ব্রিটেনের পাউন্ডের নোটে জগদীশচন্দ্র বসু!

বঙ্গসন্তানের অবদানকে স্বীকৃতি দিতে চাইছে ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড

বেশ কয়েকদিন আগেই ঘোষণাটা করেছিল ব্রিটেনের ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড। ৫০ পাউন্ডের নোট নাকি নতুন কলেবরে ছাপা হবে। এবং সেই নোটের উপরেই কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির ছবি ছাপতে চায় তারা। কার ছবি ছাপা যায়, সে বিষয়ে সাধারণ মানুষের পরামর্শও চেয়েছিল ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড। কিছুদিনের মধ্যেই এক লক্ষ পঁচাত্তর হাজার নামের সুপারিশ এসে পৌঁছায় তাদের কাছে। সেইসব বিখ্যাত ও বিশিষ্ট মানুষদের নামের ভিতর থেকে বাছাই করে একটি চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড। শুনে অবাক লাগতে পারে, সেই তালিকায় নাম আছে এক বঙ্গসন্তানেরও। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর। বিজ্ঞানবিশ্বে অমূল্য অবদানের জন্য তাঁর নামটি স্থান করে নিয়েছে এই তালিকায়।

ভারতের যেমন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, তেমনই ব্রিটেনের ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড। ব্রিটেনে নোট ছাপানোর অধিকারী একমাত্র তারাই। এমন একটি সংস্থা তাদের ছাপানো পাউন্ডের নোটে এক বঙ্গসন্তানের ছবি রাখার কথা বিবেচনা করছে, এটা যথেষ্টই গৌরবের ব্যাপার। এখানে, এককালের উপনিবেশকে প্রথম বিশ্বের দেওয়া ছিটেফোঁটা স্বীকৃতির তত্ত্বটি বোধহয় খাটে না। কারণ, এই তালিকায় ইংল্যান্ডের বিখ্যাত গুণীজনদের নামও আছে, আছে ইউরোপীয় বিশিষ্টদের নামও। এবং তারপরেও জগদীশচন্দ্র বসুর নামটিকে বড়ো গুরুত্ব সহকারেই তালিকাভুক্ত করেছে ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড। শেষপর্যন্ত নোটে জগদীশচন্দ্রের ছবি থাকবে কিনা জানা নেই, কিন্তু এই ব্যাপারটিও যথেষ্ট সাড়া ফেলে দেওয়ার মতো।

উদ্ভিদের প্রাণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ছাড়াও মাইক্রো ওয়েভ বা অতিক্ষুদ্র তরঙ্গ নিয়েও যুগান্তকারী কাজ করেছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। আবিষ্কার করেছিলেন উদ্ভিদের বৃদ্ধিমাপক যন্ত্র ক্রেস্কোগ্রাফ এবং উদ্ভিদের দেহে উত্তেজনার বেগ মাপার সমতল তরুলিপি যন্ত্র রিজোনাষ্ট রেকর্ডার। ১৮৯৫ সালে তিনি কোনো পরিবাহী ছাড়াই মাইক্রো ওয়েভকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রেরণের ক্ষেত্রে সাফল্য পান। মাইক্রো ওয়েভ প্রেরণের এই আবিষ্কারই পরে রাডার, টেলিভিশন, মহাকাশ গবেষণাকে অন্য দিগন্তে পৌঁছে দিয়েছিল। এমনকি ব্লুটুথ বা ওয়াইফাই-এর আড়ালেও এই প্রযুক্তি লুকিয়ে। সে অর্থে দেখলে আধুনিক বিশ্বের যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিতটি তৈরি করে গেছেন জগদীশচন্দ্রই। 

বেতারযন্ত্রের আবিষ্কর্তা মার্কনির গবেষণাকেও পুষ্ট করেছিল জগদীশচন্দ্রের ভাবনা ও গবেষণা। মার্কনি নিজের লেখায় জগদীশচন্দ্রের কাজের স্বীকৃতিও দিয়েছেন বেশ গুরুত্ব সহকারে। জগদীশচন্দ্রের গুণমুগ্ধ ছিলেন স্যার অ্যালবার্ট আইনস্টাইনও। ব্যক্তিগত জীবনে পেটেন্ট নেওয়ার পক্ষে বিশেষ ছিলেন না জগদীশচন্দ্র। তারপরেও ভারতীয়দের মধ্যে তিনিই খুব সম্ভবত প্রথম মার্কিনি পেটেন্টের অধিকারী। সলিড স্টেট ডায়োড, যা তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ ধরতে সক্ষম, তৈরি করেছিলেন তিনি।

প্রেসিডেন্সির ২৪ বর্গফুটের ছোটো একটি ঘরে অর্থাভাব, খুবই অনুন্নত পরিকাঠামোর মধ্যেও একের পর গবেষণা চালিয়ে গেছেন জগদীশচন্দ্র। প্রথম বিশ্বের উন্নতি, পরিকাঠামো, পরিষেবার আলো তাঁর কাজকে ঘিরে থাকেনি। তারপরেও তিনি বিশ্বকে উজাড় করে দিয়েছেন বিজ্ঞানী হিসেবে। আমরা তাঁকে কতখানি ফিরিয়ে দিয়েছি, তা জানা নেই। এখন একজন বঙ্গসন্তানের অবদান স্বীকার করে নিজেদের পাউন্ডের নোটে তাঁকে ঠাঁই দিতে চাইছে ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ড। আমাদের দেশে বিমুদ্রাকরণের পরেও এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতেও হবে কি?

Developed by DXDasia