আমাকে ঘুম পাড়িয়ে কইলকাত্তায় উধাও হয়ে গেল সেজদি

পুতুলের বিয়ে। বরপুতুল আর কনেপুতুলের ফুলশয্যা। ওসব নাকি ‘পোলাপাইনদের দ্যাখতে নাই’…

হঠাৎ-ই একদিন রাম ব্যানার্জী লেনের বাসায় সেজদিকে দেখতে পেয়ে আমি ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম- ‘তুমি আমারে ফালাইয়্যা পলাইয়্যা গেছিলা ক্যান সেজদি!’

পরম আদরে সেজদি আমাকে কোলে তুলে নিল। ছোটদি তা দেখে হাততালি দিয়ে হাসতে হাসতে বলতে থাকলো- ‘গাবুর পোলা কোলে উঠছে, কোলে উঠছে!’ আমি কিন্তু তখনও সেজদির কোলে আদুরে কান্না কেঁদেই চলেছি।

আমরা ছিলাম চার বোন, দুই ভাই। দাদা সবচেয়ে বড়, তারপর চার দিদি। সবার ছোট আমি। দাদার সঙ্গে আমার বয়সের ফারাক পঁচিশ বছর। বড়দির বিয়ে হয়েছে আমাদের গ্রাম থেকে বারো-চৌদ্দ মাইল দূরের এক গ্রামে। নাম- সারপার। বড় জামাইবাবু ইস্কুল মাস্টার। অনেকগুলো ছেলেমেয়ে। বর্ষাকালে বড়দি জামাইবাবু ছেলেপুলে নিয়ে নৌকো চড়ে আমাদের বাড়িতে আসতেন ধান ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে। নৌকো ভর্তি নারকেল, চাল ডাল কত কী! বড়দিরা এলে আমাদের বাড়িতে যেন উৎসব লেগে যেত!

মেজদিকে আমি দেখিনি আমার ছেলেবেলায়। আমার জন্মের আগেই তার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। কলকাতার কাছাকাছি কোথাও থাকত। তখন ঐ মেজদির এক ছেলে, আমার সমবয়সী। সবই শোনা কথা। মেজদি নাকি আমাদের বোনেদের মধ্যে সবচেয়ে কালো ছিল। তাই বাবা-মা মেজদিকে ‘কালী’ নামে ডাকত।

বড়দি কিন্তু আমার মায়ের নিজের মেয়ে ছিল না। আর, সেটা আমি জেনেছি বড় হবার অনেক পরে। বড় জামাইবাবুর মৃত্যুর পর, তাঁর একটা ছেঁড়া ডায়েরির পাতা উল্টে। বড়দি আমার এক জ্যাঠার মেয়ে। বড়দি যখন এক্কেবারে কোলের, সে’সময় নাকি দেশে ভয়ঙ্কর কলেরার প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। আর সেই কলেরার আক্রমণে একই রাতে আমার ওই জ্যাঠা জেঠি দুজনেই মারা যান। তাঁদের কোলের বাচ্চাটিকে মা কোলে তুলে নেন। এ ঘটনা দাদা ছাড়া আমাদের সবারই জন্মের আগে। তাই, আমাদের সবার বড়দি হয়ে উঠতে এবং আজীবন বড়দির ভূমিকা পালন করতে বড়দির কোনো অসুবিধা হয়নি।

অনেক বড়ো হয়ে আমি যেদিন বড়দি কী করে আমাদের ‘বড়দি’ হয়ে উঠেছে জানতে পারি, সেদিন থেকে বড়দির উপর আমার মায়া বেড়ে যায় ভীষণ রকম। বড়দি যতদিন বেঁচে ছিলেন, তাই ভাইফোঁটার দিন, যখনই সুযোগ হয়েছে, আর কোনও দিদির কাছে না হোক, বড়দির কাছে ফোঁটা নিতে গিয়েছি। বিয়ের পর বউকেও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছি প্রতি বছর। বড়দির হাতের, শেষদিকে ভাগ্নিদের হাতে ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে কচুর শাক ছিল ভাইফোঁটায় আমাদের ‘এক্সট্রা’ প্রাপ্তি!

