বাংলা থেকে ‘লক্ষ্মী সরা’র প্রচলন কি সত্যিই হারাতে বসেছে?

শিল্প, সাহিত্য, ভাষা – এমনকী ধর্মীয় আচার-উৎসবের ধরনও বদলে যাচ্ছে দিন দিন

আধুনিকতার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো দিনের বহু রীতি, রেওয়াজ, অভ্যেস। মাত্র দশ বছর আগেও বাংলার বাজারে যা রমরম করে চলত, আজকে তার আর অস্তিত্ব নেই। আগেকার প্রজন্মের মানুষরা অবশ্য এত সহজে নতুনকে জায়গা করে নিতে দিতেন না। অথচ আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেন মনে হয়, বদলে ফেলার নামই জীবন। শিল্প, সাহিত্য, ভাষা – এমনকী ধর্মীয় আচার ও উৎসবের ধরনও বদলে যাচ্ছে দিন দিন।

অন্য সবকিছুর মতোই, লক্ষ্মীপুজোর নিয়ম কানুন নিয়েও এতদিন ধরে চলেছে নানান কাটাছেঁড়া। আর এই বিবর্তনের বিপাকে পড়ে যার চর্চা একেবারেই কমে এসেছে, তা হল ‘লক্ষ্মীর সরা’ (Lakshmi Shara)। শিল্পের এই ধারায়, গোল আকৃতির মাটির সরার উপর নানান রঙ দিয়ে আঁকা হয় মা লক্ষ্মীর ছবি। বর্তমানে মূর্তি পূজার রমরমায় অনেকাংশে চাপা পড়ে গেছে লক্ষ্মী’র সরা পুজো। চাহিদা কমলেও, খুঁজলে কলকাতার বিশেষ কিছু বাজারে এখনও পাওয়া যাবে রঙিন এই সরা।

টেরাকোটার সরার উপরের অপেক্ষাকৃত উঁচু অংশে, বিভিন্ন ধাঁচে আঁকা হয় লক্ষ্মীমূর্তি। আজকাল দোকানে যে সরা পাওয়া যায়, তা তৈরি হয় নানা ধরনের মাটি কাদার মিশ্রণে। সরার জন্য সবথেকে বেশি খ্যাতি অর্জন করেছে পটুয়াপাড়া। পটুয়ারা  সরা আঁকার পাশাপাশি জারি রেখেছে পটচিত্র এবং চালচিত্র-র মত প্রায় হারিয়ে যাওয়া শিল্পের সাধনাও।

লক্ষ্মীর সরা পাওয়া যেতে পারে কালীঘাটের স্থানীয় দোকানগুলোতে। মূলত উত্তর চব্বিশ পরগণার দত্তপুকুর থেকে এই সরা আমদানি করা হয়। এছাড়া অনেক দশকর্মা ভাণ্ডারেও এই সরা পাওয়া যায়। অনেকে আবার শুধু মাটির সরা কিনে নিয়ে যান নিজেরা আঁকবেন বলে। এমনকী বাংলার প্রাচীন শিল্পগুলির মধ্যে অন্যতম হিসাবে গণ্য হওয়ার কারণে, কখনো সখনো স্কুলগুলি থেকে কচিকাঁচাদের সরা আঁকবার অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়। এতে একদিকে যেমন মাটির পাত্রের উপর তরল রঙ ব্যবহার করে আঁকবার অভিজ্ঞতা হয় ছোটোদের, তেমনই তারা বাংলার এই হারিয়ে যাওয়া শিল্পের সম্বন্ধে নতুন করে জানতে পারে। নিজেদের অজান্তেই জুড়ে যেতে পারে কয়েক দশকের পুরোনো, পিছনে ফেলে আসা এক ঐতিহ্যের সঙ্গে।

