
দেশীয় সার্কাসের ভবিষ্যৎ নিয়ে কী বলছেন উদ্যোক্তারা
‘পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলে, সার্কাস দেখাতে নিয়ে যাব।’ — তখন জমিয়ে ঠান্ডা পড়ত কলকাতায়। হাতে গোনা কিছু বিনোদনের মধ্যে অন্যতম ছিল বাংলা সার্কাস (Circus)। সেই সার্কাস দেখার উত্তেজনা ছিল অন্যরকম। সার্কাস দেখার জন্য গুরুজনেরা বলতেন, পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেলে সার্কাস দেখাতে নিয়ে যাবেন। যেতেনও। আমরাও শুধুমাত্র সার্কাস দেখার জন্য পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার চেষ্টা করতাম। কারণ সার্কাসের বিনোদন আমাদের কাছে ছিল অফুরন্ত খুশির হাওয়া। ছোটোবেলায় সার্কাস শব্দটা শুনলেই মনের মধ্যে প্রথম ভেসে উঠত ‘মেরা নাম জোকার’ সিনেমার দৃশ্য। তারপর বিভিন্ন জন্তু। হাতি, বাঘ, পাখি, কুকুর, ঘোড়া, সিংহ এবং আরও কত কিছুর সম্ভার ছিল সার্কাস। সেই সঙ্গে জোকারদের প্রাণভরা হাস্যরস আমাদের জীবনের সব দুঃখকে ভুলিয়ে দিতে পারত। বড়ো হয়ে বুঝেছি, সার্কাসের মতো এমন পারফরমিং আর্ট আর পাঁচটা নেই। হতে পারে না। সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলো যে কত বড়ো মাপের শিল্পী, সেটা এখন বুঝি। কিন্তু এই সার্কাস খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে ধুঁকছে। তবুও আশার আলোর খোঁজে তারা, নতুন দিনের স্বপ্ন দেখছে।

একসময় গ্রাম ও মফস্সলের মানুষের কাছে সার্কাস ছিল সবচেয়ে বড়ো ভ্রাম্যমাণ বিনোদন, যা আজ প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন ও সামাজিক পরিবর্তনের চাপে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
বর্তমান সময়ে আমাদের কাছে বিনোদনের অভাব নেই। এক ক্লিকেই কত রংবেরঙের বিনোদন সামনে হাজির হয়ে যায়। অপছন্দ হলে চট করে সরিয়েও দিতে পারি। শুধুমাত্র একটা ক্লিকেই। এখন জীবন এতটাই সহজ, বিনোদনও। দীর্ঘ সময়ের কোনও কিছুই এখন আর আমাদের পছন্দ নয়। উপন্যাস থেকে সিনেমা, এখন খুব দ্রুত গতির জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে গিয়েছে। ওয়েব সিরিজও গতিময় হয়েছে। সেখানে মান্ধাতার আমলের সার্কাস? নবপ্রজন্ম সার্কাসের অনেক কিছুই জানে না। জানতেও চায় না। তবুও একটা শ্রেণির বাঙালি এখনও শীত এলেই সার্কাস খোঁজে। তবে আগের মতো উৎসাহ নেই। একথা স্বয়ং স্বীকার করেছেন অজন্তা সার্কাসের কর্ণধার রবিউল হক। বঙ্গদর্শন.কম-কে তিনি জানিয়েছেন, “সার্কাসের অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। আগের মতো সেই উৎসাহ নেই। কিন্তু আমরা তো এখনও সার্কাস করেই খাচ্ছি।” শুধু তাই নয়, তাঁর কথায়, “আমরা সারাবছরই সার্কাস করি। শুধু শীত বলে নয়, উৎসবের ভিত্তিতেও আমাদের ডাক আসে। রথে উড়িষ্যা, ছটে বিহার, গণপতির সময় মহারাষ্ট্রে, শীতে কলকাতায়, এই করে সারাবছর আমাদের কেটে যায়।”
