
সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ১৬
যাদবপুর বিদ্যাপীঠ স্কুল নিয়ে দীর্ঘকালীন ও ধারাবাহিক গর্ব আছে এই স্কুলের বর্তমান ও প্রক্তন ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। গর্ব হওয়ার মতো অসংখ্য পালক যাদবপুর বিদ্যাপীঠের মুকুটে আছে।
কথা হচ্ছিল যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক পার্থপ্রতিম বৈদ্যর সঙ্গে। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পঠনপাঠনের ব্যবস্থা রয়েছে এই স্কুলে। গত এক বছর হল যাদবপুর বিদ্যাপীঠের প্রধান শিক্ষক পদের দায়িত্বে এসেছেন পার্থপ্রতিমবাবু। তবে তিনি যে ভাবে স্কুলের সাফল্যের কাহিনি এক নিঃশ্বাসে বলে গেলেন তাতে মনে হচ্ছিল যাদবপুর বিদ্যাপীঠের সঙ্গে যেন তাঁর অনেককালের সম্পর্ক। যাদবপুর বিদ্যাপীঠ স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদে যোগ দিতে পেরে তিনি যে খুবই তৃপ্ত, তা সহজেই বোঝা যাচ্ছিল।

পার্থপ্রতিমবাবুর কথায়, “পশ্চিমবঙ্গ সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়গুলির মধ্যে যাদবপুর বিদ্যাপীঠ চিরকাল অগ্রগণ্য। বিশ্বখ্যাত শিক্ষা সংক্রান্ত পত্রিকা- এডুকেশন ওয়ার্ল্ড ইন্ডিয়া (ইডব্লুআইএসআর) ভারতবর্ষের সমস্ত সরকার পরিচালিত বিদ্যালয়গুলির মধ্যে যে সমীক্ষা চালিয়েছিল, তাতে যাদবপুর বিদ্যাপীঠ কলকাতা জেলা তথা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে, সারা ভারতবর্ষের মধ্যে ছিল ষষ্ঠ স্থানে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে বিদ্যালয়ের ফলাফল অত্যন্ত সন্তোষজনক। সার্বিক ফলাফলে ভিত্তিতে সাফল্য বলতে গেলে নজরকাড়া বলা চলে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক উভয় পরীক্ষাতেই রাজ্যের প্রথম দশের মধ্যে আমাদের ছাত্র ছাত্রীরা বরাবর স্থান পেয়েছে।”

গত বছর যাদবপুর বিদ্যাপীঠ মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিকে নজরকাড়া ফল করলেও, প্রথম দশে ছিল না, জানালেন প্রধান শিক্ষক নিজেই। তবে তিনি এও জানান, যে গত বছর মাধ্যমিকে ৬৭৭ এবং উচ্চমাধ্যমিকে ৪৮৭ পেয়েছে স্কুলের দুই পরীক্ষার্থী। এই মুহূর্তে যাদবপুর বিদ্যাপীঠের ছাত্রছাত্রী সংখ্যা ১৭০০-র কাছাকাছি। শিক্ষক-শিক্ষিকা, প্যারা টিচার, পার্ট টাইম টিচার, ভিটিসি এবং অশিক্ষক কর্মচারী মিলিয়ে সাকুল্যে ৭০ জন কর্মরত। এঁদের নিয়েই যাদবপুর বিদ্যাপীঠ একের পর এক সাফল্যে পৌঁছে যাচ্ছে।
যাদবপুর বিদ্যাপীঠের যাত্রারম্ভের প্রসঙ্গে এবার আসা যাক। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে “জাতীয় শিক্ষা পরিষদ”-এর ইতিহাস।
বাংলাকে দ্বিখন্ডিত করার পর স্বদেশি আন্দোলন শুরু হলে ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প রূপে দেশিয় প্রগতিশীল স্বদেশি ধাঁচে বাংলায় বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারের উদ্দেশ্যে একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই উদ্যোগকে বাস্তবায়িত করার জন্য ১৯০৫ সালের ১৬ই নভেম্বর কলকাতায় আয়োজিত এক শিক্ষা সম্মেলনে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। রাজা সুবোধ মল্লিক ও ব্রজেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী জাতীয় শিক্ষা পরিষদ বা ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন গঠনের জন্য পাঁচ লক্ষ টাকা দান করার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯০৬ সালের ১১ মার্চ ৯২ জন সদস্যকে নিয়ে গঠিত হয় “জাতীয় শিক্ষা পরিষদ”। এর প্রথম সভাপতি হন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তবে, ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ১লা জুন, মতান্তরে ১৪ আগস্ট এর আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠার পর রাসবিহারী ঘোষ এই পরিষদের সভাপতি হন এবং আশুতোষ চৌধুরী ও হীরেন্দ্রনাথ দত্ত যুগ্ম সভাপতি হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রমুখ এই পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জাতীয় শিক্ষা পরিষদের প্রতিষ্ঠাকে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় স্বদেশি আন্দোলনের প্রথম বৃহৎ গঠনমূলক প্রচেষ্টা বলে অভিহিত করেন। জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রথম দিকে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করে— ক) সাধারণ বিজ্ঞান ও কলাবিদ্যার জন্য বেঙ্গল ন্যাশনাল কলেজ, খ) কারিগরি শিক্ষার জন্য বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট । কারিগরি শিক্ষাকে সর্বজনীন ও বাধ্যতামূলক করার জন্য জাতীয় শিক্ষা পরিষদ উদ্যোগ নেয়। জাতীয় পাঠ্যক্রম রূপে ৩ বছরের জন্য প্রাইমারি, ৭ বছরের জন্য সেকেন্ডারি ও ৪ বছরের জন্য কলেজ স্তরের কোর্স তৈরি করে তা কার্যকর করা হয়। জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অধিনে ক্রমে বহু “জাতীয় বিদ্যালয়” এই সময় গড়ে ওঠে। এর মধ্যে ২৫টি ছিল মাধ্যমিক এবং ৩০০টি ছিলো প্রাথমিক স্কুল।
১৯১০ সালে, সোসাইটি ফর দ্য প্রোমোশন অফ টেকনিক্যাল এডুকেশন বঙ্গে “বেঙ্গল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট” প্রতিষ্ঠার পর ১৯২০ সালে এটিকে “কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, বেঙ্গল” নামে নামকরণ করা হয়। স্বাধীনতার পর, ১৯৫৫ সালের ২৪ ডিসেম্বরে ভারত সরকারের সম্মতিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদের অন্যান্য সহকর্মী সদস্য এবং অধ্যাপকদের সঙ্গে আলোচনায় ডঃ ত্রিগুনা সেন একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। জাতীয় পরিষদের দখলে থাকা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের অবশিষ্ট দুই বিঘা জমিতে একটি মডেল স্কুল স্থাপনের পরামর্শ দেন তিনি। এভাবেই যাত্রা শুরু। ডঃ ত্রিগুণা সেনের প্রবল ইচ্ছার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যক্রমের কাঠামো নকশা তৈরির জন্য একটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়। ১৯৫৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পরিষদের তৎকালীন সভাপতি ড. বিধান চন্দ্র রায় সাব-কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেন। যাদবপুর বিদ্যাপীঠ প্রতিষ্ঠা হয় ১৯৫৭ সালের ১১ ই মার্চ।

কোনও ইতিহাসই একদিনে গড়ে ওঠে না। যে স্বপ্ন নিয়ে ঋষি অরবিন্দ এবং রবীন্দ্রনাথ ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন বেঙ্গল শুরু করেছিলেন, তাঁদের সেই উন্নত চিন্তার প্রতিফলনে গড়ে উঠেছিল যাদবপুর বিদ্যাপীঠ, সেই ভাবনার প্রতিফলন স্কুলের প্রতিটি কাজেকর্মে এখন প্রকট হয়ে রয়েছে।
লেখাপড়া ছাড়াও খেলাধুলা এবং বিভিন্ন রাজ্য ও জাতীয়স্তরের প্রতিযোগিতায় যাদবপুর বিদ্যাপীঠের সাফল্য রাজ্যের অন্যান্য বাংলা মাধ্যম স্কুলের নজর কেড়েছে। বেঙ্গল স্কুল টেবিল টেনিস চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৩-এ যাদবপুর বিদ্যাপীঠ রানার্স আপ হয়েছে। স্কুলের তরফে এই সাফল্যের জন্য স্কুলের দুই টেবিল টেনিস খেলোয়াড় হিমন মণ্ডল ও অনিন্দ্য হালদারের এই সাফল্যের জন্য স্কুল তাদের সংবর্ধিত করেছে। স্কুল শিক্ষকদের তরফে এই দুই টেবিল টেনিস খেলোয়াড় ছাত্রকে আগামী জীবনে আরও এগিয়ে যাওয়ার জন্য উৎসাহ দিয়ে বলেছে, তোমাদের কৃতিত্ব যে তোমরা তোমাদের সবটুকু দিয়েছ, আমাদের কাছে বিজয়ী তোমরাই। একই সঙ্গে স্কুলের তরফে শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে স্কুলের ক্রীড়া শিক্ষক দেবাশীষ মণ্ডলকে।
