অসুবিধা কোথায়, সমাধানই বা কি?
‘পরিবেশবান্ধব’, ‘ইকো ফ্রেন্ডলি’ শব্দগুলোর সঙ্গে পরিচিত হলেও গুটি কয়েক সচেতন মানুষ ছাড়া শহুরে নাগরিকদের জীবনযাপনে এর প্রভাব নেই। শহরের সঙ্গে গ্রামের পার্থক্য ছিল, আছে। গ্রামের নিরিবিলি, ধীরগতি, বিশুদ্ধ জল-বাতাসে শরীর ও মনের নকশা আলাদা হতে বাধ্য। ঠিক এভাবে শহরে চরিত্রও আলাদা। তথাকথিত ভাবে এগিয়ে থাকা, ইঁদুর দৌড়ে সামিল কলকাতায় সুযোগ সুবিধা যেমন বেশি, মানসিক চাপও অত্যধিক। কী খাব-কেন খাব, কোনটা খাঁটি, কোনটা ভেজাল –ইন্টারনেট ও ডায়েটসর্বস্ব যুগে এসবের খানিক ধারণা থাকলেও ‘কোন পাত্রে খাবো’ তা নিয়ে ভাববার অবকাশ নেই অধিকাংশ শহরবাসীর।

পুরোনো দিনে উৎসব-অনুষ্ঠানে কলাপাতা, মাটির গ্লাসে খাবার পরিবেশনের রীতি
অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, রাস্তাঘাটে যত জঞ্জাল পড়ে থাকে, তার একটি বড়ো অংশই এই থার্মোকল ও প্লাস্টিক৷ তা থেকে বুজে যাচ্ছে নালা-নর্দমা, যা পরিবেশবিদদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে৷ থার্মোকলের প্রধান বিপদ সেগুলি পুরোপুরি নষ্ট হয় না৷
নয়ের দশকের শেষ থেকে পুজো, জন্মদিন, বিয়ে, পিকনিক, অনুষ্ঠানের প্রীতিভোজে কলাপাতা, শালপাতার পরিবর্তে প্লাস্টিক, থার্মোকলের থালা ব্যবহারে জোয়ার আসে। ব্যবহারে সুবিধা, দামেও সস্তা; অতএব হু হু করে বাড়লো চাহিদা। তার প্রভাব পড়লো প্রকৃতির উপর। অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, রাস্তাঘাটে যত জঞ্জাল পড়ে থাকে, তার একটা বড়ো অংশই এই থার্মোকল ও প্লাস্টিক৷ তা থেকে বুজে যাচ্ছে নালা-নর্দমা, যা পরিবেশবিদদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে৷ থার্মোকলের প্রধান বিপদ সেগুলো পুরোপুরি নষ্ট হয় না৷ একবার প্রক্রিয়াকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কলকাতা পুরসভার ১১৫ নম্বর ওয়ার্ডে৷ যে প্রকল্পে সহযোগিতা করছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়৷ সেসময় অধ্যাপক সাধন কুমার ঘোষ জানিয়েছিলেন, প্লাস্টিক, কাপড়, কাচ-সহ অন্যান্য শুকনো বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা করা গেলেও থার্মোকল প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা এখনও করা যাচ্ছে না৷

