আলিপুর চিড়িয়াখানার হেরিটেজ হাউস (শেষ পর্ব)
ময়মনসিংহ এনক্লোজার
প্রায় উনিশ হেক্টর এলাকা নিয়ে আজও উজ্জ্বল আলিপুর চিড়িয়াখানা। ইংরেজদের পাশাপাশি এই চিড়িয়াখানা গড়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে ভারতীয় বিশেষত বাঙালিদের বিশাল অবদান। ১৮০০ সাল। তখন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি। সর্বপ্রথম তাঁরই মাথায় এসেছিল একটি জুওলজিক্যাল গার্ডেন নির্মাণের কথা। কিন্তু তাঁর এই চিন্তা কার্যকর হয়নি। কেটে গিয়েছিল কয়েক দশক। তদ্দিনে প্রয়াত হয়েছেন গভর্নর সাহেব। অতঃপর ব্যারাকপুরে তাঁর বাগান বাড়িতেই একটি ছোটোখাটো পশুশালা গড়ে তোলা হয়েছিল। উল্লেখ্য, এটিই হল ভারতের প্রথম চিড়িয়াখানা। কেটে যায় আরও কয়েক বছর। ইতিমধ্যে ইংল্যান্ডে বেশ কয়েকটি চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এ বার ব্রিটিশ সরকার কলকাতায় চিড়িয়াখানা গড়ে তোলার জন্য নড়েচড়ে বসল। ১৮৭৩ সালে তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যর রিচার্ড টেম্পল কলকাতায় একটি চিড়িয়াখানা স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিছু ইতিহাস বলছে, জোসেফ বার্ট, যিনি সে সময় এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেঙ্গলের সভাপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন, তিনিই সর্বপ্রথম ১৮৬৭ সালে একটি চিড়িয়াখানা তৈরির প্রস্তাব দেন। কিন্তু জায়গার অভাবে সেই প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছিল। এর পর ১৮৭৩ সাল নাগাদ কার্ল লুইস চিড়িয়াখানা গঠনের প্রস্তাব দেন। কিন্তু জায়গার অভাবে সেই প্রস্তাবও বাতিল করা হয়। পরবর্তীকালে যেহেতু ইংল্যান্ডের ব্রিটিশ সরকার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিল, তাই চিড়িয়াখানা স্থাপন জরুরি হয়ে ওঠে। ১৮৭৫ সালে স্যর রিচার্ড টেম্পল চিড়িয়াখানা স্থাপনের জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। ওই বছরেই ২ অক্টোবর কলকাতার জিরাট বস্তিতে ১৫৬ বিঘা ১৮ কাঠা ৯ ছটাক জমি অধিগৃহীত হয়। পরের বছর ১ জানুয়ারি থেকে এখানেই শুরু হয়ে যায় চিড়িয়াখানা তৈরির কাজ।
প্রাথমিক ভাবে চিড়িয়াখানা নির্মাণের জন্য বরাদ্দ টাকার অঙ্ক ছিল ৫,০০০। ব্যারাকপুরে লাটবাগানের পুরোনো চিড়িয়াখানা থেকে কিছু পশুপাখিও নিয়ে আসা হয়। ১৮৭৬ সালে ১ জানুয়ারি জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চিড়িয়াখানা উদ্বোধন করা হয় এবং উদ্বোধন করতে এসেছিলেন স্বয়ং ইংল্যান্ডের রাজা প্রিন্স অফ ওয়েলস সপ্তম এডওয়ার্ড। কলকাতা চিড়িয়াখানা তো উদ্বোধন হলো ঠিকই কিন্তু প্রয়োজন ছিল পশুপাখির, সেই প্রয়োজন মেটানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল তৎকালীন পরিচালন কমিটি।
আর সর্বপ্রথম ভারতীয় হিসাবে যে ব্যক্তি অর্থ সাহায্য করেছিলেন তিনি হলেন চোরবাগানের রাজেন্দ্র মল্লিক বাহাদুর এবং সেই মতো তার নামে একটি পশু কক্ষও নামাঙ্কিত হয় – “মল্লিক হাউস”। চিড়িয়াখানার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগেই তাঁর বাসভবন মার্বেল প্যালেসের ঠিক পাশেই গড়ে তুলেছিলেন একটি বন্যপ্রাণ সংরক্ষণশালা ও পাখিরালয় (Aviary)। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শহরের মানুষজনকে বাংলার প্রাণীবৈচিত্র সম্পর্কে অবহিত করা।
প্রথমে মল্লিক হাউসে “ওটারস” অর্থাৎ ভোঁদড়রা থাকত। পরে এই বাড়িটি পশুরাজ সিংহদের থাকার অনুকূল করে তোলা হয় এবং এর জন্য খরচ হয়েছিল প্রায় ৩৫০০০ টাকা। যা পুরোটাই বর্ধমানের মহারাজা দান করেছিলেন। আলিপুর চিড়িয়াখানায় এখনও বিশেষ একটি প্রজাতির সিংহদের বাসভবন হিসেবে থেকে গিয়েছে “মল্লিক হাউস”।
“এজরা হাউস”, “স্বর্ণময়ী হাউস” -এগুলির কথা আগের পর্বেই আলোচনা করা হয়েছে। এই সমাপ্তি পর্বে থাকলো আলিপুর চিড়িয়াখানার অন্যান্য হেরিটেজ হাউসগুলির কথা।
চিড়িয়াখানা গড়ে তোলার জন্য প্রথম দিকে কার্ল লুইস শোয়েন্ডলারের (Carl Louis Schwendler) ব্যক্তিগত পশু উদ্যান থেকে পশুপাখি নিয়ে আসা হয়েছিল। ১৮৭৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি আলিপুর চিড়িয়াখানার জন্য তিনি বেশ কয়েকটি ভিন্ন প্রজাতির তিতির, সাধারণ বন্য পাখি, মুনাল, বনমোরগ, ময়ূর প্রদান করেন। ওই বছরই একই মাসে আরো কিছু পাখি দেন। কার্ল লুইস জাতিগতভাবে ছিলেন একজন জার্মান, যিনি ভারতীয় রেলস্টেশনে বৈদ্যুতিকরণ বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। তাঁর নামেও চিড়িয়াখানায় একটি পক্ষিগার রয়েছে। যার নাম- শোয়েন্ডলার হাউস (The Schwendler House)।

