুলফিওয়ালা মাথায় হাঁড়ি নিয়ে হাঁক পারছেন, চা বিক্রেতারা জিজ্ঞাসা করে যাচ্ছেন ঘনঘন। আঁধার নামার আগে সবটুকু চেটেপুটে শুষে নিতে চাওয়া এক ব্যাকুলতাও চোখে পড়ল সব্বার মধ্যে।
দিনের দুই সময়ে গঙ্গার ঘাটের চরিত্র বদলে যায়। ভোর থেকে দুপুর অবধি সে যেন বার্ধ্যকের বারাণসী। বিবর্ণ এক সাদাকালো ক্যানভাস। জীবন দর্শন উপলব্ধি করার জীবন্ত ‘টেক্সট বুক’। বিকেল হলেই সে ছটফটে তরুণ, বেণীআসহকলা-য় রেঙে ওঠা ক্যানভাস। ছোটো ছোটো কোলাজে বোনা জ্যান্ত ভারতবর্ষ। নিঃশব্দে, নীরবে বয়ে চলা গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে বিকেলের ঘাটগুলো বলে ওঠে বেঁচে থাকা জিন্দাবাদ। জীবন জিন্দাবাদ।