আজীবন ধরে সর্বসাধারণের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন ‘লিটল ম্যাগাজিন’
ছবি- সন্দীপ কুমার
ছোটোবেলায় আমাদের পাড়ায় এক ভবঘুরে বৃদ্ধাকে দেখতাম, এদিক-ওদিক থেকে রকমারি জিনিস কুড়িয়ে নিজের কোমরে পুঁটলি করে ঝুলিয়ে রাখতো। পুঁটলিগুলো এমনভাবে কোমরে সাজানো থাকতো, মনে হত যেন প্রস্ফুটিত পদ্ম। আর সেকারণেই বোধহয় পাড়ার লোকের কাছে সেই বৃদ্ধা হয়ে উঠেছিল ‘পদ্ম’, আর আমাদের ‘পদ্মদিদা’। পদ্মদিদা এমনিতে তার ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দিতো না কাউকে। তবে, মেজাজ ভালো থাকলে তার পুঁটলি থেকে বেরিয়ে আসত আশ্চর্য সব জিনিস। জাপানি পেন, তামার কচ্ছপ, বিরল পকেট ঘড়ি…আরও কত কি! একমাত্র ছোটোদের ডেকে ডেকে দেখাতো সেসব, আর কারো দেখার অনুমতি ছিল না। পদ্মদিদার পুঁটলি হয়ে উঠেছিল আমাদের কল্পজগতের আঁতুড়ঘর— শৈশবের রোমাঞ্চকর মিউজিয়াম।
এ জীবনে আবিষ্কারের এইরকম বিশেষ রোমাঞ্চ আমি অনুভব করেছিলাম আরও একবার। কলকাতার ট্যামার লেনে। আমার খুব কাছের, ভালোবাসার একটা রাস্তা। কারণ এই রাস্তাই আমায় খোঁজ দিয়েছিল আমার একান্ত মহাপৃথিবীর। শুধু আমার কথা বলছি না, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত যেকোনও মানুষের কাছেই ‘লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণা কেন্দ্র’ (Little Magazine Library and Research Centre) এক আশ্চর্য মহাপৃথিবী। আর সেই মহাপৃথিবীর বিশ্বকর্মা ছিলেন সন্দীপদা, সন্দীপ দত্ত (Sandip Dutta)। ১৯৭২ সালে ন্যাশনাল লাইব্রেরি থেকে গুচ্ছ গুচ্ছ লিটল ম্যাগাজিন ‘বাতিল’ করে দেওয়ার ঘটনাই তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল। সেই ভাবনাই জন্ম দিয়েছিল এক চলমান আন্দোলনের—গড়ে ওঠে কলকাতার লিটল ম্যাগাজিন সংগ্রহশালা। গতকাল থেকে তিনি আর নেই, কিন্তু সন্দীপদা এমন এক অস্বিত্ব যা কখোনো ‘নেই’ হয়ে যাওয়ার নয়। তিনি এমন কিছু রোপণ করে দিয়ে গেছেন, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম শাখাপ্রশাখা বিস্তার করবে, যা উপড়ে ফেলা যাবে না।