শোয়েন্ডলার হাউস (The Schwendler House)
শুধু লুইস সাহেবই নয়, ময়মনসিংহের রাজা সূর্যকান্ত আচার্যের সম্মানে ওপেন এয়ার টাইগার এনক্লোজার গড়ে তোলা হয়, যার নামকরণ করা হয়েছিল “ময়মনসিংহ এনক্লোজার” (The Mymensing Enclosure)।
“মুর্শিদাবাদ হাউস”। এই বাড়িটিকে একসময় “পাখিদের স্বর্গ” বলা হত। বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান পাখিদের দেখা মিলতে পারে এখানে। এই বাড়ি নির্মাণে অর্থ সাহায্য করেছিলেন মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুর।

মুর্শিদাবাদ হাউস

বাকল্যান্ড এনক্লোজার
গ্রীষ্মকালে চিড়িয়াখানায় গেলেই দেখতে পাওয়া যায়, পাঁচিল ঘেরা একটি বাড়ির সামনের জলাশয়ে সারাক্ষণ গা ডুবিয়ে বসে আছে একটি অথবা একাধিক জলহস্তি। এই ডেরাটি মূলত তাদের কথা ভেবেই তৈরি করা হয়েছিল। জলহস্তিদের ব্যাক্তিগত এই ডেরাটির নাম- বাকল্যান্ড এনক্লোজার (The Buckland Enclosure), যা তৈরি হয়েছিল সি.টি. বাকল্যান্ডের স্মরণে। চিড়িয়াখানার শুরু থেকে যাঁর অবদান অনস্বীকার্য। আলিপুর জু’র সভাপতির পদও সামলেছিলেন দীর্ঘদিন।
তথ্যসূত্রঃ kolkatazoo.in