সুপারি খোলের থালাবাটি
ঠিক এই জায়গা থেকেই ২০১৬ সালে ‘গ্রীন অরবিট’ নামে একটি ব্র্যান্ড শুরু করেছিলেন হাওড়া বাগনান নিবাসী দেবাশিস ঘোষ। এই মানুষটির সূত্রেই পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে পরিবেশবান্ধব সুপারিপাতার প্লেটের প্রথম পরিচয়। আগে টেকনিশিয়ান হিসেবে নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে সার্ভিসিং-এর কাজ করতেন। প্রকৃতিপ্রেম তার সঙ্গে নিজে স্বাধীনভাবে কিছু করার তাগিদেই পেশা পরিবর্তন করেন। তামিলনাড়ুর এক ব্যাক্তির কাছে এই কাজ শিখে নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন ১০০ শতাংশ পরিবেশ বান্ধব থালাবাটি নির্মাণে। কিন্তু, এ ক’বছরের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলছেন, পরিবেশবান্ধব থালাবাটির চাহিদা এখনও সেভাবে তৈরি হয়নি। তার মধ্যে চাহিদা বেশি গ্রাম-মফস্সলে, কলকাতায় ‘রেসপন্স’ নেই। জেলায় জেলায় ঘুরে নিজস্ব উদ্যোগে নিজের মতো কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
বঙ্গদর্শন.কম-কে দেবাশিস বলেন, “আসলে সুপারি খোলের থালাবাটির দামটা একটু বেশি। তাই প্রোডাকশনও অনেক কমে গেছে। এছাড়া আরও কিছু সমস্যা আছে। সুপারি খোলের জিনিস নিয়ে কয়েকজন কিছুটা অসৎ ভাবে ব্যবসা করতে গিয়ে এর বাজার নষ্ট করেছে বিশেষত কলকাতায়। অনেকেই নিজে না বানিয়ে কর্ণাটক, তামিলনাড়ু থেকে সুপারি খোলের রেডিমেড থালাবাটি আনাতো, দামও তুলনামূলক ভাবে কম রাখার চেষ্টা করেছিল কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই সেইসব প্রোডাক্টে ভেজাল থাকতো। কলকাতার ওই নকল বাজারে ঢোকার কোনও ইচ্ছে ছিল না আমার। সরে আসি সেখান থেকে। আগে যাদবপুর, গড়িয়াহাট, লেক মার্কেটে সুপারি খোল ও সিয়ালি পাতার থালাবাটি রেখে দেখেছিলাম, রেসপন্স পাইনি। কোনও কোনও দোকান থেকে যতগুলো রেখেছিলাম ততগুলোই ফেরত আনতে হয়েছিল।”

সিয়ালি পাতা ও তার থেকে নির্মিত থালা
থার্মোকল/প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে বাজারে এখন অনেক কিছু এসেছে ঠিকই তবে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যেমন শালপাতার ক্ষেত্রে সমস্যা ‘লিকেজ’ হয়, মার্কেটে তেমনভাবে নেই। আখের ছিবড়া দিয়ে এখন যে খাবার প্লেটগুলো তৈরি হচ্ছে, সেটা ইকো ফ্রেন্ডলি হলেও টক্সিক। কারণ কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। দেবাশিসের কথায়, “সেই জন্য আমি এখন মূলত অন্ধপ্রদেশের সিয়ালি পাতা (Siali leaf) নিয়ে নতুন ভাবে কাজ করেছি। গতবছর এটা নিয়ে ‘পাইলট প্রোজেক্ট’ শুরু করেছিলাম। কিছুটা সাড়া পেয়েছি তবে, ওই আর কি! কলকাতার বাজারে কোনও চাহিদা নেই।”
কলকাতার নাগরিক তো শিক্ষিত-সচেতন, তাহলে কেন চাহিদা তৈরি হচ্ছে না বলে আপনার মনে হয়? “এটা আমার পক্ষে বলা খুব মুশকিল। বোঝার চেষ্টা করছি। সুপারি পাতার থেকে সিয়ালি পাতার দাম অনেক কম। এমনকি থার্মোকল বা প্লাস্টিকের প্লেটের সঙ্গে দামে খুব একটা ফারাক নেই। কিছুদিন আগে আমার পরিচিত একজন পলাশ পাতা দিয়ে প্লেট তৈরির পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং কিছু পলাশ পাতা পাঠিয়েও দেন। এটা নিয়েও পরীক্ষানিরীক্ষা করছি।”

