কলকাতার প্রাচীনতম বইয়ের দোকানঘর এবার বিনামূল্যের লাইব্রেরি

দোকানটি কলকাতা পুরসভার কাছ থেকে পেয়েছে গ্রেড-২ হেরিটেজের স্বীকৃতি

বই পড়া এক অর্থে অন্য জগতের সঙ্গে যোগ স্থাপন করা বা অন্য জগতে পৌঁছে যাওয়া। বই আমাদের পারিপার্শ্বিক জগতকে কিছুক্ষণের জন্য একেবারে ভুলিয়ে দেয়। বইয়ের মাধ্যমে পাঠক পৌঁছে যান কল্পনার সাম্রাজ্যে অথবা বাস্তব জগতের ভিন্ন সময়কালে। কলকাতার ১৩৮ বছরের পুরোনো বইয়ের দোকান, দাশগুপ্ত অ্যান্ড কোম্পানি (Dasgupta and Company), এখন পাঠকের সামনে যেন খুলে দিয়েছে ইতিহাসে ফেরার দরজা। কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে অবস্থিত এই দোকানটিকে বাইরে থেকে এলাকার বাকি সব বইয়ের দোকানের মতনই দেখায়। কিন্তু সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে, এই দোকান আজ কলকাতার প্রাচীনতম বইয়ের দোকান হিসাবে খ্যাত। দুটি বিশ্বযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম, নকশাল আন্দোলনের সাক্ষী এই দোকান। ১৮৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত দাশগুপ্ত অ্যান্ড কোম্পানির দরজা আজও সব পাঠকদের জন্য খোলা। দোকানে ঢোকার মুখেই চোখে পড়বে একটি তালিকা, যেখানে লেখা রয়েছে প্রতিদিন এই দোকানে ভিড় করা মানুষের হিসেব এবং অন্যান্য বিশদ বিবরণ। দোকানে ঢোকার পর নতুন আর পুরোনো বইয়ের গন্ধ পাঠক মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে। কড়িবরগার ছাদ, বইয়ের তাক, বইয়ের কাউন্টার, দোকানের কর্মচারী, সবকিছুই আপনাকে নস্টালজিক করে তুলবে।

অরবিন্দ দাশগুপ্ত

দোকানটির অ্যাকাউন্টস বিভাগ এবং টিফিন ঘরটি একটি ছোটো অডিটোরিয়াম রূপে গড়ে উঠতে চলেছে, যা ব্যবহার করা যাবে বিভিন্ন বই প্রকাশের অনুষ্ঠানের জন্য। এছাড়াও সেখানে থাকবে একটি আর্কাইভ-কাম-মিউজিয়াম এবং একটি লাইব্রেরি, যেখানে থাকবে বিনামূল্যে বই পড়ার সুযোগ। অরবিন্দ দাশগুপ্ত (Arabindo Das Gupta) হলেন বর্তমানে এই দোকানের অন্যতম মালিক। তিনি, দোকানটির প্রতিষ্ঠাতা, গিরিশ চন্দ্র দাশগুপ্তের বংশধর। এটিই একমাত্র বইয়ের দোকান, যার মালিকানা বংশপরম্পরায় রক্ষিত হয়েছে/ যার মালিকানার হাতবদল হয়নি।

তাঁদের লক্ষ্য দোকানের কাজ সম্পূর্ণ করে দুর্গাপুজোর আগেই লাইব্রেরি আর অডিটোরিয়াম আর লাইব্রেরিটি সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া। লাইব্রেরিতে প্রথম অবস্থায় বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় মোট ১০,০০০টি বই থাকবে। জানা গেলো, অনেকেই তাদের সংগ্রহের বই, এই লাইব্রেরিতে বিনামূল্যে দান করেছেন।

