কিশোরগঞ্জ

‘আমরা কখনো বারোয়ারী পূজাতে যাইব, একথা ভাবিতেই পারিতাম না’

নীরদচন্দ্র চৌধুরী 
বাংলা ১৩০৪ সনের ৯ই অগ্রহায়ণ, ইংরাজি ১৮৯৭-এর ২৩শে নভেম্বর আমার জন্ম হয়, তদানীন্তন পূর্ববঙ্গের কিশোরগঞ্জে।

কিশোরগঞ্জ সেই সময়ে পূর্ববঙ্গের ময়মনসিংহ জেলার একটি মহকুমা শহর ছিল। শুনিয়াছি এখন এটি জেলা হইয়াছে। তখন কতকগুলি মহকুমা লইয়া একটি জেলা হইত। সেই সময়ের মহকুমার সরকারী অধিকর্তা হইতেন একজন সাব ডিভিসনাল অফিসার, সংক্ষেপে এস.ডি.ও। তিনি পদাধিকারে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হইতে পারিতেন, আবার আই.সি.এস-এর লোক হইতেও বাধা ছিল না। এই কিশোরগঞ্জেই আমি জন্মকাল হইতে আমার বারো বছর বয়স পর্যন্ত, শৈশব ও বাল্যজীবন কাটাই।

পূর্ববঙ্গের মফঃস্বল শহর যেমন হইত, কিশোরগঞ্জ শহরটিও সেইরূপ ছিল। পাকাবাড়ি ছিল খুবই কম। ভদ্রলোকের পাকাবাড়ি বোধ হয় ছয়-সাতটার বেশি ছিল না। আর বাদবাকী বাড়ি ছিল টিনের। টিনের চাল। সাধারণত মেঝে মাটির হইত। দেওয়াল দরমার। দরমা মোটা নয়, পাতলা ও সূক্ষ্ম কাজের হইত, কাঠের ফ্রেমে আটকাইয়া দেওয়াল তৈরী হইত। ঘরগুলি দেখিতে খারাপ হইত না। তাছাড়া ঘরের ভিতরে চালের নিচে সিলিং থাকিত, কখনও দরমার, কোন সময়ে কাপড়ের। সেজন্য ঘরগুলি গরমেও কষ্টকর হইত না।

সকল বাড়িতেই বাইরের মহল এবং অন্দরমহল সম্পূর্ণ পৃথক হইত। অন্দরমহলের চারিদিক বেড়া দিয়া বন্ধ থাকিত। বেড়াও দরমার হইত। সুতরাং বাইরের মহল হইতে ভিতর মহলে আসিতে হইলে মাঝখানে একটি দরজার ভিতর দিয়া আসিতে হইত। দরজার সামনে একটি নিচু বেড়া থাকিত। তাহা টপকাইয়া আসিতে হইত। অমনি সোজা চলিয়া আসার উপায় ছিল না। আর বাহির হইতে ভিতরের কিছু বিশেষ দেখাও যাইত না।

আমাদের বাড়ির বাহিরের মহলের সামনে একটি উঠান ছিল, ভেতরেও আর একটি উঠান ছিল। বাড়ির পেছনে অনেকখানি খোলা জায়গা ছিল। তাহার খানিকটা ছিল জঙ্গল। বাকীটা ছিল খালি জমি। পূর্বদিকে আমাদের অন্য বাড়ি, কিন্তু পশ্চিম দিকে সম্পূর্ণ এক সারি কলাগাছ। আর আরও কাছে পাঁচটা তালগাছ বাড়ির কাছে ভিতরের দিকে ছিল। ইহাতে বুঝিতে পারা যাইবে আমাদের বাড়িটা জমি সহ কতটা বড় ছিল। আমাদের বাড়ির সমস্ত জমির পরিমাণ ছিল প্রায় একশত বিঘার মত।

আমারা বাড়ির সামনের দিকে বাস করিতাম। পিছনের দিকে নয়। বহির্মহলে একটা বাড়ি ঘর ছিল। উহাকে আমরা কাছারিঘর বলিতাম। আর ভিতর-মহলে উঠানের চারিদিকে চারটি ঘর। এই চারটি ঘরের মধ্যে একটিকে আমরা ‘নিরামিষ ঘর’ বলিতাম। কারণ আমার পিসিমা বা অন্যান্য বিধবাদের কেউ আসিলে ঐ ঘরে রান্নাবান্না করিতেন। আর উত্তরদিকে ছিল আমাদের রান্নাঘরটি। আর দুটি ঘর ছিল শোবার ও বসিবার। প্রথমে রান্না হইত কাঠের উনানে। তাহার পর কয়লা আসিল, কয়লার উনান চালু হইল।