যাদবপুর বিদ্যাপীঠ স্কুল নিয়ে শিক্ষকদের পাশাপাশি গর্বিত স্কুলের ছাত্ররাও। এই প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল যাদবপুর বিদ্যাপীঠের একাদশ শ্রেণির কলা বিভাগের ছাত্র সুব্রজ বসুর সঙ্গে। সপ্তম শ্রেণি থেকে সুব্রজ যাদবপুর বিদ্যাপীঠে পড়ছে। এবার তার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে এই স্কুল ছাড়ার পালা। সেই প্রথম দিন থেকে শুরু করে এখনও পর্যন্ত স্কুলের সমস্ত স্মৃতিই তাকে ঘিরে রয়েছে।

“কোনটা ছেড়ে কোনটা বলবো? আমাদের স্কুল রাজ্য ও দেশের স্কুলগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য জায়গায় রয়েছে। আমি মনে করি আগামী দিনে দেশের মধ্যে তো বটেই রাজ্যেও প্রথম স্থানে পৌঁছে যাবে যাদবপুর বিদ্যাপীঠ স্কুল। কেননা জাতীয় ও রাজ্যস্তরে সমস্ত প্রতিযোগিতায় আমাদের স্কুল প্রথম সারিতেই থাকে। আমাদের স্কুলে থিম ভিত্তিক সরস্বতী পুজো হয়। আমরা স্কুল ভিত্তিক সরস্বতী পুজোয় পুরস্কারও পাই। এছাড়া খেলা, স্কুলের বাৎসরিক অনুষ্ঠান, যা শারদোৎসব নামেই আমাদের স্কুলে পরিচিত, স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সেই অনুষ্ঠানে নাটক, গান, নৃত্যানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, স্কুলের এক্সকারশন সবই আমি চূড়ান্ত উপভোগ করেছি এই স্কুলে। এতকিছুর মধ্যে লেখাপড়াটা ঠিকঠাক হয় বলেই আমরা ক্লান্তি অনুভব করি না।” এক নিঃশ্বাসে বলে চলে সুব্রজ।
কোনও ইতিহাসই একদিনে গড়ে ওঠে না। যে স্বপ্ন নিয়ে ঋষি অরবিন্দ এবং রবীন্দ্রনাথ বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ শুরু করেছিলেন, তাঁদের সেই উন্নত চিন্তার প্রতিফলনে গড়ে উঠেছিল যাদবপুর বিদ্যাপীঠ, সেই ভাবনার প্রতিফলন স্কুলের প্রতিটি কাজেকর্মে এখন প্রকট হয়ে রয়েছে। একেই বোধহয় সাফল্য বলে, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের তৈর্রি করা, যে শিক্ষা যাদবপুর বিদ্যাপীঠ অর্জন করতে পেরেছে। আর যার ফলে রাজ্যে যখন বাংলা স্কুলগুলো পড়ুয়ার অভাবে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, পাঠভবনের মতো বাংলা মাধ্যম স্কুলে যখন ২০২৪-সালেই শেষ বারের মতো বাংলায় মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে ছাত্রছাত্রীরা, সেখানে যাদবপুর বিদ্যাপীঠের মতো প্রথম সারির বাংলা মাধ্যম স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য রাত জেগে এখনও ফর্ম নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকেন অভিভাবকরা। তাই বলা যায়, সময়ের স্রোতে ভেসে না গিয়ে সময়ের সঙ্গে নিজেদের খাপখাইয়ে, পঠনপাঠন ব্যবস্থায় আরও আধুনিকতাকে সম্বল করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথ ধরেই এগিয়ে চলেছে যাদবপুর বিদ্যাপীঠ। যাদবপুর বিদ্যাপীঠ রাজ্যের বাংলা স্কুলের এই গর্বের ইতিহাস ধরে রেখে আগামী দিনে রাজ্যে স্কুল শিক্ষার ক্ষেত্রে আরও উল্লেখযোগ্য নজির সৃষ্টি করতে পারবে বলেই স্কুলের পড়ুয়া-অভিভাবক-শিক্ষক সবার দাবি।
___________________
তথ্য সূত্র: পার্থপ্রতিম বৈদ্য, প্রধান শিক্ষক, যাদবপুর বিদ্যাপীঠ
সুব্রজ বসু, একাদশ শ্রেণির ছাত্র, কলা বিভাগ, যাদবপুর বিদ্যাপীঠ
ছবি: সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।
