
সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ২২
১৮৫৭ সাল। মহাবিদ্রোহের বছর। এই বছরই যাত্রা শুরু করল কাটোয়া কাশীরাম দাস বিদ্যায়তনের। সেই সময়কার কাটোয়ার মহকুমা শাসক হরেকৃষ্ণ দেববাহাদুর ছিলেন এই স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা। সেই সময় এই স্কুলের নাম ছিল কাটোয়া হাইস্কুল। তার দুই বছর পর এই স্কুলের নাম বদলে হয় কাটোয়া হাই ইংলিশ স্কুল। প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত তখন এই স্কুলে পড়ানো হত। ১৯১২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কাটোয়া মহকুমার কৃতী সন্তান মহাভারতের বাংলা অনুবাদক কাশীরাম দাসের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে স্কুলের নাম রাখা হল, “কাশীরাম দাস বিদ্যায়তন”। তবে এখন স্কুলটি কাটোয়ায় “কে ডি আই” অর্থাৎ “কাশীরাম দাস ইনস্টিটিউশন”, নামেই পরিচিত।

১৯৫৭ সালে বিদ্যালয় ভবন
এই স্কুলের সঙ্গে অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ১৯৫৩ সালে দশম শ্রেণির স্কুল ফাইনাল বোর্ডের পরীক্ষায় রাজ্যে যিনি প্রথম হন তিনি এই কাশীরাম দাস বিদ্যায়তনের ছাত্র গঙ্গাধর যশ। স্কুলের জীবন বিজ্ঞানের বর্তমান শিক্ষক মুন্সী আবুল বারাকাত বলছিলেন, “৭০ বছর আগে কাটোয়া কাশীরাম দাস বিদ্যায়তন বা কে ডি আই থেকে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় রাজ্যের মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন গঙ্গাধর যশ। আবার ৭০ বছর পর, ২০২৩ সালে মাধ্যমিকে প্রথম স্থান পেল কাটোয়ার স্কুল। দুর্গাদাসী চৌধুরানী গার্লস হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিকে প্রথম হয়েছে দেবদত্তা মাঝি। তবে, এই বছর মাধ্যমিকে আমাদের স্কুল থেকে সপ্তম হয়েছে ঋদ্ধিত পাল (৬৮৬) এবং নবম হয়েছে শুভদীপ চপাদার (৬৮৪)।”