এখন পশুপাখি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ সার্কাসে। শুধু তাই নয়, অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের নিয়ে খেলা দেখানো যায় না। তাঁদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগও নেই। তাই বিদেশ থেকে শিল্পী ভাড়া করে নিয়ে আসতে হয়। এমনিতেই সার্কাসের ভাঁড়ারে টান, সেই সঙ্গে বিদেশি শিল্পী আনতে গেলে অনেকটা খরচ করতে হয় সার্কাস কোম্পানিকে। অজন্তা সার্কাসের কর্ণধারের কথায়, “এখন সার্কাসকে সময়োপযোগী করতে বিদেশি আর্টিস্ট ডেকে আনতে হয়। কারণ ভারতে নতুন শিল্পী আর তৈরি হচ্ছে না। আইনি ভাবে সেই রাস্তা বন্ধ। সার্কাস তো পার্ট অফ স্পোর্টস। কিন্তু ভারতে সার্কাসের ভালো আর্টিস্টের প্রশিক্ষণ নেই। আপনি তো আর বয়স্কদের প্রশিক্ষণ দিতে পারবেন না।” একটু থেমে তিনি আরও যোগ করেন, “বাইরের দেশে সার্কাসের স্কুল আছে। এদেশে নেই। রাশিয়া, ইথিওপিয়া, মঙ্গোলিয়া, উজবেকিস্তান থেকে শিল্পীরা আমাদের সার্কাসে এসে খেলা দেখিয়ে চলে যায়। ওইসব দেশে প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সার্কাসও শেখানো হয়। কিন্তু এখানে হয় না। আমাদের সার্কাসে যাঁরা এখন খেলা দেখাতে এসেছেন তাঁরা ওই দেশের সার্কাস স্কুল থেকেই এসেছে। আবার ফিরেও যাবে।” কিন্তু সার্কাসের ভবিষ্যৎ কী? একটা সময় সার্কাস কি সত্যিই বিলুপ্তির পথে? কিছুটা আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি জানালেন, “হয়তো সার্কাস একটা সময় হারিয়ে যাবে। নতুন শিল্পী তৈরি না হলে কী করে চলবে সার্কাস?”

আধুনিক সার্কাসের সূচনা ইউরোপে। ১৭৬৮ সালে ইংল্যান্ডের প্রাক্তন অশ্বারোহী ফিলিপ অ্যাস্টলি প্রথম বৃত্তাকার মঞ্চে ঘোড়সওয়ারি, অ্যাক্রোবেটিক ও জাগলিং প্রদর্শনীকে একত্র করে সার্কাসের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। পরবর্তী সময়ে ক্লাউন, দড়ির খেলা, মানবদেহের ঝুঁকিপূর্ণ খেলা এবং পশু-প্রদর্শনী যুক্ত হয়ে সার্কাস একটি পূর্ণাঙ্গ বিনোদনে পরিণত হয়। ঊনবিংশ শতকে ঔপনিবেশিক যোগাযোগের মাধ্যমে সার্কাস ভারতে আসে। বিশ শতকের শুরুতে কেরল, বাংলা ও মহারাষ্ট্রে দেশীয় সার্কাসের বিকাশ ঘটে। কেরল গড়ে ওঠে সার্কাসশিল্পীদের প্রধান প্রশিক্ষণকেন্দ্র হিসেবে। একসময় গ্রাম ও মফস্সলের মানুষের কাছে সার্কাস ছিল সবচেয়ে বড়ো ভ্রাম্যমাণ বিনোদন, যা আজ প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদন ও সামাজিক পরিবর্তনের চাপে ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপীয় ও বিদেশি সার্কাস দল বন্দরনগরী ও ক্যান্টনমেন্ট শহরগুলিতে প্রদর্শনী শুরু করে। ব্রিটিশ সেনানিবাস, বাণিজ্যকেন্দ্র ও মেলার সূত্রে এই বিনোদন ধীরে ধীরে দেশীয় দর্শকের কাছে পরিচিত হয়। পরে ভারতীয় উদ্যোক্তারা নিজস্ব সার্কাস গড়ে তোলেন। বিশ শতকের শুরুতে কেরল, মহারাষ্ট্র ও তামিলনাডুতে সংগঠিত প্রশিক্ষণব্যবস্থা তৈরি হয় এবং ভারতীয় অ্যাক্রোবেট, জাগলার ও দড়ির খেলোয়াড়েরা সার্কাসের মূল ভরকেন্দ্রে পরিণত হন।