অরবিন্দবাবু বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “আমরা অনেকদিন ধরেই পরিকল্পনা করছিলাম। কিন্তু কোভিড এবং তহবিল ঘাটতির কারণে পরিকল্পনাটি এতোদিন বাস্তবায়িত করা যাচ্ছিল না। বই পড়ার ঘর এবং লাইব্রেরিটি সবার জন্য খোলা থাকবে। ঘরটিতে প্রবেশ করার জন্য এবং বই পড়ার জন্য কোনো খরচ করতে হবে না। ঘরটিতে ১০০ জনের বসার বন্দোবস্ত থাকছে। অনেকে বলেন, বর্তমান প্রজন্ম বই পড়তে তেমন উৎসাহ বোধ করে না। এখনকার বাচ্চাদের না কি বই পড়ার ইচ্ছা এবং মনঃসংযোগ নেই। আমরা এই মিথ ভাঙতে চাই। আমরা দেখাতে চাই, বর্তমান প্রজন্ম বইবিমুখ তো নয়ই, বরং সঠিক উদ্যোগ নেওয়া হলে তাঁদের উৎসাহ আরও বাড়বে। বহু শিশু পড়াশোনা চালাতে পারে না, শুধুমাত্র তাদের পরিবারের, শিশুটিকে বই কিনে দেওয়ার ক্ষমতা নেই বলে। আমাদের বইয়ের দোকানের দরজা তাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে চাই। তারা এখানে আসবে, বিভিন্ন বই পড়বে, নতুন বিষয় সম্পর্কে জানবে এবং তাদের পছন্দের বিষয় নিয়ে চর্চা করার সুযোগ পাবে। পাঠকদের ক্লাস করানো হবে। অনেকেই বইয়ের কোনো নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সম্পর্কে বুঝতে না পারলে আমাদের প্রশ্ন করেন। আমরা সবসময় তার সঠিক উত্তর দিতে পারি না, বিভিন্ন কারণে। তাই আমরা ক্লাসের আয়োজন করবো, যেখানে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা আসবেন, পাঠকদের জিজ্ঞাসার উত্তর দেবেন। আমরা চাই না, বইয়ের অপ্রতুলতা শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াক।”

অরবিন্দ দাশগুপ্ত এবং সঞ্জীব অধিকারী

 

তিনি আরও যোগ করেন, “বাংলা মিডিয়ামে পড়াশোনা করার কারণে অনেকেই বিভিন্ন ইংরেজি শব্দের সঠিক অর্থ বুঝতে সমস্যায় পড়েন। অনেকে কঠিন বাংলা শব্দের সঠিক অর্থ বুঝতেও অনেকে সমস্যায় পড়েন। এই দুই ভাষার মধ্যে সামঞ্জস্য রাখার জন্য আমরা লাইব্রেরিতে বাংলা-থেকে-ইংরেজি এবং ইংরেজি-থেকে-বাংলা ডিকশনারি রাখছি। ভাষা কিছুক্ষেত্রে জ্ঞানের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমরা সেই বাধা কমানোর চেষ্টা করবো।”

তাঁদের লক্ষ্য দোকানের কাজ সম্পূর্ণ করে দুর্গাপুজোর আগেই লাইব্রেরি আর অডিটোরিয়াম আর লাইব্রেরিটি সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া। লাইব্রেরিতে প্রথম অবস্থায় বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় মোট ১০,০০০টি বই থাকবে। জানা গেলো, অনেকেই তাদের সংগ্রহের বই, এই লাইব্রেরিতে বিনামূল্যে দান করেছেন। সপ্তাহের প্রতিটি কাজের দিনে এই বিনামূল্যের লাইব্রেরিটি দুপুর থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। লাগোয়া একটি ছোটো অডিটোরিয়ামে করা যাবে বইপ্রকাশ সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠান। একটি আর্কাইভাল সেন্টার-ও খোলা হবে। সেখানে বহু পুরোনো এবং দুষ্প্রাপ্য রেকর্ড রাখা থাকবে। এমন অনেক রেকর্ডও থাকবে, যা ২০০৪ সালে এই দোকানে লাগা আগুনের গ্রাস থেকে বাঁচানো গিয়েছিল। থাকবে বেশ কিছু প্রাচীন জিনিসও। যেমন- লন্ডন থেকে আনা প্রাচীন তুলাযন্ত্র, একটি সুইস দেওয়াল ঘড়ি, ১৯৪১ সালের টেলিফোন ইত্যাদি। 