এবার আসি সেজদির কথায়। সেজদি ছিল আমাদের বোনেদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরী। খুব ফর্সা ছিল গায়ের রং। আমি ছিলাম সেজদির কোল-নেওটা। এহেন সেজদির আমাকে ফেলে হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়াটা সেই সময় আমার মনে খুব দাগা দিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে আমি কেমন ভুলেই গিয়েছিলাম সেজদিকে। তবে, ‘উধাও’ হয়ে যাওয়ার আগে সেজদি একদিন একটা কঞ্চি দিয়ে ভীষণ মেরেছিল আমায়। আমার চুল ধরে টানতে টানতে আমাদের উঠোনের উত্তরদিকের আমগাছটার নীচ থেকে ঘরে নিয়ে গিয়েছিল।

সে এক মজার গল্প। আমার জীবনের প্রথম ‘অসভ্য’ ও ‘বেয়াদপ’ আচরণের গল্প। দু’তিন দিন আগে কলকাতা থেকে দাদা দেশের বাড়িতে এসেছে। সেজদিকে নিয়ে কী সব কথাবার্তা হচ্ছে ফিসফিস গুজগুজ করে। ‘বিয়ে’, ‘বিয়ে’ শব্দটা মুখে মুখে ঘুরছে। সেজদির মুখখানাও কখনও আনন্দে উজ্জ্বল, কখনও গম্ভীর।

ছোটদি আমাকে একসময় কানে কানে বলল, ‘ভাই, সেজদিকে কইলকাত্তায় নিয়া যাইব দাদা। হেইখানে সেজদির নাকি বিয়্যা হইব।’

‘হ! আমি সেজদিরে লইয়্যা যাইতে দিলা ত’। ছোটদির গোপন কথাটি এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়েছিলাম সেদিন।

‘দেখুম, তুই কী করতে পারস’– ছোটদি চোখ উল্টে বলে। আমি ছোটদির কথায় কান না দিয়ে খেলতে চলে যাই।

তবে, বাড়িতে যে একটা গোছগাছ চলছে সেটা বুঝতে পারতাম। আমি তাকে পাত্তা দিতাম না অবশ্য।

সেদিন আমাদের উঠোনে আমার জেঠতুতো খুড়তুতো ভাইবোনেদের খুব উল্লাস। আমার এক খুড়তুতো ভাইয়ের মেয়ে শান্তার ‘ছেলে পুতুলের’ সঙ্গে জেঠতুতো ভাইয়ের মেয়ে কাননের ‘মেয়ে পুতুলের’ বিয়ে। খেলনাবাটি নিয়ে খুব হৈ-হুল্লোড় চলছে। আমাদের ছেলেদের ওপর বাজারহাটের ভার। ছোটদিরা বর-কনে সাজানোয় ভীষণ ব্যস্ত। একদল ব্যস্ত রান্না-বান্নায়। লুচিপাতাকে লুচি হিসেবে পরিবেশন করা হবে। কাদাগোলা পায়েস তৈরি হচ্ছে একদিকে। ছেঁড়া কাপড় দিয়ে মাটির পুতুল বর-কনেকে সাজানো হয়েছে সুন্দর করে। একসময় বিয়ের আয়োজন সম্পূর্ণ হল। শাঁখ বাজানো হল বাঁশের চোঙে ফুঁ দিয়ে। উলু দিল কয়েকজন। এরপর, উঠোনের একদিকে লুচি-পায়েস খেতে বসে গেল কয়েকজন।

বিয়ে তো সাঙ্গ হল। এবার ফুলশয্যার আয়োজন। একটা কাঠের টুকরোকে খাট বানানো হয়েছে। তার ওপরে রঙিন টুকরো কাপড় বিছিয়ে বিছানা পেতে সিঁদুর-পরা বউ পুতুলকে চিৎ করে শুইয়ে দেওয়া হল হৈ হৈ করতে করতে। তারপর, বরকে বউয়ের ওপর উপুড় করে শুইয়ে দিয়ে বড়ো মেয়েদের কী হাসাহাসি! আমি কী হচ্ছে তা উঁকি মেরে দেখতে গেলে আমাকে একজন ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলল—‘এইসব পোলা-পাইনদের দ্যাখতে নাই! যা, বাইর!’