দেবাশিস ঘোষের কারখানায় উৎপাদিত সিয়ালি পাতার থালা, দেবাশিস ঘোষ (ডানদিকে)
দেবাশিস জানালেন, সিয়ালি পাতা থেকে দু’ধরনের থালা বানাচ্ছেন। একটা বোর্ড যুক্ত একটু মজবুত করে বানানো, যা বাজারে ৫ থেকে সাড়ে ৫ টাকা দরে বিক্রি করেন। নিজেই জানালেন, আর একটু পরিকল্পনা করে দাম কমানোর ইচ্ছের কথা। সিয়ালি পাতা দিয়ে আর এক ধরনের থালা বানাচ্ছেন, যেটা টেবিলে পেতেই খেতে হয়, হাতে নিয়ে খাওয়া যাবে না। তবে, লিকেজ-এর ভয় নেই। এর দাম তুলনামূলক কম, ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকা।
কেন কলকাতার মানুষ পরিবেশবান্ধব থালাবাটি ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করছেন, যাদবপুর বাজারের এক ব্যাবসায়ীর কথায়, “তা বলতে পারবো না। আমরা ব্যবসায়ী, খদ্দের যা চাইবেন সেটাই তো দেবো। কলকাতার খুচরো বাজারে মোটামুটি এক একটি শালপাতার দাম পড়ে গড়ে এক টাকা৷ আর কলাপাতা মোড়া শালপাতার থালার দাম পড়ে মোটামুটি তিন টাকা৷ মাটির থালার দাম ৩০ টাকা৷ মাটির গ্লাস ছ’টাকা৷ বড়ো সাইজের মাটির বাটির দাম ছ’টাকা৷ জানা গিয়েছে, এরাজ্যে সুপারির খোল থেকে যে থালা, বাটি, গ্লাস তৈরি হচ্ছে, বাজারে তার ১২ ইঞ্চি থালার দাম ৬ থেকে ৭ টাকা, ১০ ইঞ্চি থালা পাঁচ থেকে ছ’টাকা, পাঁচ ইঞ্চি বাটির দাম তিন থেকে চার টাকা, চামচের দাম দু’টাকা৷ বাজার অনুযায়ী দামে হেরফেরও হয়। তবে এসবের তুলনায় থার্মোকলের থালাবাটি অনেক সস্তা। সেটা একটা কারণ হতে পারে।”

মৃৎ-পাত্র
লেক মার্কেটের এক দশকর্মা দোকান থেকে ছেলের অন্নপ্রাশনের জন্য শালপাতার ওপর কলাপাতা দেওয়া থাকা কিনছিলেন রাসবিহারীর এক ক্রেতা। তাঁকে পরিবান্ধব প্লেটের কথা জিজ্ঞেস করা হলে, তাঁর উত্তর “দেখুন, শালপাতা বা কলাপাতায় খাওয়া একটা পুরোনো রীতি। ছেলের মুখেভাতে একটা বাঙালি-বাঙালি ব্যাপার তো থাকতে হবে না কি! পরিবেশবান্ধব বলে কিনছি এমনটা নয়। অত কিছু জানি না। অন্যান্য অনুষ্ঠানে থার্মোকলের থালাবাটিও ব্যবহার করি।”
পরিবেশবান্ধব তৈজসপত্র ব্যবহারে কলকাতা উদাসীন কেন, উপরিউক্ত আলোচনা থেকে কিছুটা আন্দাজ আমরা পেলাম কি? বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরবঙ্গের জেলাগুলিতে ভালো সংখ্যায় সুপারি গাছ থাকায় ওই জেলাগুলিতে এমন উদ্যোগ সফল হওয়ার ভালো সম্ভাবনা রয়েছে৷ স্বনির্ভর গোষ্ঠী, ব্লক স্তরের বায়ো ডাইভার্সিটি ম্যানেজমেন্ট কমিটিগুলির মাধ্যমেও এমন উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা৷ এমনকি অযোধ্যা পাহাড়, গড় পঞ্চকোটের মতো পুরুলিয়ার পর্যটনস্থলগুলিকে প্লাস্টিকমুক্ত বলে ঘোষণা করার পর পর্যটক বা স্থানীয়দের থার্মোকলের বদলে সিয়ালি পাতার প্লেট প্রস্তুত ও সরাবরাহের উদ্যোগ নেয় বন দপ্তর। আসলে, পরিবেশকে বাঁচাতে সকলের চেষ্টা তখনই সফল হবে যখন ব্যক্তি মানুষের সার্বিক উন্নতি হবে ও সচেতনা বাড়বে। আপাতত, লড়াই জারি রেখে সুদিনের স্বপ্ন দেখা ছাড়া আমাদের কিছু করার নেই।
______________
ছবি : দেবাশিস ঘোষ
সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লেখা