কলকাতা ও বাংলায় সার্কাস জনপ্রিয় হয় মূলত নগর-সংস্কৃতি ও উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে। ঔপনিবেশিক কলকাতা ছিল ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। থিয়েটার, যাত্রা ও মেলার পাশাপাশি সার্কাসও দ্রুত দর্শক পায়। ময়দান, শ্যামবাজার, শিয়ালদহ সংলগ্ন খোলা মাঠে তাঁবু খাটিয়ে নিয়মিত সার্কাস হত, যা মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী, দু’পক্ষের কাছেই আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। দুর্গাপুজো, বড়োদিন বা শীতের মেলায় সার্কাস ছিল পারিবারিক বিনোদনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলার শিল্পীরা কসরত, দড়ির খেলা ও ক্লাউনিংয়ে দক্ষ হয়ে উঠলে স্থানীয় সার্কাস দল গড়ে ওঠে, আর কলকাতা হয়ে ওঠে পূর্ব ভারতের সার্কাস সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র। ভারতে একসময় সার্কাসকে ঘিরে উল্লেখযোগ্য অর্থনীতি ছিল। ১৯৯০-এর দশকে দেশে প্রায় ৩০০টির মতো সার্কাস সক্রিয় ছিল, যেখানে আনুমানিক ১০ হাজারের বেশি শিল্পী ও সহায়ক কর্মী কাজ করতেন। বিভিন্ন সমীক্ষা ও সংবাদসূত্র অনুযায়ী, ২০১০-এর পর থেকে সার্কাস শিল্পের আয় প্রায় ৪০% পর্যন্ত কমে গিয়েছে। বর্তমানে দেশে সক্রিয় সার্কাসের সংখ্যা নেমে এসেছে ৩০–৪০টির মধ্যে।

বিভিন্ন সমীক্ষা ও সংবাদসূত্র অনুযায়ী, ২০১০-এর পর থেকে সার্কাস শিল্পের আয় প্রায় ৪০% পর্যন্ত কমে গিয়েছে। বর্তমানে দেশে সক্রিয় সার্কাসের সংখ্যা নেমে এসেছে ৩০–৪০টির মধ্যে।
রোলেক্স সার্কাসের ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যুক্ত শুভদীপ দাশের কথায়, “আমরা এখনও সারাবছর সার্কাস করেই বেঁচে আছি। আমাদের দলে প্রায় ৮০-৯০ জন সদস্য আছে। আমরা এই দলটাই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে সার্কাস করি।” সার্কাসের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বঙ্গদর্শনকে জানান, “সার্কাসকে টিকিয়ে রাখতে গেলে যা যা করণীয়, আমরা সেই সব চেষ্টাই করি। এখন বিনোদনের প্রচুর মাধ্যম এলেও, সার্কাস এখনও হাউজফুল থাকে। আমরা বিভিন্নভাবে সার্কাসকেও আধুনিক করার চেষ্টা করেছি।”
প্রসঙ্গত, ভারত এবং পশ্চিমবঙ্গে সার্কাসের কোনও স্কুল নেই। প্রশিক্ষণেরও সুযোগ নেই। ফলে ভবিষ্যতে এই শিল্প কতটা থাকবে সেই নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। শুভদীপ দাশের কথায়, “আমাদের ট্রুপে বিদেশ থেকে অনেকে কাজ করতে আসেন। কেনিয়া, আফ্রিকা, মঙ্গোলিয়া থেকে। ওইদেশে প্রাথমিক শিক্ষার সঙ্গে সার্কাসের অনুশীলন করা যায়। এটাই নিয়ম। এদেশে সেই ব্যবস্থা নেই।” এককালে ছোটোরা সার্কাসে যেত শুধুমাত্র পশুপাখি দেখার জন্য। কিন্তু এখন সেসব বন্ধ। শুভদীপ বলেন, তাঁরা এখন আর্টটিফিশিয়াল জন্তু ব্যবহার করেন।

কিছুদিন আগে পর্যন্ত এদেশে দেশীয় সংস্কৃতিকে বাঁচানোর জন্য আন্দোলন শুরু হয়েছিল। বিদেশি হাটাও, দেশ বাঁচাও-এর জয়গান গাওয়া হয়েছিল। কিন্তু একবারও সার্কাস নিয়ে কেউ কিছু বলেননি। এইরকম একটা শিল্প ক্রমশ অবলুপ্তির পথে, তবুও সেই শিল্পকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হয়নি এবং হচ্ছেও না। এই শীত চলে গেলে কলকাতা থেকে ‘সার্কাস সার্কাস’ রব থিতিয়ে যাবে, কিন্তু সেই শিল্পের মূল্যবোধ, বিনোদন একটুও কমবে না। আজকে যদি নবপ্রজন্মকে সার্কাসের নিয়মিত প্রশিক্ষণ না দেওয়া হয়, তাহলে এই শিল্প আর বাঁচবে না। বাঁচতে পারে না। কী হবে সার্কাসের? কোথায় যাবে বাঙালির প্রিয় সার্কাস?