এই হইল আমাদের দেশের বাড়ি।

এখন কিশোরগঞ্জ শহরটি সেই সময়ে কিরকম ছিল বলা যাক। শহরটি একটি নদীর দুধারে। নদীটাই যেন শহরটির মেরুদন্ডের মত। এক সময় এই নদীটি খুব বড় ছিল। ব্রহ্মপুত্র হইতে ধেনু নামে আর একটি নদী সেখানে আসিয়া পড়িত, কিন্তু আমাদের সময়ে সেটা শুকাইয়া গিয়াছিল। কারণ যে স্থান হইতে ধেনু নদীটি বাহির হইয়াছিল নেই জায়গাটা বুজিয়া গিয়াছিল। কিন্তু তৎসত্ত্বেও আমাদের নদীটির গ্রীষ্মকালেও বোঝা যাইত, প্রায় সিকি মাইল চওড়া ছিল। আমরা দেখিয়াছি নদীর উত্তরদিকে একটা রাস্তা গিয়াছে, আবার অপর পারেও এই রকম একটা বড় রাস্তা। দুটি রাস্তার ব্যবধান প্রায় সিকি মাইলের মতো ছিল।

গ্রীষ্মকালে নদীটি একটি ছোট নালার মতো হইয়া যাইত। এমন কি আমাদের এদিকের রাস্তাতেও এক ফুট দুই ফুট পর্যন্ত জল আসিত। মাঝে মাঝে একটু গভীর। কিন্তু বর্ষাকালে একেবারে এক ধার হইতে আর এক ধার পর্যন্ত জলে ভরিয়া যাইত। এমনকি আমাদের এদিকের রাস্তাতেও এক ফুট দুই ফুট পর্যন্ত জল আসিত। আমি সেখান হইতে অনেকদিন কপ্ কপ্ করিয়া মাছও ধরিয়া ফেলিয়াছি।

এখন শহরটি কিরূপ ছিল বলা যাক। শহরের বেশির ভাগ বাসিন্দা, বিশেষ করিয়া যাঁহাদের আমরা সমকক্ষ বলিয়া মানিতাম, তাঁহারা সকলেই ছিলেন হয় উকিল নয় মোক্তার, অর্থাৎ আইন-ব্যবসায়ী। শহরটি মহকুমা শহর বলিয়াই এইরূপ বিভিন্ন পাড়া গড়িয়া উঠিয়াছিল। আমাদের পাড়া উকিলপাড়া। সেইরূপ সরকারী চাকুরিয়ারা যে পাড়ায় থাকিতেন, সে পাড়াটিকে আমরা আমলাপাড়া বলিতাম। শহরের সত্যকার বাসিন্দা বলিয়া গণ্য করা হইত যাঁহারা গণ্যমান্য তাঁহাদেরই। ইঁহারা সবাই রাস্তার দুই ধারে নিজস্ব বাড়িতে থাকিতেন। বাড়িগুলি বেশ বড় হইত। অনেকগুলি বাড়ি ছিল, একেবারে কাছারি হইতে পূর্বদিকে নদী পর্যন্ত, আর পশ্চিম দিকেও ঐভাবে বেশ কিছু বাড়ি ছিল।

কিশোরগঞ্জে আমাদের বাজারটি ছিল নদীর ওপারে পূর্ব দক্ষিণ কোণে। সেখানে দুই দিন হাট বসিত, বৃহস্পতিবার আর রবিবার। রোজকার বাজার অবশ্য নানা জায়গায় হইত। পশ্চিম দিকে যে বাজার বসিত, তাহাকে আমরা আটচালার বাজার বলিতাম। এইরূপ কোনটিকে পুরানো থানার বাজার, কোনটিকে বিক্রমপুরের বাজার, আবার কোনটিকে ইট-থান বাজার—এই রূপ বলিতাম।

হাটবারগুলিতে, বৃহস্পতিবার ও রবিবার, চারদিক হইতে চাল, ডাল, জিনিসপত্র সবই আসিত। তাহা ছাড়া স্থায়ী দোকানও অনেক ছিল। স্থায়ী দোকান কিন্তু এইসব জিনিসের নয়, স্থায়ী দোকান ছিল মনিহারী জিনিস ও বিশেষ করিয়া কাপড়-চোপড়ের। এক কোণে একটি মদের দোকানও ছিল। যাঁহারা মদ খাইতেন তাঁহারা মদের দোকানের এক কোণে বসিয়া মদ্যপান করিতেন।

