লন্ডনের অনুকরণে খাস কলকাতার বুকে সাহেবরা তৈরি করলেন ‘জেরুজালেম কফি হাউস’

‘জেরুজালেম কফি হাউস’ নামটির একটি ইতিহাস আছে

তখনও সাহেবদের হোম সিকনেস কাটেনি। কথায় কথায় তাঁরা কলকাতাকে লন্ডন বানাতে চায়। পারলে ঘর-বাড়ি পথ-ঘাট সবের সঙ্গেই লন্ডনের চরিত্রকে মিশিয়ে মাখিয়ে দেয়। যাই হোক এহেন পার্কেস তাঁর ‘লন্ডন’ নামধারী হোটেলে একটা ‘কফি রুম’ বানালেন বেশ যত্ন করে। আর সেই ‘কফি রুমে’ এক পেয়ালা কফি পানের খরচ মাত্র সিক্কা টাকা। এই টাকায় কফি পান আর কাগজ পড়া দুই-ই হয়ে যায়। আর তাতেই কফির আমেজের সঙ্গে মেলে ইংল্যান্ড ইংল্যান্ড একটা গন্ধ। কড়া মেজাজের কফির সঙ্গে কড়া মেজাজের আড্ডার কোথায় যেন একটা অন্তরঙ্গতা খুঁজে পায় সমুদ্র পেরিয়ে দেশ ছেড়ে আসা সাহেবগুলো। কিন্তু ইংল্যান্ড থেকে আসা ছোকরাগুলোর এত সহজে মন ভিজল না। তাঁদের একটাই কথা কফি রুম-টুম নয়, চাই একটা আস্ত কফি হাউস।

এসব যখন চলছে ঠিক তখনই কলকাতায় সত্যিকারের একটা ‘কাফি হাউস’ তৈরি হল। অনেক ঘটা করে সেটার নাম দেওয়া হল ‘ক্যালকাটা এক্সচেঞ্জ কাফি হাউস’। সেখানে কফি পানের সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার ইংরেজি কাগজগুলি যেমন পড়া যায় তেমনই আবার মাদ্রাজের যাবতীয় ইংরেজি খবরের কাগজেও চোখ বুলানো যায়। এই কফি হাউসে নিয়মিত ভদ্রলোক, ব্যবসায়ী বণিকের আড্ডা বসতে লাগল সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গেই। তখন অবশ্য আজকের মতো কলেজ পড়ুয়াদের আড্ডাস্থল হয়ে ওঠেনি সেই কফি হাউস কারণ কলকাতা তখনও ছাত্রসমাজ চোখেই দেখেনি। কিন্তু এখানে যারাই কফির কাপে তুফান তুলে আড্ডা দিতে আসেন তাঁরা চাঁদা দেন, মানে তাঁরা হলেন গিয়ে মেম্বার। প্রতি সন্ধ্যায় মেম্বারদের মধ্যে লেগে থাকত নানা বিষয়ের তর্ক-বিতর্ক। মাঝে মধ্যে সেই তর্ক এমন পর্যায়ে যেত যে লোকে ভাবত এবার বুঝি একটা ডুয়েল লড়াই লাগল। ‘সেপই সেপই’ বলে হাঁক পাড়তেন শান্তিকামী সদস্যরা। এরকমই সেখানে লেগে থাকত হই-হট্টগোল।

কিন্তু একদিন টাকার অভাবে এই কফি হাউসটিও নিলামে উঠল। নিলামের হাতুড়ির শব্দের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেল এহেন কফি হাউসের হইহই করা আড্ডার শোরগোল, তর্ক অথবা চিনামাটির রোকোকো নকশার পেয়ালাগুলিও। কেবল পড়ে রইল নিঝুম নামা বাড়িটি। আজকের যে ‘রয়্যাল এক্সচেঞ্জ’-এর বাড়িটি কলকাতায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে, সেটিই ছিল ওই ‘ক্যালকাটা এক্সচেঞ্জ কাফি হাউস’। এমনই হল কলকাতার ইতিহাস। এখানেই থেমে রইল না ‘কফি হাউস’ বানানোর হিড়িক। আবার ফিরিয়ে আনা হল লন্ডনের স্বপ্ন। এবার আমরা গল্পটা শুনব অতীত নামা কলকাতার বিরল লিপিকার শ্রীপান্থের রম্যকলমের জবানিতে।