ছবি- সন্দীপ কুমার

তাবড় তাবড় লেখক, গবেষকরা ছুটে যান সন্দীপ দত্তের এনসাইক্লোপিডিয়ার কাছে। যেকোনও বইমেলাতেই তাঁকে দেখা যেত ‘লিটল ম্যাগাজিন’-এর চারপাশে ঘুরছেন তিনি, পুরোনো-পরিচিত কাগজ সংগ্রহের পাশাপাশি খুঁজে নিচ্ছেন একেবারে আনকোরা, নতুন শব্দ-নতুন কাজ।
২০১৫ সাল। আমি তখন সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিষয়ে পড়াশোনা করেছি। স্নাতক তৃতীয় বর্ষের চতুর্থ পত্রে আমার গবেষণাপত্রের বিষয় ছিল ‘লিটল ম্যাগাজিন’। লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাস, ব্যাপকতা বা গুরুত্ব পুরোপুরি না জেনেই অন্ধকারে ঝাঁপ দেওয়া যাকে বলে আর কি! সেই অন্ধকার থেকে আমায় টেনে তুলেছিলেন সন্দীপদা। এক বন্ধু তাঁর সন্ধান দিয়েছিল। তাঁর ডেরায় গিয়ে আবিষ্কার করলাম, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার একেবারে শুরুর দিকের আসল সংকলন থেকে শুরু করে দেশলাই বাক্স আদলের লিটল ম্যাগাজিন, কী নেই তাঁর সংগ্রহে। এখনও পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশিত যাবতীয় লিটল ম্যাগাজিনের সংগ্রহ রয়েছে তাঁর পাঠাগারে। তাবড় তাবড় লেখক, গবেষকরা ছুটে যান সন্দীপ দত্তের এনসাইক্লোপিডিয়ার কাছে। যেকোনও বইমেলাতেই তাঁকে দেখা যেত ‘লিটল ম্যাগাজিন’-এর চারপাশে ঘুরছেন সন্দীপদা, পুরোনো-পরিচিত কাগজ সংগ্রহের পাশাপাশি খুঁজে নিচ্ছেন একেবারে আনকোরা, নতুন শব্দ-নতুন কাজ।
লাইব্রেরিটি শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালের ২৩ জুন। এই শুরুর নেপথ্যে ছিল বিশেষ কিছু ঘটনা। ১৯৭২ সালে একদিন ন্যাশানাল লাইব্রেরিতে গিয়ে তিনি দেখেন বহু পুরোনো লিটল ম্যাগাজিন জোড়ো করা রয়েছে। দেখে উৎসাহিত হয়ে কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করলে তাঁরা জানান, যে সেগুলো রাখা হবে না। তারপর, ১৯৭২-এ পার্ট টু পরীক্ষা দেওয়ার পর বাড়িতেই ৬৫০টি পত্রিকা নিয়ে একটি প্রদর্শনী করেন। সন্দীপদা নিজেই একটি কাগজ শুরু করেছিলেন ১৯৭০ সালে। সন্দীপদা বলেছিলেন, “সব লিটল ম্যাগাজিন সেই সময় আমি কিনতে পারতাম না। সেই সময় মানে, স্টুডেন্ট লাইফে পয়সা বাঁচিয়ে যতটুকু পারতাম, কিনতাম। এইভাবে কিনতে কিনতেই একটা ভালোবাসা জন্মে যায়। ন্যাশনাল লাইব্রেরির ঐ ঘটনাটা আমায় আরও এগিয়ে দেয়। ভাবলাম যে ন্যাশনাল লাইব্রেরির যদি এমন অবস্থা হয়, তার একটা কাউন্টার এসট্যাব্লিশম্যান্ট (Counter Establishment) আমি ছো্টো করে আমার বাড়িতেই করতে পারি! প্রদর্শনী করতে গিয়ে আমার কাছে কিছু পত্রিকা জমেছিল, এইভাবেই শুরু বলা যায়। এইসব চিন্তারই ফসল এই লাইব্রেরি।”

