‘রামন এফেক্ট’ আবিষ্কার ও পরবর্তী দিনগুলি

আগে থেকেই আত্মবিশ্বাসী ছিলেন রামন, নোবেল তিনি পাবেনই

চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামনের গবেষণা চলছে তখন পুরোদমে। ভারতের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী তখন তিনি। ১৯২৮-এর ফেব্রুয়ারির ২৭ তারিখ রামন ঠিক করলেন বর্ণালীবীক্ষণ যন্ত্রের (spectroscope) সাহায্যে আলোর বিক্ষেপণে পরিবর্তিত বর্ণালী পর্যবেক্ষণ করবেন। এসোসিয়েশানের ল্যাবোরেটরিতে আশুবাবু সারাদিন ধরে যন্ত্রপাতি সেট করলেন। সবকিছু ঠিকঠাক করতে করতে সূর্য ডুবে গেল। সূর্যালোকের অভাবে সেদিন আর কিছু করা গেলো না। পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে সূর্য ওঠার পর পরই শুরু হলো পর্যবেক্ষণ। একটু পরেই দেখা গেলো নির্দিষ্ট বর্ণের আলোর বর্ণালীর পাশে আরেকটি ভিন্ন বর্ণের আলোক রেখা – “রামন রেখা”। আবিষ্কৃত হলো ‘রামন ইফেক্ট’। আশুবাবু একটা মার্কারি আর্ক সেট করলেন যেখান থেকে পাওয়া গেল এক বর্ণের উজ্জ্বল সাদা আলোক রেখা। এই আলোতে নীল বর্ণের তরঙ্গদৈর্ঘের চেয়ে লম্বা অন্যসব তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলোক রেখা ঢাকা পড়ে যাবার কথা। ঢাকা পড়ে গেলো ঠিকই – কেবল নীল-সবুজ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সীমানায় দুটো নতুন রেখা ছাড়া। এই নতুন রেখা সৃষ্টি হয়েছে যে বিক্ষেপণের প্রভাবে তার নাম দেয়া হলো ‘রামন ইফেক্ট’।

পরদিন ১৯২৮ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সারা পৃথিবী জেনে গেলো ‘রামন ইফেক্ট’ আবিষ্কৃত হয়েছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলো ‘নিউ থিওরি অব রেডিয়েশান’। মার্চের আট তারিখে নেচার জার্নালে পাঠানো হলো ‘রামন ইফেক্ট’ সংক্রান্ত নোট। কিন্তু একজন রেফারি তা প্রকাশযোগ্য নয় বলে পেপার প্রত্যাখ্যান করলেন। কিন্তু নেচার জার্নালের এডিটর দেখলেন এটা একটা সত্যিকারের যুগান্তকারী আবিষ্কার। নেচারে প্রকাশিত হলো ‘রামন ইফেক্ট’ আবিষ্কারের কথা।

রামন ইফেক্ট আলোক তরঙ্গের অজানা পথ খুলে দিয়েছে। শক্তির স্তর এবং অণু ও পরমাণুর গঠন বুঝতে অনেক সহায়তা করেছে রামন-ইফেক্ট। পদার্থবিজ্ঞানের অনেক শাখায় রামন ইফেক্ট কাজে লাগছে। জীববিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞানেরও অনেক শাখায় রামন-ইফেক্ট কাজে লাগিয়ে অনেক নতুন নতুন গবেষণা হচ্ছে।

