রক্তকরবী : ১০০ বছর আগে রবীন্দ্রনাথের গড়া শ্রেণিসমন্বয় আর প্রেমের উপাখ্যান

শতবর্ষে রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী

তারুণ্যের তেজে বিশু নিজের পৌরুষ প্রকাশ করে নন্দিনীকে জয় করে নিতে চেয়েছিল। যেভাবে রঞ্জন তার বীরত্ব দিয়ে জিতে নিয়েছিল নন্দিনীর মন। কিন্তু বিশু স্বভাব-প্রেমিক, ভাববাদী। তাই বাহুবলে নারীকে জয় করার কৌম আচার ত্যাগ করে বাজি খেলার ভিড় ঠেলে সে বেরিয়ে আসে। পৌরুষ প্রমাণ করতে রঞ্জনের সঙ্গে ডুয়েল লড়তে যায়নি। চলে আসার আগে তার কাঙ্ক্ষিত নন্দিনীর দিকে এক দৃষ্টিক্ষেপে সে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিল— কোন দুঃখের ভার নিয়ে সে বেরিয়ে যাচ্ছে। নন্দিনী সেদিন বোঝেনি সেই চাহনির অর্থ— কারণ তখনও সে পুরুষের উদ্দামতা, বাহুবল, শৌর্যকেই চিনত, অব্যক্ত বেদনার চোখের ভাষা পড়তে পারত না। পুরুষের ছিনিয়ে নেওয়াই তার কাছে ছিল সহজবোধ্য, পুরুষের সমর্পণ নয়। তারপর বিশু এক নারীকে বিয়ে করে। একদিন পশ্চিমের জানালা দিয়ে যখন বিশু দেখছিল স্বর্ণাভ মেঘের চুড়ো, তার স্ত্রী দেখছিল যক্ষপুরীর প্রাসাদের সোনার চুড়ো। স্ত্রী চাইল সেই সোনার স্পর্শ পেতে। তার নিজ নারীকে পুরুষ যথেচ্ছভাবে দেওয়ার চেষ্টা করবে— গতানুগতিক এই ধারণায় লালিত আত্মভোলা বিশুও যক্ষপুরীতে প্রবেশ করে। প্রথমে রাজাকে তার জ্ঞাত যন্ত্রবিদ্যা শেখায়, তারপর শ্রমিকদের চর হিসেবে সর্দারদের দলে ভেড়ে। কিন্তু নিজের স্বভাবকে পীড়া দিয়ে তার স্ত্রীর উত্তরোত্তর বেড়ে চলা বাসনা নিবৃত্তির ইচ্ছের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিল না বিশু। চর হিসেবে মানুষকে জাঁতাকলে ফেলে পেষার কাজে দার্শনিক বিশু দক্ষ হতে পারছিল না কিছুতেই। ফলে স্ত্রী ত্যাগ করে বিশুকে। শ্রেণিচ্যুতি হয় তার, পরে সে নিতান্তই ৬৯ঙ— একজন শ্রমিক। শ্রমিক, যারা দিনে চোদ্দ ঘণ্টা গা-গতরে খাটে, তারপর আরো চার ঘণ্টা ওভারটাইম করে এবং নিজেদের জীবনের গ্লানি ভুলে থাকতে সন্ধে হলেই মদ খায়— যাদের সকাল আসলে ক্লান্ত রাত্তিরেরই উচ্ছিষ্ট। কিন্তু অন্যান্য শ্রমিকদের মতো বিশু অসচেতন নয়। নয় বলেই তার এই মানসিক মৃত্যুকে সে মদের আরকে ভুলে না থেকে উপলব্ধি করতে পেরেছে। এবং তাই শ্রমিকদের জাগানোর জন্য চন্দ্রা-ফাগুলালের কাছে গান গেয়েছে— “তোর প্রাণের রস তো শুকিয়ে গেলো ওরে/ এবার মরণ রসে নে পেয়ালা ভরে।” ঠিক এখানেই রবীন্দ্রনাথের বিশেষ একটা তত্ত্ব মুখ্য হয়ে উঠেছে। তাঁর কাছে মৃত্যু জীবনের শেষ নয়, তাকে সহজ পথে চালিত করার শক্তি। মৃত্যুর উপলব্ধি না হলে বৃহত্তর জীবনে দীক্ষিত হওয়া যায় না।

রবীন্দ্রনাথের দর্শনে লালিত চরিত্র তাঁর সাহিত্যে বহু— কিন্তু বিশুর মধ্যে এই সব কিছুর পূর্ণতা। বিশু সাহসী, প্রতিবাদী, বাহুবলেও সে কম নয়— এবং বিশু পাগল প্রেমিক। রবীন্দ্র সাহিত্যে এর আগেও বহু চরিত্রে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মুক্ত মানুষের দর্শনকে গেঁথে দিয়েছিলেন।

