‘আমার প্রথম পলিটিক্যাল কার্টুন বের হল ৫ই নভেম্বর, ১৯৩৩ সালে’
কাফী খাঁ
তুমি এই ছোট ছেলেটার বাস্তবদৃষ্টি ও তার রূপ দেবার চেষ্টার দিকে চেয়ে দেখ। কেমন সে পাতি গাঁদা ফুলের পাশের পাপড়িগুলো ফেলে দিয়ে ওটাকে দাড়ি কামাবার বুরুষ তৈরি করেছে। আর তাই দিয়ে আমার গালে বুলোচ্চে, যেব সাবান মাখাচ্চে দাড়ি কামাবে বলে! এই ছেলেটা ওদের দেশে থাকলে কতো বড়ো হতো। কিন্তু আনন্দ, তোমরা তো তা হতে দেবে না। তোমরা ওব পেন্সিল-রবার-রং সব ফেলে দিয়ে ওকে শুধু বই পড়ার দিকে ঠেলে দিয়ে শেষে একটা মাষ্টার বানাবে।' -বলেছিলেন 'ভারত বিলাপ' ও 'যমুনা লহরীর' কবি গোবিন্দ রায় তাঁর ছোট ভাইকে (আমার মাতামহ) আমার ৫ বৎসর বয়সের পাগলামীর নমুনা দেখে। সে প্রায় স্বদেশী আন্দোলনেরও আগে সাঁওতাল পরগণার কারমাটারের ঘটনা। এতদিন বিদেশ ঘুরে বুঝতে পারচি ওঁর কথাটা কত বড় সত্যি। বড় অবস্থায় মানুষ হলে মনটা সরল থাকে। সেই সরলতার প্রায়শ্চিত্ত করা শিখেচি কলকাতায় আসার পর। সে প্রায় তিরিশ বৎসর আগেকার কথা। লেখাপড়ায় খালি ফার্স্ট ক্লাস হলে মাষ্টারই হওয়া যায়। কিন্তু ছবি মানচিত্র, মডেল ও সঙ্গীতের দিকে অদম্য স্পৃহা থাকায় বোধহয় এতকাল পর তার সুফলটা দেখতে পাচ্চি। কলকাতায় আসার আগে ছিলাম ইতিহাস অনার্স ও ইকনমিকসের অধ্যাপক পূর্ববঙ্গের এক মফঃস্বল কলেজে। কিন্তু মনে তাতে সাড়া পেতাম না। তাই তো, শেষে আবার শুধু সেই পুরানো সিলেবাস মতই পড়াতে হবে বছরের পর বছর ধরে? ছবি আঁকতাম অবসর সময়ে। আর এক সহকর্মীর বেহালাটা নিয়ে মাঝে মাঝে বাজানোর চেষ্টা করতাম। তিনি বলতেন, আপনার হাত এক মিঠে! একটা বেহালা কিনুন না! বেহালা কেনা হলো, আর নিজেই তার শিক্ষক। সন্ধ্যার ক্লাসের পাঠ তৈরির পর বন্ধু সহকর্মীদের সঙ্গে বেহালা, ভারতীয় শিল্প ও মসুলমানী ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের চর্চা চলতো। পরে কলেজের ড্রামাটিক এসোসিয়েশনে ছাত্রদের রিহার্সাল, সঙ্গীত ইত্যাদি। সে ৩৩ বৎসর আগে। তারপর কলেজ ছেড়ে এই অজ্ঞাত লাইনে পাড়ি দিলাম যখন, তখন ছাত্রেরা স্টেশনে এগিয়ে দিতে এলো ছল্-ছল্ চোখে। স্যার আপনি চলে গেলেন, আমাদের যা গেল, কলেক কাণা হয়ে গেল, আমাদের কমনরুম গেল, ড্রামাটিক এসোসিয়শন গেল, আমাদের 'দেশ' ও সুরট' রাগের তফাৎ বোঝাবেই বা কে, দক্ষিণী, হিন্দী, মুসলমানী ঢং-এর রূপই বা বলবে কে ইত্যাদি।
আমারও মনটা কেমন করে উঠল। সত্যিই তো, এই রকম ছাত্রভাগ্য কজনের হয়? এখনও মনে হয়, অর্থ ব্যপারে কিছুটা দারিদ্র্য থাকতে পারে, কিন্তু সেই কলেজে প্রাণ ছিলো। আর ছাত্রদের প্রাণে গান ছিলো, কেননা সেটা চিটাগাং আর্মারি রেড-এর সময়।