১৯২৯ সালে ব্রিটিশ সরকার সি ভি রামনকে নাইট খেতাব দিলে রামনের নামের আগে ‘স্যার’ যুক্ত হয়। স্যার সি ভি রামন দ্রুত হয়ে ওঠেন ভারতীয় বিজ্ঞানের জগতের জীবন্ত কিংবদন্তী। সাধারণত বিজ্ঞানের যে কোন আবিষ্কারের পর অনেক বছর লেগে যায় তার স্বীকৃতি পেতে। বিশেষ করে নোবেল পুরষ্কারের মত পুরষ্কার পাবার ক্ষেত্রে। কিন্তু রামনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ঘটে গেলো মাত্র দু’বছরের মধ্যেই। ১৯৩০ সালেই ‘রামন ইফেক্ট’ আবিষ্কারের জন্য নোবেল-পুরষ্কার পেলেন স্যার সি ভি রামন। রামন যেন অনেক দিন আগে থেকেই জানতেন যে তিনি নোবেল পুরষ্কার পাবেন। এ ব্যাপারে কিছু কিছু ঘটনা খুবই আশ্চর্যজনক মনে হয়। ১৯২৪ সালের শেষে রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ পাবার পর রামনকে যখন সম্বর্ধনা দেয়া হয় – রামন বলেছিলেন “আশা করছি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে আমি ভারতের জন্য নোবেল পুরষ্কার নিয়ে আসতে পারব”।ঠিক পাঁচ বছর পরেই তিনি নোবেল পুরষ্কার পেলেন। শুধু তাই নয়, ১৯২৫ সালে শিল্পপতি জি ডি বিড়লা’র কাছে স্পেক্ট্রোগ্রাফ কেনার জন্য টাকা চেয়ে লেখা এক চিঠিতে লেখেন – “আমি যদি এই যন্ত্রটা পাই, তাহলে ভারতের জন্য নোবেল পুরষ্কার এনে দিতে পারবো”।

১৯৩০ সালের অক্টোবরে নোবেল পুরষ্কার ঘোষিত হয়। ডিসেম্বরের দশ তারিখে আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুদিনে সুইডেনের স্টকহোমে নোবেল ফাউন্ডেশানে আনুষ্ঠানিক ভাবে নোবেল পুরষ্কার হাতে তুলে দেয়া হয়। এ অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য রামনের জাহাজের টিকেটের ব্যবস্থা করতে গেলে নোবেল কর্তৃপক্ষ একটা অত্যাশ্চর্য ঘটনার মুখোমুখি হন। সি ভি রামন তাঁর নিজের জন্য ও তাঁর স্ত্রী লোকসুন্দরীর জন্য জাহাজের দুটো টিকেট বুক করে রেখেছেন ১৯৩০ সালের জুলাই মাসে। অথচ সেই সময় নোবেল কমিটির মিটিং-ও হয়নি। নোবেল পুরষ্কারের ব্যাপারে রামনের মধ্যে এক ধরণের নেশা কাজ করতো। তিনি জানতেন নোবেল পুরষ্কার-ই হলো একজন বিজ্ঞানীর কাজের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। কিন্তু এ ব্যাপারে এতটা নিশ্চিত তিনি ছিলেন কীভাবে?

নোবেল পুরষ্কার পাবার পর খ্যাতি ও সাফল্যের শীর্ষে উঠে গেলেন সি ভি রামন। মহেন্দ্রলাল সরকারের স্বপ্ন সার্থক হলো রামনের হাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে শুধুমাত্র নিজের দেশে আইএসিএস-এ গবেষণা করে নোবেল পুরষ্কার নিয়ে এসেছেন রামন। আর কী চাই? অনেক ছাত্র-ই রামনের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করার জন্য উৎসাহী হয়ে উঠলো। বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের অনেকেই – যারা রামনের সর্বভারতীয় পরিচয়ের চেয়েও রামনকে একটু বেশি নিজেদের লোক মনে করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ও ইন্ডিয়ান এসোসিয়েশান ফর দি কাল্টিভেশান অব সায়েন্সের অন্যান্য বাঙালি অধ্যাপকদের মনে কিছুটা ঈর্ষার মেঘ স্বাভাবিক ভাবেই জমতে শুরু করলো। ব্যাক্তিত্বের সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠলো। এতদিন যাঁরা রামনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন তাঁরাই আস্তে আস্তে রামনের খুঁত বের করতে শুরু করলেন। রামনের ক্ষুরধার জিভ থেকে যে সোজাসাপ্‌টা কথাগুলো সব সময় বেরোয় সেই অপ্রিয় সত্যকথাগুলো কেউ আর সহ্য করতে রাজি নন। ‘রামন-ইফেক্ট’ আবিষ্কারের অনেক কাজই করেছেন তাঁর ছাত্র কে এস কৃষ্ণান। অথচ রামন কৃষ্ণানকে ‘রামন-ইফেক্ট’ আবিষ্কারের কোন কৃতিত্বই দেননি, পুরোটাই নিজের করে নিয়েছেন। ডিপার্টমেন্টে এ নিয়ে কথা উঠলে বদরাগী রামন মুখে যা আসে তাই বললেন। রামনের বেশির ভাগ গবেষণা-ছাত্রই দক্ষিণ ভারতীয়। এ ব্যাপারে রামনকে ‘বাঙালি-বিদ্বেষী’ বলে অপবাদ দেয়া হলো। রামনের মন উঠে গেলো কলকাতা থেকে।