সমসাময়িক কালের আর একটি কফি হাউসের খবর আমরা জানি। তার নাম জেরুজালেম কফি হাউস। ‘জেরুজালেম কফি হাউস’ নামটির একটি ইতিহাস আছে। সে সময় লন্ডনে একটি কফি হাউস ছিল ওই নামে। কবি ক্যুপারের পিতৃনিবাস কুপ্যারস কোর্টে ১৮৮৮ সাল অবধিও ছিল ওটি। জেরুজালেম কফি হাউসটি কিন্তু লন্ডনের আর-পাঁচটা কফি হাউসের মতো ছিল না। উইলিয়াম হিকি লিখছেন – ওটি ছিল ভারতবর্ষ নিয়ে যাদের কারবার, তাদেরই আড্ডাখানা।হিকি নিজেও ভারতে আসার আগে ওখানে বসে বসে ভারতের কাহিনি শুনেছেন ভারত-ফেরত নাবিক, সৈনিক এবং সিভিলিয়ানদের মুখে। ভারতবর্ষের শেষ খবর, ভারতের হালচাল জানতে আগ্রহীরা ভিড় জমাতেন ওখানে। কোন জাহাজ কবে ছেড়েছে, কোন জাহাজ কবে পৌঁছোবে – এসব জানারও একমাত্র বেসরকারি স্থান ছিল ওটি। সুতরাং ভারতের সঙ্গে যাদের যোগ ছিল, তাদের পরিচয় ছিল জেরুজালেম কফি হাউসের সঙ্গেও।

আজকের এই বিল্ডিং-এই ছিল জেরুজালেম কফি হাউস

কিন্তু কলকাতায় নবাগতদের ঠিক এ ধরনের আড্ডাখানা ছিল না। নাবিকেরা গঙ্গায় জাহাজ ভিড়িয়ে উসখুস করতেন। লন্ডনে সেই ‘জেরুজালেমে’ কফি গিলে উঠেছেন, আর এই এখানে যদি মনের মতো একটা কফি হাউসও থাকত! এ কী রাজ্যি বাবা।

১৭৯০ সালের কথা। জন ম্যাকডোনাল্ড নামে এক নাচের মাস্টার কলকাতায় পা দিয়েই বুঝতে পারলেন, এখানে ‘জেরুজালেমের’ অভাব। তিনি স্থির করলেন ওই নামেই একখানা কফি হাউস খুলবেন কলকাতায়। ম্যাকডোনাল্ড বাড়ি কিনলেন একখানা ডালহৌসি স্কোয়ারে। কাউন্সিল হাউস স্ট্রিট যেখানটায় মিলেছে ডালহৌসি স্কোয়ারে, সেখানটায়। জেরুজালেম কফি হাউস খোলা হল…।’

এমন কাহিনি শুনলে মনটা সত্যিই কেমন যেন কলকাতা কলকাতা করে ওঠে। কিন্তু দেখা গেল ওখানেও কফি হাউস জমল না। ওয়েলেসলি সাহেব ভাড়া নিলেন বাড়িটিকে। আর সেখানেই গড়ে উঠল একটি মহাবিদ্যালয়। সেটির নাম ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’। এভাবেই দিন শেষ হয়ে গেল কলকাতার ‘জেরুজালেম’-এর। তবু কিন্তু আজও দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটি। বলতে গেলে জীর্ণতা নয় বরং বিরাট বৈভবের কর্পোরেট চেহারা নিয়ে। 

আজ সেখানে জাহাজের নাবিকেরা আড্ডা দেয় না। কোনও বিরহী ইংরেজ সেখানে বসে প্রেয়সীর জন্যে কবিতার কল্পনা করে না। কিংবা কেউ এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবেও না এই বাড়িটার দেওয়ালের গায়ে আজও কান পেতে শোনা যেতে পারে ইংরেজ নাবিকদের ভারত পাড়ির গল্প। তবু বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে সাইনবোর্ডে লেখা আছে এইচএসবিসি মানে ‘হংকং সাংহাই ব্যাঙ্ক’। বলতেই হয় আজকের কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের পূর্বপুরুষ।

 

Post Tags
Developed by DXDasia