প্রভু মাহাতো

প্রভু মাহাতো (Prabhu Mahato) এই দোকানের অন্যতম পুরোনো কর্মচারী। তিনি এই দোকানে কাজ করছেন ১৯৭৮ সাল থেকে। তিনি এই দোকানের সমস্ত ইতিহাস জানেন। বন্যার সময়, তিনি অনেক বই নষ্ট হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। দোকানটির দুই তলা ভর্তি বিভিন্ন বিষয়ের বই। প্রভু মাহাতো প্রতিটি বইয়ের সঠিক অবস্থান বলে দিতে পারেন চোখ বুজে। সঞ্জীব অধিকারী (Sanjib Adhikari) দোকানের হিসাবের বিষয়টি এবং অন্যান্য কাজ দেখেন। রঞ্জন দাশগুপ্তের (Ranjan Das Gupta) কাছে পাওয়া যাবে দোকানের সব বাংলা বইয়ের হদিশ। তিনি বাংলা বই বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী। তিনি নিঁখুতভাবে বলে দিতে পারেন, কোন বাংলা বই দোকানের কোন অংশে রাখা আছে। গোটা দোকানের পরিবেশ এতটাই শান্ত এবং সুখকর, যে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কোথা দিয়ে কেটে যায়, বোঝাই যায় না।

রঞ্জন দাশগুপ্ত

শহরের কেন্দ্রস্থলে কীভাবে একটি বইয়ের দোকান চালাতে হয়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ দাশগুপ্ত অ্যান্ড কোম্পানি। এখানে বই পড়ার অর্থ একাধারে জ্ঞানচর্চা এবং বিনোদন। বর্তমানে প্রযুক্তির অগ্রগতির কারণে বাজারে এসে গেছে পিডিএফ বই। আছে অনলাইনে বই পড়ার বিভিন্ন উপায়। কিন্তু বইপোকারা একবাক্যে স্বীকার করেন, একটি পেপারব্যাক বা হার্ডবাউন্ড বই পড়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাদের কোনো তুলনাই চলে না। অরবিন্দবাবু বললেন, “আমরা গত ১৩৮ বছরে অনেক ওঠাপড়া, অনেক বদল দেখেছি। আমার বিশ্বাস, যাই হোক না কেন, দাশগুপ্ত অ্যান্ড কোম্পানি সব সমস্যার মোকাবিলা করতে পারবে।” কলকাতা পুরসভা দাশগুপ্ত অ্যান্ড কোম্পানিকে গ্রেড-২ হেরিটেজ স্ট্রাকচার হিসাবে মর্যাদা দিয়েছে এবং সেই স্বীকৃতি স্বরূপ একটি নীল রঙের স্মারক দিয়েছে। 

কলকাতা পুরসভার দ্বারা প্রদত্ত স্মারক

বইয়ের দোকান হিসাবে যাত্রা শুরু করে শিশুদের জন্য লাইব্রেরি খোলা। এই যাত্রাপথ প্রমাণ করে তাঁরা এই পথে কতদূর হেঁটে এসেছেন। তাঁদের এই উদ্যোগ শিশু এবং অন্যান্য বয়সী পাঠকদের সাহায্য করবে বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা এবং জ্ঞানচর্চায়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দাশগুপ্ত অ্যান্ড কোম্পানি বাংলা এবং বাঙালিদের আরেকবার গর্বিত করলো। জ্ঞানের ক্ষুধা মানবতার কাছে সর্বোত্তম উপহার। দাশগুপ্ত অ্যান্ড কোম্পানির মত এমন বিনামূল্যের লাইব্রেরি আরও বেশি করে দরকার, যেখানে মানুষ গিয়ে পড়াশোনা এবং জ্ঞানচর্চা করার সুযোগ পাবেন।

ইংরেজিতে মূল লেখাটি পড়তে ।        

Post Tags
Developed by DXDasia