১৯৩২ সালের শেষের দিকে ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের পরিচালক স্যার মার্টিন ফরস্টার অবসরে গেলে নতুন পরিচালক পদ গ্রহণ করার জন্য লর্ড রাদারফোর্ডকে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু রাদারফোর্ড বললেন – “ইন্ডিয়ার জন্য এখন তো আর ইংল্যান্ড থেকে কাউকে নিয়ে যাবার দরকার নেই যেখানে সি ভি রামনের মত যোগ্য লোক রয়েছেন”। ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের কাউন্সিল রামনকে পরিচালক পদ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করলেন। রামন কলকাতায় আই-এ-সি-এস এর দায়িত্ব উপযুক্ত কারো হাতে না দিয়ে কীভাবে ব্যাঙ্গালোরে যাবেন? এসোসিয়েশানের সুনাম এবং অর্থনৈতিক অবস্থা তখন অনেক ভালো। রামন ভাবলেন ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের নামে অধ্যাপকের পদ সৃষ্টি করবেন এবং সেই পদে যিনি আসবেন তাঁর হাতেই তুলে দেবেন এসোসিয়েশানের সব দায়িত্ব।

এদিকে অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা তখন এলাহাবাদে। ১৯২১ সালে ইউরোপ থেকে ফিরে এসে তিনি কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু ডিপার্টমেন্টের অর্থনৈতিক দুরাবস্থার কারণে তাঁর কোন ল্যাবোরেটরি ছিল না। ফলে গবেষণার সুযোগের জন্য তিনি এলাহাবাদ ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু এলাহাবাদেও তিনি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছিলেন না। ফলে দশ বছরের মধ্যেই তিনি কলকাতায় ফিরে আসার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। এসোসিয়েশানে মহেন্দ্রলাল সরকারের নামে নতুন পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়ার কথা শোনার পর তিনি সেই পদের জন্য আগ্রহী হয়ে উঠলেন। সি ভি রামনকে চিঠি লিখে জানালেন নিজের আগ্রহের কথা। প্রফেসর মেঘনাদ সাহা সেই পদের জন্য খুবই যোগ্য মানুষ। কিন্তু রামনের মনে হলো সাহার চেয়ে কৃষ্ণান-ই বেশি উপযুক্ত নতুন এই পদের জন্য। তিনি মেঘনাদ সাহাকে লিখে জানালেন তাঁর সিদ্ধান্তের কথা। মেঘনাদ সাহা চিঠি পেয়ে খুবই অপমানিত বোধ করলেন। ফল যা হলো তা সাংঘাতিক। এসোসিয়েশানের কাউন্সিল মিটিং-এ রামনের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় দাঁড় করানো হলো। কাউন্সিলের ভোটে এসোসিয়েশানের পদ থেকে রামনকে সরিয়ে দেয়া হলো। তবে পদত্যাগ করার আগে রামন ‘মহেন্দ্রলাল সরকার প্রফেসর’ পদে কে এস কৃষ্ণানের নিয়োগ নিশ্চিত করে যান। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও পদত্যাগ করলেন রামন।

