‘রাধে-এ-এ-এ ঝাঁপ দিলি’ লেখা সম্ভব না বলে সিনেমায় গান লেখেননি জীবনানন্দ

তাঁর দিনলিপি ঘিরে আছে অভাব আর নিষ্ঠুর কৌতুক

‘‘এখুনি চার-পাঁচশো টাকার দরকার; দয়া করে ব্যবস্থা করুন।
এই সঙ্গে পাঁচটি কবিতা পাঠাচ্ছি, পরে প্রবন্ধ ইত্যাদি (এখন কিছু লেখা নেই) পাঠাব। আমার একটি উপন্যাস (আমার নিজের নামে নয়— ছদ্মনামে) পূর্বাশায় ছাপতে পারেন; দরকার বোধ করলে পাঠিয়ে দিতে পারি, আমার জীবনস্মৃতি আশ্বিন কিংবা কার্তিক থেকে পূর্বাশা’য় মাসে মাসে লিখব। সবই ভবিষ্যতে, কিন্তু টাকা এক্ষুনি চাই— আমাদের মতো দু-চারজন বিপদগ্রস্ত সাহিত্যিকের এ রকম দাবি গ্রাহ্য করবার মতো বিচার বিবেচনা অনেক দিন থেকে আপনারা দেখিয়ে আসছেন— সে জন্য গভীর ধন্যবাদ।’’

‘পূর্বাশা’-র সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে চিঠিতে লিখলেন জীবনানন্দ দাশ। সময়টা ১৯৫০। এই চিঠি সামনে রাখলে ইতিহাস একটা চোরাগলি ধরে ছুটতে শুরু করে। একজন ‘বিপদগ্রস্ত সাহিত্যিকের’ অন্ধকার জীবনের চোরাগলি। 

 

জীবনানন্দ চিঠিতে জানাচ্ছেন, তাঁর একটি উপন্যাসের কথা। নাম বলছেন না অবশ্য। আমরা পরে জানতে পারব, ‘মাল্যবান’ ও ‘সুতীর্থ’ লেখা হয়ে গেছে ১৯৪৮-এই। কিন্তু, সেই উপন্যাস দুটিকে তখনই ছাপতে চাননি তিনি। হয়তো আরো পরিমার্জনার ইচ্ছে ছিল। তাছাড়া, লেখা লুকিয়ে রাখা তাঁর স্বভাব। কিন্তু অভাব স্বভাবেও থাবা বসায়। সেই উপন্যাসের একটিকে ছাপার কথা তাই ভাবতেই হয় তাঁকে। কিন্তু আসল কথাটা হল, ‘নিজের নামে নয়— ছদ্মনামে’। জীবনানন্দ তখনো চান না, উপন্যাসের লেখক হিসেবে তাঁকে চিনে ফেলুক পাঠকরা। 

 

চোখ আটকে যায় চিঠির আরো একটা জায়গায়– ‘সবই ভবিষ্যতে, কিন্তু টাকা এক্ষুনি চাই’। এরপরেই নিয়তির মতো যেন জুড়ে বসে ‘বিপদগ্রস্ত সাহিত্যিকের’ দাবির প্রসঙ্গ। বিপদ কি শুধুই অভাবে? টাকা চাই বলেই এত কিছু লিখতে চাইছেন জীবনানন্দ। কিন্তু, এই দ্বিতীয় চাওয়া-তেও তো বিপদ কম নেই। বোঝাই যাচ্ছে, এই লেখার প্রতিশ্রুতি দিতে গিয়েও বিপদের সামনে এসে দাঁড়াচ্ছেন তিনি। হয়তো লুকোনো নানা লেখাকে উন্মোচন করে ফেলার বিপদ, কিংবা দ্বিধা। কেমন যেন মনে হয়, দুই ‘এক্ষুনি’ তাঁকে দু’দিকে টানছে। একদিকে, ‘এক্ষুনি টাকা চাই’-এর তাড়না, অন্যদিকে ‘এক্ষুনি’ ছাপতে দিতে না চাওয়া সেইসব গোপন লেখা। মাঝে এক ‘বিপদগ্রস্ত’ সাহিত্যিক। ছোটো ছোটো অক্ষরে লেখা পাণ্ডুলিপি হাতড়াচ্ছেন। কলকাতার রাস্তায় হাঁটছেন মগ্ন হয়ে। 

 

গোপনচারী জীবনানন্দকে খানিক খানিক চেনা যায় তাঁর লেখা দিনলিপি আর চিঠিগুলি পড়লে। ‘লিটারারি নোটস’ নামে দিনলিপি লিখতেন জীবনানন্দ। মূলত ইংরেজিতে লেখা এই দিনলিপিতে মাঝেমাঝে মিশে গেছে বাংলাও। জুড়ে বসেছে গল্পের প্লট। হয়তো সেটাই মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল দিনলিপি লেখার। ১৯৩০-৩৫, পাঁচ বছর নিয়মিত ‘এন্ট্রি’ পেয়েছে এই খাতা। সেখানে মাঝেমাঝেই ছলকে পড়েছে রক্ত। বিয়ে সুখের হয়নি। অভাব ‘থেঁতলে’ দিচ্ছে। ‘তিন পয়সার বেশি’ খরচ করা সাধ্যের বাইরে। 