সরাতে একত্রে দেবী দুর্গা ও লক্ষ্মী

খেয়াল করলে দেখা যাবে, বেশির ভাগ সরাগুলি আঁকার ধরন খানিকটা যামিনী রায়ের আদলে, যেমনটা তিনি আঁকতেন ১৯২০ কিংবা ১৯৩০ নাগাদ। সংস্কৃত স্কলার সর্বাণী ঘোষ বসু বলেন, “সরা মূলত দুই ধরনের হয়। এক, যার উপর চার সন্তানকে নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় মা দুর্গাকে। এই সরার নীচের অংশে আঁকা থাকে দেবী লক্ষ্মীর একার প্রতিকৃতি। অন্য ধরনের সরায় দেবী লক্ষ্মীকে দেখতে পাওয়া যায় তাঁর দুই সখী জয়া ও বিজয়ার সঙ্গে। এই সরায় দেবী লক্ষ্মী মা দুর্গারই অন্য এক রূপ হিসাবে পূজিত হন।” তিনি আরও বলেন, “দেবদেবীদের মূর্তির মত সরাগুলি কখনোই জলে ভাসান দেওয়া হয় না। বরং আজীবন বাড়িতে রেখে পুজো করা হয়।” সর্বাণী দেবীর পরিবারও কয়েক প্রজন্ম ধরে রক্ষণাবেক্ষণ করে চলেছেন তাঁদের সংগ্রহে থাকা সরাগুলির। তাঁরা অবশ্য বেশি পছন্দ করেন সন্তান সন্ততি সহ দুর্গা আঁকা সরাগুলি। তাঁর কথায়, “দেবী লক্ষ্মীর ছবি আঁকা সরার ব্যবহার হয় মূলত ঘরোয়া লক্ষ্মী পুজোতে।”

তবে, বর্তমান সময়ে বেশিরভাগ মানুষই সরার বদলে বেছে নিচ্ছেন মাটির বা কোনো ধাতুর তৈরি মূর্তি। কালীঘাটের পু্রোনো এক দোকানের কর্ণধার নির্মল কুমার পাল বলেন, “এখন মূর্তির চাহিদা সরার থেকে অনেকটাই বেশি। যদিও এখনও কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা দোকানে এসে সরার খোঁজ করেন। তাঁদের জন্যই এখনও ১০০ বা তার কিছু বেশি সংখ্যক সরা আমরা সবসময় মজুত রাখি। এর মধ্যে ধরুন ১০০টাই বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু, সেদিক থেকে দেখলে মূর্তি বিক্রি হয় ২০০ কিংবা তারও বেশি।” এই বিভাজনটা কেন, তা জিজ্ঞেস করতে অন্য এক দোকানী জানান, “মাটির সরা সাধারণত দেওয়ালে ঝুলিয়ে রাখতে হয়। ফলে পুরোহিতের পক্ষে তা পুজো করা সমস্যার হয়ে দাঁড়ায়। আজকাল যারা সরা কেনেন, তাঁরা তা মূর্তির মতোই এক বছর পর ভাসান দিয়ে দেন। অন্যদিকে, মূর্তি খুব সহজেই ঠাকুরঘরে রেখে পুজো করা যায়।”

লক্ষ্মীর সরা

উত্তর চব্বিশ পরগণার পানিহাটি থেকে সরা আনা হয় এখানে। দাম রাখা হয় ১৩০ থেকে ১৪০-এর মধ্যে। যদিও চাহিদা বাড়লে দাম চড়ে যায় ২২০ পর্যন্ত। আকারে বড়ো ছোটো অনুযায়ীও পার্থক্য হয় দামে। লেক মার্কেট-এর এক দশকর্মা ভাণ্ডারের দোকানদার বলেন, “পুজোর সময়ে অনেকে খালি সরাও কিনে নিয়ে যান অন্যান্য ধর্মীয় আচারের জন্য। অনেকে আবার খালি সরায় নিজে হাতে এঁকে, সেই সরাই পুজো করেন।”

বাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরেই চল রয়েছে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার। মনে করা হয়, তাঁর আশীর্বাদ পেলে গৃহস্থের ধনবৃদ্ধি ঘটে। ঐতিহ্যে বিশ্বাসী বহু বাঙালি তাই আজও সবার আগে বেছে নেন মাটির সরাকেই। আসলে, সরা হোক বা মাটির প্রতিমা, দেবীকে সন্তুষ্ট করাই পুজোর মূল লক্ষ্য। হয়তো আজ থেকে বেশ কিছু বছর পর আবারও সরার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে উঠবে। কারণ সবশেষে মানুষ তো কেবল বদলই চায়। তবে একথা না বললেই নয় যে, জনপ্রিয় হয়ে উঠুক বা না উঠুক, বঙ্গবাসী হিসাবে আমাদের উচিৎ প্রাচীন কাল থেকে চলে আসা এই সরা শিল্পের সংরক্ষণে তৎপর হয়ে ওঠা; আগলে রাখা বাংলার হারাতে বসা এক ঐতিহ্যকে।

মূল প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে এখানে করুন।

Developed by DXDasia