লিটিল ম্যাগাজিনের একাল-সেকাল বিষয়ে কী ভাবেন? সন্দীপদাকে একথা জিজ্ঞেস করায় বলেছিলেন, “বাংলা সাময়িক পত্রের শুরুটা যদি আমি ১৮১৮ সাল ধরি, তাহলে বলব পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লিটল ম্যাগাজিন বাংলা ভাষাতেই বেরোয়। এই ১৮১৮ থেকে আজ পর্যন্ত এত বছরের ইতিহাসটা একটা লং জার্নি। ১৯ শতক ছিল নির্মানের যুগ। সেখানে ‘সবুজপত্র’ ছিল, ‘বঙ্গদর্শন’ ছিল, ‘তত্ত্ববোধিনী’ ছিল, সাহিত্যের একটা নতুন ধারার উপস্থিতি দেখা গেছিল। ৪০’এ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সারা বিশ্ব তথা বাংলায়ও বামপন্থি প্রভাব পড়েছিল, সেখান থেকে সে সময়ে ‘দ্বন্দ্ব’, ‘কাক’, ‘স্ফুলিঙ্গ’, ‘অগ্রনী’ ইত্যাদি বেরোল। ৬০’এ কমিউনিষ্ট পার্টিকে কেন্দ্র করে বহু কাগজ বেরিয়েছিল। তার মধ্যেই হাংরি জেনারেশন চলে আসে, সেটাই ছিল প্রতিষ্ঠান বিরোধী প্রথম আন্দোলন। ঐ আন্দোলন কে কেন্দ্র করে কতকগুলো পত্রিকা বেরোল। ৮০’এ আমরা দেখলাম বিশেষ সংখ্যা বেড়ে গেল অর্থাৎ আগে এত বহুমুখীনতা ছিল না, যেমন- উত্তর আধুনিকতা, মানুষের দ্বিচারিতা-হিংসা, শ্মশান, হাট-জনপদ, ঘুড়ি, মানুষের চুল, নানান বিষয় বৈচিত্র দেখা গেল। সেকাল-একাল এইভাবেই। সেকালের লিটল ম্যাগাজিনকে আমরা এককথায় বলতে পারি সাহিত্যকেন্দ্রিকতা, এখনও সাহিত্যকেন্দ্রিকতা, তবে আগের থেকে বিষয়-বৈচিত্র্য অনেক বেড়েছে।”
সারা পৃথিবী জুড়েই লিটল ম্যাগাজিন বেরিয়ে থাকে। একেক জায়গায় একেক রকম। ফরাসী লিটল ম্যাগাজিন, আমেরিকার লিটল ম্যাগাজিন… বাংলা লিটল ম্যাগাজিন কিন্তু বিশ্বমননের জায়গাটা করে নিয়েছে। এখানে বিদেশি লেখালিখির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া, সংখ্যা করা ইত্যাদির মধ্য দিয়ে বাংলা লিটল ম্যাগাজিন অহরহ পরীক্ষামূলক কাজ করে চলেছে। শুধুমাত্র সাহিত্য কেন্দ্রিকতা নয়, এত বহুমুখী বিষয়ে কাজ অন্য কোনো দেশে হয় বলে জানা নেই, সহাস্য মুখে বলতেন সন্দীপদা।
আরও পড়ুন: লিটল ম্যাগাজিনের জন্যই বেঁচে থাকা যাঁদের

২০১৫ সালে সন্দীপদার ডেরায় আমি

দেশলাই বাক্স লিটল ম্যাগাজিন দেখাচ্ছেন সন্দীপদা
১৫ মার্চ ২০২৩, গতকাল সন্দীপদা প্রয়াত হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে দেখলাম এক লেখক তাঁর স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, “জেল্লা ছিল তাঁর, আর লাইব্রেরির ভেতরে ছিল জেলা। জেলা মানে এক-একটা তাক। এক-এক দিকে। লাইব্রেরি ঢুকে বলতাম, ‘আজ নদীয়া যাচ্ছি, ফিরতে সময় লাগবে।’ সন্দীপদা হাসতেন। ‘সাবধানে যেও, সময় থাকলে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ঘুরে এসো!’ আমি ঘুরতাম। শেষদিন গেছিলাম জলপাইগুড়ি। বেরিয়ে এসে বললাম, ‘জলপাইগুড়িতে এত ধুলো আর গরম, মানুষ মারা যাবে তো!’ সন্দীপদার সেই হাসি। ‘তাহলে কিছুক্ষণ তুমি দীঘা থেকে ঘুরে এসো বরং… তারপর বিস্কুট খাবে!’ ‘দীঘাটা আবার কোথায়?’ ‘কেন? সিঁড়ির পাশ দিয়ে গেলেই তো সামনে!’ একটা হলুদ দরজা। জুতো খুলে ঢোকার নিয়ম। ছোট্ট বাথরুম। অফুরন্ত জল…”

ছবি- সন্দীপ কুমার
হ্যাঁ, সন্দীপদা মানুষটা এরকমই ছিলেন। বিগত ৫/৬ বছর তো হবেই, আর ট্যামার লেনে যাওয়া হয়নি আমার। কিন্তু, বছরের পর বছর নড়বড়ে শারীরিক অবস্থা নিয়ে সন্দীপদা ‘লিটল ম্যাগাজিন’ সচেতনতামূলক টুপি পরে, টি-শার্ট পরে মাঠে-ময়দানে, সভা-সমিতি-মেলায়, দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাঁর মতো করে আর তো কেউ বলেননি- লিটল ম্যাগাজিন ভাবুন, কিনুন, পড়ুন। লিটল ম্যাগাজিনকে গুরুত্ব দিতে হবে, বুঝতে হবে ‘লিটল’ হলেও সে ভাবনায় বড়ো – এই প্রতিস্পর্ধা, এই আওয়াজ যিনি তুলেছিলেন, সেই সন্দীপদাকে কুর্ণিশ জানানো যায়, বিদায় নয়।