২৭. ৭. ৩১-এ লিখছেন, “দুপুরটা কাটল চাকরির আবেদন লিখে লিখে ডাকে পাঠাতে, খেলা দেখে যে একটু আরাম স্বস্তি পাব তা আর কপালে নেই: জীবন থেকে বহু কিছুই উবে গেছে।’ এর খানিক পরেই লেখা—‘ঢ্যাঁড়শই বাঁচিয়ে রেখেছে আমাকে। একই সঙ্গে মাধুর্য ও পরিহাস।” 

এর পরের মাসেই লিখছেন–

“চাকরি নেই, লোকে প্রশ্ন করছে, ‘বসে আছ?’:
‘‘…on ‘বসে থাকা’— বেকার কখনও বসে থাকে না: they stand and run, throb and palpitate; it is only the well-placed who have the external charm of the easychair or cushions, sofas and bed for themselves.’’

একটা তিতো রসিকতা মিশে এই দিনলিপির পাতায়। জীবনানন্দ মানুষটা রসিকও ছিলেন বইকি। অভাবের সঙ্গে সেই রসিকতার জোড়কলম সম্পর্কও ছিল। ইন্দ্র মিত্র তথা অরবিন্দ গুহ সেই জীবনানন্দর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন আমাদের। অভাব থেকেই একবার সিনেমায় গান লেখার ইচ্ছে জাগে জীবনানন্দের। অরবিন্দ গুহ লিখছেন–

“তিনি আমাকে এক দিন জিজ্ঞেস করলেন— সিনেমায় গান লিখলে নাকি অনেক টাকা পাওয়া যায়? তুমি কিছু জানো এ বিষয়ে?

আমি জানি না এমন কোনো বিষয় জগতে নেই, আমি সর্বজ্ঞ— আমার নিজের মতে। সর্বজ্ঞের গলায় বললাম— হ্যাঁ, আমিও শুনেছি সিনেমায় গান লিখলে অনেক টাকা পাওয়া যায়।
তিনি বললেন— আমি লিখতে পারি না?
বললাম— নিশ্চয়ই পারেন।
—আমাকে কী করতে হবে?
—বাংলা সিনেমার পরিচালক হিসেবে প্রেমেন্দ্র মিত্রের খুব নামডাক, প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন?
জীবনানন্দ বললেন— খুব ভালো,
বললাম— তা হলে আর কী কথা? তাঁকে বলুন। উনি অনায়াসে একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।”

এর দিনকয়েক বাদে রাসবিহারী এভিনিউতে ফের দেখা দু'জনের। প্রেমেন্দ্র মিত্রর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে কিনা প্রশ্নের উত্তরে জীবনানন্দ জানান, এখনো হয়নি, কিন্তু করে ফেলবেন। কিন্তু অরবিন্দ গুহ ততদিনে ভাবনা বদলে নিয়েছেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র নয়, শৈলজানন্দই এই ক্ষেত্রে ঠিকঠাক লোক। 

প্রেমেন্দ্র মিত্র নিজেই সিনেমার গান লেখেন, কিন্তু শৈলজানন্দ নিজে সিনেমার গান লেখেন না। এই অবস্থায়…
আমাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে জীবনানন্দ বললেন— বুঝেছি, আর বলতে হবে না। আমি শিগগিরই শৈলজাকে বলব।”

সেই বলাও আর হয় না। দশ-বারো দিন পরে ফের দেখা দু'জনের, রাসবিহারী এভিনিউ-তেই। জীবনানন্দ কী এক গোপন কথা বলতে অরবিন্দকে টেনে নিয়ে গেলেন ফুটপাতের এক কোণে। 
“বললেন— শৈলজার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলিনি কেন জান?
বললাম— না। কেন?
খুব হতাশভাবে বললেন— যদি শৈলজা আমার জন্য কোথাও একটা ব্যবস্থা করে দেয় তা হলেও আমি কেমন করে লিখব, ‘রাধে-এ-এ-এ ঝাঁপ দিলি তুই মরণ যমুনায়’।
এখনো আমার মনে গেঁথে আছে চোখমুখের সকৌতুক ভঙ্গির সঙ্গে জীবননান্দের গলায়— রাধে-এ-এ-এ…”

মৃত্যুশয্যায় থাকা জীবনানন্দকে দেখেও অরবিন্দ গুহ-র মনে পড়ে গেছিল নিচের ঠোঁট কামড়ে চেপে রাখা সেই হাসির কথা। হাসি দিয়ে চেপে দেওয়া যায় অনেক না-পারাকেও। শত অভাবেও সিনেমায় গান লেখার মতো নানাকিছুই করতে পারা যায় না কিছুতেই। সেইসব সত্য, না-পারা, অভাব, অসহায়তাকে তো আর সিন্দুকে আটকে রাখা যায় না লেখার মতো। তার জন্য কৌতুকের আড়াল লাগে। নিষ্ঠুর কৌতুক। 

জীবনানন্দ সেটা দিব্বি পারতেন। 

Developed by DXDasia