কিশোরগঞ্জে থাকাকালীন আমি কখনও জুতা পরি নাই। সব সময়ে খালি পায়ে থাকিতাম। আর স্কুলে যাওয়ার সময় ছাড়া গায়েও জামা থাকিত না। খালি পা, খালি গা, কোন সময় ধুতিটি কোমরে বাঁধা অথবা সামনে কোঁচা—এই ছিল বাড়ির নিত্যকার পোষাক।

বর্ষার সময়ে কিশোরগঞ্জের ভাটি মুলুক জলে ভাসিয়া যাইত। ভাটি মুলুকে যাহারা থাকিত তাহারা বর্ষার আগে গরু-মোষ লইয়া আমাদের বাড়ির সামনের দিকে শুকনো জায়গায় বাথান করিত। একবার একটি মোষ একজন লোককে শিং দিয়া গুতাইয়া জলে ফেলিয়া দিল। আমার বাবা মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি নিয়ম করিয়া দিলেন, মোষ গরুদের লইয়া রাস্তা দিয়া যাইতে কেহ পারিবে না। রাস্তার নিচ দিয়া যাইতে হইবে। আমরা দেখিতাম, রাস্তার নিচ দিয়া গরু ও মোষের পাল পশ্চিমদিকে চলিয়াছে। উপরে আসিবার তাহাদের উপায় নাই। আমাদের শিখানো হইল মোষকে ভয় করিতে হয়। আর বলা হইল মোষ দুই রকমের হয়, খাচর ও ভাঙড়। খাচরগুলি গুতা মারে, ভাঙরগুলি পোষা গোছের। দুই রকমের মোষই আমি দেখিয়াছি। আমাদের ওখানে সব মোষই ছিল কালো রঙের। লাল রঙের মোষ কিশোরগঞ্জে দেখি নাই।

আমি কিশোরগঞ্জে থাকাকালীন কখনও দুর্গাপূজা দেখি নাই। তাহার প্রধান কারণ হইল বারোয়ারী চাঁদা লইয়া দুর্গাপূজা কোন ভদ্রলোকের বাড়িতে হইত না। ভদ্রলোকদের প্রত্যেকের পৈতৃক বাড়িতে গ্রামে দুর্গাপূজা হইত। তাহারা সকলেই পূজার ছুটির সময়ে সেখানে চলিয়া যাইতেন। আর শহরে যে বারোয়ারী পূজা হইত, সেখানে লোকজন মুহুরী আমলারাই প্রধানত যাইতেন। আমরা কখনো বারোয়ারী পূজাতে যাইব, একথা ভাবিতেই পারিতাম না। আমি দুর্গাপূজা একমাত্র আমাদের পৈতৃক বাড়িতে দেখিয়াছি। এমন কি কোন জ্ঞাতির বাড়িতেও পূজা দেখিতে যাই নাই। আমাদের প্রত্যেকের উপর নিষেধ ছিল।

দুর্গাপূজার পর কালীপূজায় আতসবাজি, তুবড়ি, পটকা ফাটানো হইত। পটকা অপেক্ষা আতসবাজির চল বেশি ছিল। অনেকেই ভাল আতসবাজি ঢাকা বা কলিকাতা হইতে আগে আগে আনাইতেন। তবে কালীপূজা আমরা বড় একটা দেখি নাই।

সরস্বতী পূজা প্রায় সব বাড়িতেই হইত। সরস্বতী পূজার উৎসব আমরা ভাল করিয়াই উপভোগ করিতাম। এখন আমরা যাহাকে হোলি বা রঙখেলা বলি, আমাদের সময়ে এই উৎসবকে দোলযাত্রা বলিতাম। বাড়িতে বাড়িতে বড় টব বানাইয়া রঙ গোলা হইত। সেই রঙ লইয়া দোলখেলা হইত।

এই হইল কিশোরগঞ্জের জীবনযাত্রা – বৈশাখ হইতে চৈত্র পর্যন্ত।

(নীরদচন্দ্র চৌধুরীর লেখা ‘কিশোরগঞ্জ’-এর নির্বাচিত অংশ)

Developed by DXDasia