আর্ট ভিলা গ্যালারিতে আর্ট ইম্প্রেশন আয়োজন করেছিল একটি কর্মশালা
কথিত আছে, কলকাতার দেওয়ালে দেওয়ালে ইতিহাস লিপিবদ্ধ আছে। কান পাতলেই ইতিহাসের ধ্বনি ইকো হয়ে ফিরে আসে নিজের কাছেই। আসলে প্রত্যেকটা শহর/গ্রামের নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে। যার উপর দাঁড়িয়ে থাকে সেখানকার সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি। কিন্তু ক্যালকাটা বা কলকাতার ইতিহাস ভারতবর্ষের সমস্ত শহরের থেকে আলাদা। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকালে কলকাতা ছিল ভারতের ব্রিটিশ-অধিকৃত অঞ্চলগুলির রাজধানী। উনিশশো শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকেই স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র ছিল কলকাতা। ১৯১১ সালে ভারতের মতো একটি সৌভ্রাতৃত্বপূর্ণ বৃহৎ রাষ্ট্র শাসনে ভৌগোলিক অসুবিধার কথা চিন্তা করে এবং বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের রাজধানী স্থানান্তরিত হয় দিল্লিতে।

কর্মশালায় ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে দেবদত্ত গুপ্ত এবং শুভময় মিত্র
পাশাপাশি এ-ও খেয়াল করা দরকার — কলকাতা মানেই শুধুমাত্র ভিক্টোরিয়া, কুমোরটুলি কিংবা মনুমেন্ট নয়। শহুরে ইট-বালি-রডের বাইরেও পড়ে আছে এক বৃহত্তর কলকাতা। যে চোখের দিকে এখনও চোখ রাখতে পারেনি অনেকেই। যে কারণে চিনা খাবার থেকে ইটালিয়ান বা ঢাকাইয়া ইলিশ থেকে আলু বিরিয়ানি — হদিস মিলবে একমাত্র এই শহরেই। এই শহরের বুকেই বো ব্যারাকস কলোনির পড়শি হয়ে যায় বাঘাযতীন কলোনি।
আলোকচিত্রী- শুভময় মিত্র
কলকাতা কি এখনও ভারতের বৃহত্তম সাংস্কৃতিক রাজধানী? এমনই এক বিষয় নিয়ে কলকাতার আর্ট ভিলা গ্যালারিতে ইম্প্রেশন আয়োজন করেছিল একটি কর্মশালা। যেখানে বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন শিল্প-সমালোচক দেবদত্ত গুপ্ত এবং আলোকচিত্রী শুভময় মিত্র। এই কর্মশালাকে দুটি অংশে ভাগ করে দেওয়া হয়। ছাত্রছাত্রীদের বোঝাবার সময় ডঃ গুপ্ত বলছিলেন, শিল্পচর্চা, সাহিত্য, রাজনীতি থেকে শুরু করে খেলাধুলো — আদর্শগতভাবে কলকাতা তথা সমগ্র বাংলা ছিল ভারতবর্ষের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু বিগত কয়েক দশকের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কলকাতা অনেকাংশেই তার গৌরব হারিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরিসংখ্যানে বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশ মেধাও আজ বাংলা বিমুখ। কিন্তু সত্যিই কি কলকাতা হারিয়েছে তার নিজস্ব ছন্দ? না। কলকাতা আজও দেশের বহুমুখী সংস্কৃতিকে বয়ে নিয়ে চলেছে।