এবার কলকাতায়। কলকাতাই আমাকে চালাক করে দিলো। সে ১৯৩৩ সাল। নতুন লাইন তো ধরলাম, কিন্তু এতে পয়সা কোথায়? বন্ধুবর সজনীকান্তের 'শনিবারের চিঠি'র পাবলিসিটি পর্যন্তই। একবার চেষ্টা করলাম ফিল্প কার্টুনে। বাবুরাও প্যাটেল বলেছিলো, আসুন না বোম্বাইয়ে! দেখলাম লাইনটা ভালো নয়। ভদ্রভাবে সমাজে থাকাটাও মানুষের একটা কর্তব্য বৈকি। তাই ছেড়ে দিলাম পথটা।
দেখলাম, সাহেবদের কাগজগুলোই কার্টুন বের করে। কিন্তু সেগুলো সবই ফিরিঙ্গি ও সাহেব-মেমেদের ছবি, বিদেশী ও সাহেব-মেমদের ঘরোয়া বিষয়ে। আর ভারতীয়দের অবস্থা নিয়ে টিপ্পনী। পলিটিক্যাল কার্টুন বলে কিছু নেই। ঠিক তখন একদিন দেশপ্রিয় সেনগুপ্তের 'এডভান্স' কাগজে গিয়ে কার্টুনের বিষয় বলতেই আমার কাছে কার্টুন চাইলো তারা। বললো, কার্টুন তো খুঁজছি, লোক তো পাই না। তখন Diogenes নামে আমার প্রথম পলিটিক্যাল কার্টুন বের হল ৫ই নভেম্বর, ১৯৩৩ সালে।
কিছুদিন পরেই 'পত্রিকা' থেকে ফোন এল কার্টুনিষ্টের ঠিকানার জন্যে এডভান্স অফিসে। এবং তারপর থেকেই পত্রিকায় ১৯৩৪ সাল ও তারপর যুগান্তরে ১৯৩৭ সাল থেকে কার্টুন আরম্ভ হলো। কিন্তু পয়সা তেমন আসতো না। ইংরেজদের স্টেটস্ম্যানে শুধু লণ্ডনের Strube-এর কার্টুন বের হত।
পত্রিকা যুগান্তরে একটা নতুনের স্বাদ পেলাম। সেটা কার্টুনের রকমারি সৃষ্টির ব্যাপারে। তাই খুড়োর জন্ম হল ১৯৩৫ সালে। এবং যুদ্ধের সময়ে বিদেশীদের চোখে- His one of the finest strips in the world.'
যুদ্ধের শেষ দিকেই কার্টুনের অর্থভাগ্য ফিরলো এবং পয়সা আসতে লাগলো। এর আগের যুগটাতে তো শুধু জেদের মাথায় বাঙলাদেশের কার্টুনের জন্য জমিতে কোদাল চালিয়েই গিয়েছি। তেমনি পয়সা তখন পেলাম কই?
অন্যে হলে এ লাইন কবে ছেড়ে দিতো! আমার ব্যাপারে এটা তখন ছিলো অনেকটা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। তবে একটা জিনিস আমার এই ক্ষুদ্র জীবনীতে দেখেচি। সেটা হচ্চে সাধনা এবং সততা সঙ্গে চেষ্টা। আড় তার সঙ্গে জ্ঞান ও ইনফরমেশনের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করা। এ জিনিসটা আমার ইতিহাস ও অর্থনীতি সঙ্গীত ও বিভিন্ন কোণ থেকে চিত্রের দৃষ্টিজ্ঞান – যাকে ছবিতে বলে perspective, এগুলো আমাকে অদ্ভুত সাহায্য করেচে। বাদ বাকি বিষয় তো সবারই বাঁধা গৎ, যাকে বলে সারেগামাপাধানিসা।
এখানো তাই সময় পেলেই নতুনত্বের সন্ধান করি – তা সে বেহালাতেই হোক, না হয় ড্রইংবোর্ডেই হোক। এই জন্যেই জেদের মাথায় কলকাতা প্লানেটরিয়ামের দিকবলয় বা skyline-টা দেড় মাসের উপর খেটে খাড়া করেচি এবং কলকাতাকে ওখানে নিজের হাতে তৈরি করেচি দেখতে পেয়ে প্লানেটরিয়ামের সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময় চোখ দিয়ে জল আসছিলো। বুকে হাত দিয়ে নিজেকে বললাম, 'কাফী খাঁ, চেয়ে দেখ, বানিয়েছিস তো একটা জিনিস এই ভারতের বুকের উপর যা অন্যে পারেনি!'
(কুমারেশ ঘোষ সম্পাদিত ‘একালের কার্টুন’ গ্রন্থ থেকে)