মাধ্যমিকে নবম শুভদীপ চপাদার এবং মাধ্যমিকে সপ্তম ঋদ্ধিত পাল

আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুও কে ডি আই স্কুলে এক বছর পড়েছেন। এছাড়াও এই স্কুলের প্রাক্তনীরা হলেন, ঐতিহাসিক কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়, শিক্ষাবিদ প্রমথনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, লেখক বসন্ত কুমার চট্টোপাধ্যায়, স্বাধীনতা সংগ্রামী সুবোধ চৌধুরী, চিকিৎসক অজয় চন্দ্র, ইতিহাসবিদ সঞ্জয় ভদ্র, রাজনীতিক রবীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি, অচিন্ত মল্লিক, অঞ্জন চ্যাটার্জি। এই স্কুলের ছাত্রদের দেশপ্রেমে মুগ্ধ হয়ে স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সানন্দে সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। তাঁকে স্কুলে নিয়ে আসার জন্য কাটোয়া স্টেশনে স্কুলের পক্ষ থেকে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখানেও ঘটেছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। ঘোড়ার গাড়ি থেকে ঘোড়া সরিয়ে দিয়ে স্কুলের ছাত্ররাই ওই গাড়ি টেনে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়কে স্কুলের গেট পর্যন্ত নিয়ে এসেছিলেন। ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে এই স্কুলের ছাত্র বালককৃষ্ণ কোঁয়ার, এককড়ি দত্ত, দুর্গাপদ দত্ত, নৃপেন্দ্রনাথ আশ, মহিমারঞ্জন ঘটক যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে এই স্কুলের ছাত্র প্রদ্যোৎ চৌধুরী, বিষ্ণুপদ ভট্টাচার্য, ক্ষুদিরাম মোদক, বালককৃষ্ণ কোঁয়াররা অংশ গ্রহণ করেছিলেন।
আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুও কে ডি আই স্কুলে এক বছর পড়েছেন। এই স্কুলের ছাত্রদের দেশপ্রেমে মুগ্ধ হয়ে স্কুলের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সানন্দে সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করেছিলেন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। তাঁকে স্কুলে নিয়ে আসার জন্য কাটোয়া স্টেশনে স্কুলের পক্ষ থেকে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেখানেও ঘটেছিল এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। ঘোড়ার গাড়ি থেকে ঘোড়া সরিয়ে দিয়ে স্কুলের ছাত্ররাই ওই গাড়ি টেনে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়কে স্কুলের গেট পর্যন্ত নিয়ে এসেছিলেন।
কাটোয়া কাশীরাম দাস বিদ্যায়তন স্কুলটি ছেলেদের হলেও এই মহকুমায় মেয়েদের কোনও স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ না থাকায় ১৯৭০ সালে এই স্কুলে মেয়েরাও বিজ্ঞান বিভাগে পড়ত। ১৯৫৩ সাল থেকেই কাটোয়া কাশীরাম দাস বিদ্যায়তনে পরীক্ষায় ভালো ফল করা শুরু হয়। তার পর থেকে এখন পর্যন্ত ধরাবাহিকভাবে ভালো ফল করে আসছে এই স্কুল। গত ১০ বছর ধরে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উল্লেখযোগ্য ফল করেছে কাশীরাম দাস বিদ্যায়তন। একটানা দশ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে মেধা তালিকায় স্থানাধিকারী কাটোয়া কাশীরাম দাস বিদ্যায়তনের ছাত্রদের নাম-
২০১৪- অনিরুদ্ধ সরকার (৬৮১), মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে দ্বিতীয়
২০১৫- সৌগত ঘোষ (৬৭৮), মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে ষষ্ঠ
২০১৬- কৌস্তভ রায় (৬৮০), মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে চতুর্থ
২০১৭- উন্মেষ মণ্ডল (৬৮১), মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে দশম
২০১৮- দেবজ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় (৪৮৫),উচ্চ মাধ্যমিকে রাজ্যে ষষ্ঠ
২০১৯- পুষ্কর ঘোষ (৬৮৩), মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে অষ্টম
২০২০- অভীক দাস (৬৯৩), মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে দ্বিতীয়
২০২১- রক্তিম মজুমদার (৬৯৩), মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে পঞ্চম এবং অরূপ মণ্ডল (৬৯০) রাজ্যে অষ্টম
২০২২- সুরথ ঘোষ (৬৮৫), মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে নবম
2023- ঋদ্ধি পাল (৬৮৬), মাধ্যমিক পরীক্ষায় রাজ্যে সপ্তম এবং শুভদীপ চপাদার (৬৮৪), রাজ্যে নবম
কে ডি আই-এর বর্তমান মোট ছাত্র সংখ্যা ২৭০০। শ্রেণীকক্ষ এবং ল্যাব মিলিয়ে ৪০-এর কাছাকাছি ঘর আছে। স্কুলটি দোতলা, দুটো ভবন আছে, একটি ঐতিহ্যশালী প্রাচীন ভবন, সেটাতে এখন মিডডে মিল খাওয়ানো হয়। অন্য ভবনে ক্লাস হয়। স্কুলে ডিজিটাল ক্যাটালগ এবং রিডিং রুম সহ ভালো গ্রন্থাগার আছে। বর্তমানে স্কুলে ৫০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা, ৫ জন পার্শ্ব শিক্ষক-শিক্ষিকা, ৬ জন অশিক্ষক কর্মচারী রয়েছেন। ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ঠিকই আছে বলে জানালেন স্কুলের শিক্ষক মুন্সী আবুল বারাকাত। স্কুলে শুরুর দিকে হস্টেলের ব্যবস্থা ছিল। ছাত্ররা স্কুলে থেকে পড়াশোনা করত। ২০০৪ সাল পর্যন্ত হস্টেল চললেও এখন আর সেই ব্যবস্থা নেই।

প্রতি বছর শিক্ষক দিবসে ছাত্র-শিক্ষক প্রীতি ফুটবল প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়

বিদ্যালয়ের সবজি বাগান
স্কুলে সূর্য নারায়ন হল নামক অনুষ্ঠান-কক্ষ এবং দুটি বড়ো খেলার মাঠ আছে। স্কুলের ভূগোল শিক্ষক শ্রী টোটন মল্লিক ছাত্রদের সঙ্গে নিয়ে মিড ডে মিলে ব্যবহারের জন্য সবজি বাগান করেছেন। ছাত্রদের মাধ্যমেই টোটন স্যর এই সবজি বাগানকে সজীব করে তুলেছেন। সরস্বতী পুজার সময় ছাত্ররা বিজ্ঞান বিষয়ক প্রদর্শনীর আয়োজন করে। কাটোয়া মহকুমায় এখনও পর্যন্ত কাশীরাম দাস বিদ্যায়তন বা কে ডি আই হ'ল অন্যতম সেরা স্কুল।

_______________
তথ্য সূত্র : মুন্সী আবুল বারাকাত, জীবন বিজ্ঞানের শিক্ষক, কাটোয়া কাশীরাম দাস বিদ্যায়তন
ছবি: সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।