আমি ওদের কাছ থেকে সরে আসি। আমার পেচ্ছাপও পেয়েছিল। এমন সময়ে শেফালি আমাকে জিজ্ঞাসা করে- ‘কই যাস?’ শেফালি আমারই জেঠতুতো বা খুড়তুতো বোন। আমারই সমবয়সী খেলার সঙ্গীদের একজন।

আমি ওকে বলি- ‘মুত পাইছে! একটু মুইত্যা আসি।’ শেফালি বলে, ‘খড়ে’ অ, আমিও যাউম!’

আমি আমগাছটার গোড়ায় দাঁড়িয়ে পেচ্ছাপ করতে থাকি। শেফালিও পাশেই বসে পড়ে বেগ সামাল দেয়।

আমার হঠাৎ কেমন দুষ্টুবুদ্ধি জাগে। আমি শেফালির দিকে ঘুরে ওর দিকেই পেচ্ছাপ করতে থাকি। শেফালি বিপুল চিৎকার জুড়ে দেয়। আমিও হাসতে হাসতে বলতে থাকি—‘পিচকিরি পিচকিরি!’

শেফালি রেগে বলে- ‘আমারও তোর মতন পিচকিরি থাকলে ত’রে একেবারে চান করাইয়্যা দিতাম!’ আমি পেচ্ছাপ শেষ করে বসে ওর দিকে উঁকি মেরে বলি- ‘তোরটা কেমন দেখি!’

হঠাৎই আমার পিঠে কে যেন একটা কঞ্চির ঘা বসিয়ে দেয়। আমি দাঁড়িয়ে উঠে মুখ ফিরিয়ে দেখি, আগুন চোখে আমার পিঠে কঞ্চির ঘা বসাচ্ছে শেফালির পিসি—অর্থাৎ, আমার সেজদি। কয়েক ঘা মেরে আমার চুল ধরে হিড় হিড় টেনে নিয়ে চলে আমাদের ঘরের দিকে। সেজদির মুখে তখন একটাই কথা—‘অসভ্য! বেয়াদপ! দাঁড়া তোরে আইজ মজা দেখাইয়ুম।’

পরের দিন বিকেলে ঘুম থকে উঠে আমি দেখি, আমাদের ঘর নিস্তব্ধ! দুপুরের ভাত খাওয়ার শেষে সেজদি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে পিঠে ছোটো ছোটো আদুরে থাপ্পর মেরে ঘুম পারিয়ে দিয়েছিল। এবং তারপরই দাদার সঙ্গে কইলকাত্তায় উধাও হয়ে গিয়েছিল। আমি নাকি দু’একদিন খুব কান্নাকাটি করেছিলাম। তারপর, সেজদিকে প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। সেই আমি এখন অনেক বড়ো হয়ে গেছি। একেবারে, যাকে বলে ‘গাবুর’। সেই ‘গাবুর’ আমি সেজদির কোলে উঠে হাপুস চোখে কাঁদছি! ছোটদি হাসছে!

সেজদি আমাকে কোলের থেকে নামিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দেয়। সেজদির পাশে ধুতি-সার্ট পরা মলিনমুখের একজন দাঁড়িয়েছিলেন। সেজদি বলে- ‘তোর জামাইবাবু। নে নমঃ কর।’

আমি জামাইবাবুকে নমঃ করি। জামাইবাবু আমার হাত ধরে টেনে তুলে সেজদিকে জিজ্ঞেস করে—‘ এই বুঝি আমার ছোটো শালা!’

শুনে ভারি লজ্জা লাগে আমার!

Developed by DXDasia