১৯৩৩ সালে ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের পরিচালক পদে যোগ দিলেন রামন। হিটলারের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আইনস্টাইন সহ আরো অনেক পদার্থবিজ্ঞানী ইউরোপ ত্যাগ করে চলে যাচ্ছিলেন এ সময়। রামন ভাবলেন এঁদের কাউকে যদি ভারতে নিয়ে আসা যায় তাহলে ভারতের বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটানো সম্ভব। ভারতীয় শিক্ষার্থীদের বিদেশে গিয়ে পড়াশোনা করার পক্ষপাতী ছিলেন না রামন। তাঁর মতে এ দেশের শিক্ষার্থীরা বিদেশে গিয়ে বিদেশী পরিবেশে কেবল বিদেশীদের নকল করতে শিখে, নিজেদের চিন্তাভাবনা নিজেদের দেশে কাজে লাগানোর শিক্ষা পায় না। ফলে তারা নিজের দেশে ফিরে এলেও দেশের কোন কাজে লাগে না। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই আবার বিদেশে চলে যাবার চেষ্টা করে। কিন্তু ইউরোপের যেসব বিজ্ঞানী এখন দেশ বদলাচ্ছেন তাঁদেরকে যদি ভারতে নিয়ে আসা যায় তাহলে ভারতে বসেই ইউরোপীয় শিক্ষার ব্যবস্থা করা সম্ভব। কাজ শুরু করে দিলেন রামন। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের অন্যতম জনক ম্যাক্স বর্নের জন্য ইনস্টিটিউটে পদার্থবিজ্ঞানের বিশেষ প্রফেসর পদ সৃষ্টি করলেন। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আরেক পথিকৃৎ শ্রোডিংগারের কাছেও চিঠি লিখলেন। কিন্তু চিঠি পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাওয়ায় শ্রোডিংগার ডাবলিনে চলে গেছেন। রামনের তালিকায় আরো অনেকের নাম ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে বেশিদূর আগাতে পারলেন না তিনি – প্রশাসনিক জটিলতায়। নিজের আকাশচুম্বী অহংবোধের কারণে ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবে তিনি নিজে যেটা ভালো মনে করেছেন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন পরিচালনা পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই। ফলে এখানেও সমস্যা হলো। পরিচালক পদ থেকে সরে আসতে হলো তাঁকে। তবে ইনস্টিটিউটে তাঁর প্রফেসর পদ বহাল রইলো।

১৯৩৪ সালে রামন প্রতিষ্ঠা করলেন ইন্ডিয়ান একাডেমি অব সায়েন্স এবং সারা ভারতের প্রতিভাবান বিজ্ঞানীদের একাডেমির ফেলোশিপ দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। রামন ছিলেন একাডেমির প্রথম সভাপতি। পরবর্তী বিশ বছরের মধ্যে ইন্ডিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সের প্রসিডিংস পৃথিবীর সেরা জার্নালের তালিকাভুক্ত হয়। ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ইনস্টিটিউটের প্রফেসর হিসেবে কর্মরত ছিলেন রামন। এই চৌদ্দ বছরে তিনি অনেক বিচিত্র বিষয়ে গবেষণা করেছেন। কঠিন পদার্থের থার্মো-অপটিক, ফটো-ইলাস্টিক, ম্যাগনেটো-অপটিক বিহেভিয়ার, সেকেন্ড অর্ডার রামন ইফেক্ট, ইনফ্রারেড স্পেক্ট্রোস্কপি ইত্যাদি বিষয়ে রামনের বিখ্যাত সব গবেষণা-পত্র প্রকাশিত হয়েছে এই সময়। তাঁর ছাত্র কৃষ্ণান সেমিকন্ডাক্টর ফিজিক্সে নতুন তত্ত্ব আবিষ্কারের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তাঁকে কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে হয়। কৃস্টাল ম্যাগনেটিজমের ওপর তাঁর সংগৃহীত সব উপাত্ত নষ্ট হয়ে যায় [8]।