কথোপকথনে শিল্প সমালোচক দেবদত্ত গুপ্ত
শুভময় মিত্রের আলোচনায় চলে আসে একটি শহরের সঙ্গে ফটোগ্রাফারের সম্পর্ক। চলে আসেন প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার ট্রেন্ট পার্ক এবং অ্যালেক্স ওয়েবের উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ। তা বোঝাতে গিয়ে বিভিন্ন দেশের ফটোগ্রাফারদের কথা তিনি বলছিলেন। বলছিলেন একটি ছবির রাজনৈতিক ভাষা হয়ে ওঠে আলোর ভাষা। সেখানে ঘড়ির অনুষঙ্গ পাল্টে এ যুগের সিসিটিভিতে এসে মিশে যায়। কাল বা মহাকালের সংজ্ঞা পাল্টাতে থাকে ধীরে ধীরে। তিনি বলছিলেন, ছবির গল্প ছাড়াও আরও অনেক জিনিস থাকে, যা ছবিকে সম্পূর্ণ করে। সিসিটিভি উপর থেকে ব্রহ্মার মতো যেন সবটা ফলো করছেন, সবটা ডকুমেন্টেশন করছেন। এখানেই কাল থেকে মহাকাল চক্রাকারে ঘুরছে অনবরত। চোখের সামনে সবকিছু সে নজরে রাখে। চাইলে বুঝে নেয় কে গেল, কে এল, কী হল সবকিছু। ফটোগ্রাফিতে এই উপকরণগুলো ব্যবহৃত হলে তা প্র্যা ক্টিক্যাল থেকে ফিলোসফিক্যাল হয়ে ওঠে।

শুভময় মিত্র আমাদের জানান, কলকাতায় যে এত এত ফটোগ্রাফার ছবি তুলছেন, তাতে ক্ষতি কোথায়! যত বেশি ছবি তোলা হবে ততই ভালো। এখানেই কলকাতা এখনও এগিয়ে। শুধু আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, আমরা যেন কাউকে ডিসটার্ব না করি। এই কর্মশালার মাধ্যমে উঠে এল, ক্যামেরা নিয়ে শুধুমাত্র কলকাতার আলোচিত সংস্কৃতির ছবি খুঁজলেই হবে না। এখনও অনেক কিছু বাকি থেকে গেছে। লেন্সে তার চেহারাটা ঠিক কেমন? কোথায়, কখন, কীভাবে তুললে ছবিটা অর্থবহ হয়, সমাদৃত হয়, তাই নিয়ে ফোটোগ্রাফি ওয়ার্কশপ। এই বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, দুনিয়ার বহু বিখ্যাতদের কাজ, পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ছিল এই কর্মশালার উল্লেখযোগ্য অংশ। সেই সঙ্গে ছিল নিজের তোলা ছবি নিয়ে আলোচনা।
ক্লাস নিচ্ছেন আলোকচিত্রী শুভময় মিত্র। দেখুন এক্সক্লুসিভ ভিডিও।
ইম্প্রেশেনের দুই কর্ণধার সায়ন্তনী চাকী এবং শুভদীপ দাঁ বলেন, বর্তমান সময়ে সামগ্রিক বাংলার চেহারাটা হয়তো পাল্টে গেছে কিছু কারণে৷ যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে রাজধানী কলকাতায়। আমাদের প্রজন্মের এক অংশের ছেলে-মেয়েরা উচ্চশিক্ষার জন্য অন্য দেশে চলে যাচ্ছেন। পরবর্তীকালে চাকরি পাবার পর আর বাংলামুখী হতে চাইছেন না। কিন্তু এটা তো হওয়ার কথা ছিল না। তাহলে কলকাতা-সহ গোটা বাংলা কোথায় পিছিয়ে যাচ্ছে! সেটা জানার এবং বোঝার আগ্রহ থেকেই এই কর্মশালার আয়োজন। আর কলকাতা মানেই ভিক্টোরিয়া বা হাওড়া ব্রিজ, এই ধারণাগুলো বাদ দিয়ে যদি অন্যরকমভাবে ভাবা যায়, তাহলে শিল্পের জন্য তা উৎকৃষ্ট হবে।
রঘুবীর সিং-এর ছবি সৌজন্যে- Calcutta (1975), (preface by Joseph Lelyveld), Perennial, Bombay এবং Calcutta: the home and the street (1988), Thames and Hudson, London and New York; Chêne, Paris. ISBN 0-500-24133-3.