উদ্যোক্তা কলকাতা কমিকস প্রকাশনা
শীতের অলস দুপুর, রোদে বসে কমলালেবু খেতে খেতে হাঁদা ভোঁদা, নন্টে ফন্টের মজার কীর্তি বা বাঁটুল দি গ্রেটের বীরত্বের কাহিনি পড়তে পড়তে কল্পনার জগতে ভেসে যাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই ছোটোবেলার প্রিয় স্মৃতিগুলোর অন্যতম। ছবি আর কল্পকথার মিশেলে সৃষ্ট কমিকস ছোটো-বড়ো সকলেরই প্রিয়। দেশ-বিদেশের কমিকস আর পপ সংস্কৃতিকে এক ছাদের তলায় এনে নতুন বছরের শুরুতেই ৩-৫ জানুয়ারি কলকাতার ধনধান্য প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল কলকাতা কমিকস কার্নিভাল ২০২৫ (Kolkata Comics Karnival)। বিভিন্ন কমিকস বই, স্টিকার, কমিকস চরিত্রের নানান অস্ত্রশস্ত্র (মার্চেন্ডাইজ) প্রভৃতি স্টলের পাশাপাশি তিনদিন ব্যাপী এই কার্নিভালে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা, কমিকস বিষয়ক খেলাধুলোয় মেতে রইলো শহরের কমিকস প্রেমীরা।

বিশ্বক্ষেত্রে কমিকসের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় ইউরোপীয় কমিকসের পথচলা শুরু ১৮২৭ সালে সুইস কার্টুনিস্ট রোডলফ টেফারের মাধ্যমে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কমিকসের সূচনা ১৮৯০-এর দশকে রিচার্ড এফ.আউটকল্টের কার্টুন স্ট্রিপ দ্য ইয়েলো কিডের মাধ্যমে। যদিও তা নিয়েও মতবিরোধ আছে। বাংলায় কমিকসের শুরু ঠিক কবে থেকে তা চিহ্নিত করা বেশ শক্ত। অনেকেই মনে করেন মন্দিরের গায়ের টেরাকোটা, পটচিত্র ইত্যাদি বাংলা কমিকসের আদিরূপ। তবে বাংলা কমিকস বলতেই মনে পড়ে নারায়ণ দেবনাথ, শৈল চক্রবর্তী, সুবীর রায়, কাফি খাঁ (প্রফুল্লচন্দ্র লাহিড়ী) প্রমুখ লেখক-শিল্পীদের নাম। পাশাপাশি টিনটিন, ফ্যান্টম,সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান প্রভৃতি বিদেশি কমিক চরিত্রদেরও আপন করে তুলেছে বাঙালি।

বাঙালির এই কমিকস প্রেমকেই আরও উস্কে দিয়ে ২০২০ সাল থেকে আয়োজিত হচ্ছে কলকাতা কমিকস কার্নিভাল। কার্নিভালের উদ্যোক্তা তথা কলকাতা কমিকস প্রকাশনার কর্ণধার শুভময় কুণ্ডু বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কমিকস আর পপ কালচার বিষয়ক সবকিছুকে এক ছাদের তলায় নিয়ে আসার জন্যই এই আয়োজন। নতুন, পুরোনো সব ধরনের কমিকস বইয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন মার্চেন্ডাইজ, স্টিকার সবকিছুই এখান থেকে সংগ্রহ করা যায়, তাই তিনদিন মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার কমিকসপ্রেমী মানুষ ভিড় করেছেন এই কার্নিভালে। মানুষের উৎসাহ দেখে স্টলের সংখ্যাও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবে।” বই না মার্চেন্ডাইজ কোনটার চাহিদা বেশি? এই প্রসঙ্গে কলকাতা মেট্রো স্টলের পক্ষ থেকে কৌস্তভ চৌধুরী জানান, “এখন মানুষের কাছে বই পড়ার থেকে ভিডিও বেশি জনপ্রিয়, তাই শিশু থেকে সদ্য যুবা সকলেই কমিকস বই থেকে কমিকস সংক্রান্ত জিনিসের প্রতি বেশি আগ্রহী।”
বিশ্বায়নের যুগে ইন্টারনেটের দৌলতে বিদেশি কমিকসের সঙ্গে আরও পরিচিত হয়েছে বাঙালি। শুধু বই নয়, টিভি বা ইউটিউবে এখন হাঁটাচলা করে স্বপ্নের চরিত্ররা। তাই বিদেশি কমিকস বই, কমিক চরিত্রদের অস্ত্রশস্ত্র, স্টিকারের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে মানুষের।
কিন্তু কমিকস কি শুধুই ছোটোদের জন্য? এই প্রসঙ্গে শুভময় জানান, “কমিকস নেহাতাই শিশুতোষ ব্যাপার নয়, প্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তমনস্কদের জন্য বাংলায় কমিকস প্রকাশ আমাদের লক্ষ্য। এখানেও চির পরিচিত হাঁদা ভোঁদা, বাঁটুল দি গ্রেটের পাশাপাশি নতুন কমিকসের প্রতি মানুষ ঝুঁকছে।” কার্নিভালে সুকুমার রায়ের কুমড়োপটাশ, হুঁকোমুখো হ্যাংলার দেখাও মিললো একটি স্টলে।

বিশ্বায়নের যুগে ইন্টারনেটের দৌলতে বিদেশি কমিকসের সঙ্গে আরও পরিচিত হয়েছে বাঙালি। শুধু বই নয়, টিভি বা ইউটিউবে এখন হাঁটাচলা করে স্বপ্নের চরিত্ররা। তাই বিদেশি কমিকস বই, কমিক চরিত্রদের অস্ত্রশস্ত্র, স্টিকারের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে মানুষের। এর স্পষ্ট ছাপ উঠে এল এই কার্নিভালে। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল কসপ্লে। যেখানে পছন্দের চরিত্রের সাজে হাজির হয় কমিকপ্রেমীরা। কার্নিভালে শুধু কেনাকাটা নয়, খেলাধুলো কুইজ সবকিছুই খুব আকর্ষণীয় বলে মনে করেন কার্নিভালে আসা এক তরুণী। তাঁর কথায় এই তিনদিন কলকাতার শীতের উৎসবগুলোর মধ্যে এক নতুন সংযোজন।
বাস্তব যে সীমানায় শেষ হয়, সেখান থেকেই শুরু হয় কল্পনার উড়ান। মনে মনে সেখানে হারিয়ে যাওয়া যায় অনেক দূরে, করে ফেলা যায় এমন অনেককিছু যা বাস্তবে কখনোই করা সম্ভব নয়। তাই রবি ঠাকুরের কবিতার তালগাছটার মতোই মনে মনে উড়তে সাধ হয় আট থেকে আশি সকলের। কলকাতাবাসীর সেই সাধই পূরণ করে চলেছেন কলকাতা কমিকস কার্নিভালের উদ্যোক্তারা। তাই তিনদিনের এই উৎসবে এসে নিজের কল্পনার জগতকে ছুঁয়ে গেলেন সব বয়সের নাগরিকরাই। কলকাতার উৎসবে লাগলো কল্পনার নতুন রং।