ভারতের স্বাধীনতার পরের বছর ১৯৪৮ সালে রামন ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট থেকে অবসর গ্রহণ করেন। স্বাধীন ভারত সরকার তাঁকে দেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেন। এসময় রামন নিজের জন্য একটা রিসার্চ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। ব্যাঙ্গালোরে ইনস্টিটিউটের জন্য দশ একর জমি পাওয়া গিয়েছিল মহিশূরের রাজার কাছ থেকে। ওখান থেকে কিছু জমি রামন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জন্য দেয়া হলো। রামন নিজের ও স্ত্রীর সমস্ত সঞ্চয় ঢেলেও প্রতিষ্ঠানটি দাঁড় করাতে পারলেন না। তিনি চাঁদা সংগ্রহে নেমে পড়লেন। সরকারের কাছে সাহায্য চাওয়ার বদলে তিনি সাধারণের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহকেই প্রাধান্য দিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি যুক্তি দেখালেন “আমাদের সব বিখ্যাত মনীষীরাই ভিক্ষুক ছিলেন – বৌদ্ধ, শঙ্করাচার্য, এমন কি মহাত্মা গান্ধী পর্যন্ত” [1]। কিন্তু চাঁদা সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করা গেলেও টিকিয়ে রাখার মত অর্থ জোগাড় হলো না। এবার একজন প্রাক্তন ছাত্রের সহযোগিতায় দুটো রাসায়নিক কারখানা খুলে সেগুলোর লভ্যাংশ থেকে ইনস্টিটিউট চালানোর ব্যবস্থা করলেন। ষাট বছর বয়সে রামন রিসার্চ ইনস্টিটিউট স্থাপন করে পরবর্তী বাইশ বছরে তাঁর এই প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রায় দু’শ গবেষণা-পত্র প্রকাশ করেছেন রামন। জীবনের শেষের দিকে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে সময় কাটিয়েছেন অনেক। তাদেরকে নিজের প্রতিষ্ঠান ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন প্রায় প্রতিদিন।

১৯৫৪ সালে রামনকে ভারত রত্ন উপাধি দেয়া হয়। ১৯৫৭ সালে দেয়া হয় লেনিন শান্তি পুরষ্কার। জীবনের শেষ কয়েকটি বছরে তিনি সব ধরণের সংগঠনের সাথে যোগাযোগ ছিন্ন করে পুরোপুরি স্বাধীন হয়ে যেতে চেয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে রয়েল সোসাইটির ফেলোশিপ ফিরিয়ে দেন। রয়েল সোসাইটির ইতিহাসে এটা ছিল একটা ব্যতিক্রমী ঘটনা।

১৯৭০ সালের ২১শে নভেম্বর রামনের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর অনেকদিন আগেই তিনি বলেছিলেন – মৃত্যুর পর যেন কোন রকমের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা করা না হয় তাঁর জন্য। তিনি বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নিলেও, সারাজীবন মাথায় একটা টুপি বা পাগড়ির আচ্ছাদন দিয়ে রাখলেও – ধর্ম নিয়ে কখনো মাথা ঘামাননি। তাঁর মাথার পাগড়ি সম্পর্কে একবার প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “এটা না থাকলে কি সেদিন রাদারফোর্ড আমাকে চিনতে পারতেন? এটা আমার পরিচয়”। তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর ইনস্টিটিউটের বাগানে তাঁকে সমাহিত করা হয় এবং কোন ধরণের সমাধি-ফলক বা সমাধি-সৌধ এর বদলে সেখানে একটা গাছ লাগিয়ে দেয়া হয়।

রামন রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বাগানে এই গাছের নিচে রামনকে সমাহিত করা হয়।

(ঋণ – মুক্তমনা.কম)

Developed by DXDasia