ডেভিড ম্যাকাচিওনকে অনুসরণ করে সত্তরের দশকে কলকাতায় এসেছিলেন ড. মিশেল
“ঠিক যেন কমিকসের পাতার মতোই গল্প বলে চলে বাংলার কিছু মন্দিরের গায়ের টেরাকোটার কাজগুলি কারণ টেরাকোটার নকশাতেই ফুটে ওঠে পুরাণের বিভিন্ন কাহিনি…”
ডিসেম্বরের শীতের সন্ধ্যায় দক্ষিণ কলকাতার যদুনাথ ভবনে আমেরিকান ইন্সটিটিউট অব ইন্ডিয়ান স্টাডিজ এবং সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত তরুণ মিত্র স্মারক বক্তৃতায় বাংলার মন্দির (Temples of Bengal) সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে গিয়ে একথা বলেন ড. জর্জ মিশেল (Dr. George Michell)। মন্দির শুধুমাত্র দেবতার বাসভূমি নয় বরং বিভিন্ন রীতিতে তৈরি বিভিন্ন মন্দির নানান স্থাপত্যের ইতিহাস, ভাস্কর্যের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে যুগ যুগান্তর ধরে। বাংলার মন্দিরগুলোও তার ব্যতিক্রম নয়। বিশ্বের দরবারে বাংলার মন্দিরের এই গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন ডেভিড ম্যাকাচিওন (David McCutchion)। তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে স্থাপত্য বিশেষজ্ঞ ড. জর্জ মিশেল সম্পাদনা করেন: In the Footsteps of David McCutchion: Brick Temples of Bengal নামক বই। সত্তরের দশকের শেষভাগে ড. মিশেল পূর্ব ও পশ্চিম উভয় বাংলা নানান মন্দিরে ঘুরে তার স্থাপত্যরীতি নিয়ে চর্চা করেন। এদিন সন্ধ্যায় দুই বাংলার বিভিন্ন মন্দিরের ছবির মাধ্যমে তিনি মন্দিরগুলোর স্থাপত্য রীতির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন।
বক্তব্য রাখছেন ড. জর্জ মিশেল – বাঁদিকে তাঁর সম্পাদিত বই
বাংলা বা চালা, রত্ন এবং দেউল; নির্মাণশৈলীর নিরিখে বাংলার মন্দিরগুলোকে মূলত এই তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এছাড়াও রয়েছে নানা উপবিভাগ। যেমন চালা মন্দির শৈলীর বিভিন্ন উপবিভাগ একবাংলা বা দোচালা, জোড়াবাংলা, চারচালা, আটচালা প্রভৃতি। রথের আকৃতির বিভিন্ন রত্ন মন্দিরগুলোকেও একরত্ন, পঞ্চরত্ন, নবরত্ন ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা যায়। এছাড়াও অষ্টকোণ মন্দিরও দেখতে পাওয়া যায়।
বিশ্বের দরবারে বাংলার মন্দিরের এই গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন ডেভিড ম্যাকাচিওন। তাঁরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে স্থাপত্য বিশেষজ্ঞ ড. জর্জ মিশেল সম্পাদনা করেন: In the Footsteps of David McCutchion: Brick Temples of Bengal
বিষ্ণুপুরের জোড়বাংলা মন্দির
আরও পড়ুন: মন্দিরের শহর অম্বিকা কালনা
বাংলা বা চালা রীতি বাংলার জনপ্রিয় মন্দিরশৈলী। কুঁড়েঘরের আদলে গঠিত হয় এই ধরনের মন্দির। ডেভিড ম্যাকাচিওন মতে পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় পূর্ববঙ্গে এই রীতির মন্দির বেশি দেখতে পাওয়া যায়। আর পশ্চিমবঙ্গে বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত জোড়বাংলা মন্দির চালারীতির বিখ্যাত জোড়বাংলা মন্দির। মন্দিরের গায়ে অপূর্ব টেরাকোটার কারুকার্য দর্শকদের আকর্ষণের অন্যতম কারণ।
হুগলির বাঁশবেড়িয়ায় হংসেশ্বরী মন্দির
রত্ন রীতিও বাংলার অন্যতম মন্দির স্থাপত্য। বর্গাকার গর্ভগৃহের ওপরে সামান্য ঢালু ছাদ ও বাঁকানো কার্নিশ যুক্ত করে তৈরি মন্দির শীর্ষের ওপর চূড়া বসানো হয়, এই চূড়াকেই বলা হয় রত্ন। চূড়ার সংখ্যা অনুযায়ী একরত্ন, পঞ্চরত্ন, নবরত্ন প্রভৃতি নানা শৈলীর মন্দির দেখতে পাওয়া যায়। মন্দিরের গায়ে বিভিন্ন কারুকার্য এই রীতিতেও বর্তমান। বিভিন্ন স্থানে রত্ন মন্দিরের মধ্যেও নানা অভিনবত্ব দেখা যায়। প্রসঙ্গত বলা যায়, হুগলির বাঁশবেড়িয়ায় হংসেশ্বরী মন্দিরের কথা।
বাঁকুড়ার সোনাতাপালের সূর্যমন্দির
বাংলার মন্দির শৈলীর অন্যতম প্রাচীন রীতি দেউল। মুঘল যুগে রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে উত্তর ও পশ্চিমভাগ থেকে বহু মানুষ বাংলায় এসেছেন। তাদের হাত ধরে বাংলার মন্দির স্থাপত্য সমৃদ্ধ হয়েছে, এসেছে দেউল রীতি। বাংলায় সাধারণত শিখর দেউল, পীড়া দেউল ও বঙ্গীয় শিখর রীতির দেউল দেখতে পাওয়া যায়। বাঁকুড়ার সোনাতাপালের সূর্যমন্দিরে দেউল স্থাপত্যরীতি লক্ষ্য করা যায়।
এছাড়াও আটকোণা চূড়া বিশিষ্ট মন্দির বাংলার স্থাপত্যরীতির এক বিশেষ উদাহরণ, তবে এই রীতির মন্দির বেশ দুর্লভ। মুর্শিদাবাদের বড়নগরের একটি শিবমন্দিরে এই স্থাপত্যশৈলী লক্ষ্য করা যায়।
মুর্শিদাবাদের বড়নগরের শিবমন্দির
সোনার তরী কাব্যগ্রন্থের ‘বৈষ্ণব’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন “দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা”। যুগে যুগে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে মানুষ সেই প্রিয় দেবতার আলয় তৈরি করেছেন। তাই মানুষের চিন্তা ও সৌন্দর্যবোধের কারণে মন্দিরগুলো দেবালয়ের পরিচয় ছাড়িয়েও হয়ে উঠেছে শিল্পের স্থায়ী প্রদর্শনী। দেশ-বিদেশের শিল্পরসিক মানুষ বারবার আকৃষ্ট হয়েছেন বাংলা তথা ভারতের মন্দিরের প্রতি। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব বা অন্যান্য কারণে অনেক মন্দিরেরই শিল্পের ক্ষতি হয়েছে যথেষ্ট। তাই এখন মানুষের সচেতনতা এবং শুভবোধ রক্ষা করতে পারে এই ক্ষয়িষ্ণু গৌরবকে।