রক্তকরবী – বিশ্বভারতীর প্রচ্ছদ

এরপর যক্ষপুরীর অন্ধকার জীবনে— দেওয়াল ফাটিয়ে আলোর মতো প্রবেশ করেছিল নন্দিনী। নন্দিনী আসলে সহজ জীবনের ফূর্তি, সকালে ফুলের বাগানে ঘাসের উপরে এই আলো এলে কেউ অবাক হত না, কিন্তু অপ্রত্যাশিত আলো সকলের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়, যেমন অধ্যাপক বলেছে। তাই কৌম দৃষ্টিতে নন্দিনী গড়পড়তা হলেও যক্ষপুরীতে সে বিশেষ হয়ে উঠেছে সবার চোখে। তার মধ্যে সবাই আবিষ্কার করেছে সহজ জীবনের ছন্দকে, কেননা সহজতার দিকে গতিই মানুষের স্বাভাবিক গতি। একদিকে রাজা নন্দিনীকে হাতের মুঠোয় পেতে চেয়েছে, পেয়েওছে শেষ পর্যন্ত বিপ্লবের সঙ্গী হিসেবে। কিন্তু বিশু নন্দিনীকে নির্বিশেষে পেয়েছে। বিশুর কাছে সে ‘ঘুম-ভাঙানিয়া’ ও ‘দুখ-জাগানিয়া’। তার সহজ জীবনের মৃত্যুকে ভুলে থাকতে চাওয়ার ঘুমে ছিল বিশু। কিন্তু নন্দিনীর সঙ্গে ফিরে দেখায় তার ঘুমই শুধু ভাঙেনি, তার দুঃখও জেগেছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শান্তিনিকেতন’ প্রবন্ধমালায় ‘দুঃখ’ বিষয়ে বলেছেন— “দুঃখ এবং আঘাত ন্যায্য হোক বা অন্যায্য হোক, তার সংস্পর্শ থেকে নিজেকে নিঃশেষে বাঁচিয়ে চলবার অতিচেষ্টায় আমাদের মনুষ্যত্বকে দুর্বল ও ব্যাধিগ্রস্থ করে তোলে।” (২৬ অগ্রহায়ণ, ১৩১৫) দুঃখকে আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখলে জীবনে সত্যকে পাওয়া যায় না। ‘ধর্ম’ প্রবন্ধে বলেছিলেন, “দুঃখকে আমরা দুর্বলতাবশত খর্ব করিব না, অস্বীকার করিব না, দুঃখের দ্বারাই আনন্দকে আমরা বড়ো করিয়া এবং মঙ্গলকে আমরা সত্য করিয়া জানিব।” (দুঃখ, ধর্ম) দুঃখ বিবিক্ত আনন্দ, সত্য, মঙ্গল, কল্যাণ কিছুই থাকতে পারে না— এবং মানুষ জগতের মতোই অপূর্ণ, পূর্ণতার অভিলাষেই তার দুঃখবোধ জাগে। রবীন্দ্রমানসের এই দুঃখবাদে বিশু অভিষিক্ত বলেই সে বলতে পারে— “এমন দুঃখ আছে যাকে ভোলার মতো দুঃখ আর নেই।” কথাটা সে বলেছিল নন্দিনী সম্পর্কে। নন্দিনীকে না পাওয়ার দুঃখই তাকে নৈর্ব্যক্তিক আনন্দের সন্ধান দিয়েছিল। তাই সে জীবনের বিরাট ও মহৎ উদ্দেশ্যকে দেখতে পেয়েছিল।

শম্ভু মিত্র নির্দেশিত রক্তকরবীতে নন্দিনী চরিত্রে তৃপ্তি মিত্র

রক্তকরবী নাটক-এ সবচেয়ে গভীর কথা বিশুই বলেছে। কেননা তার জীবনের অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র বিস্তৃত। সমস্ত শ্রেণির মানুষের জীবনকে সে কাছ থেকে উপলব্ধি করেছে। যক্ষপুরীর প্রতিটি প্যাঁচ-পয়জার সম্পর্কে সে ওয়াকিবহাল। নন্দিনীকেও প্রতি মুহূর্তে নির্লিপ্তভাবে চিনিয়ে দিয়েছে যক্ষপুরীর স্বরূপ। এমনকি রাজাকে নন্দিনী যে গান শোনায় (“আকাশে কার বুকের মাঝে ব্যথা বাজে”)— তা বিশুরই শেখানো গান। 

রবীন্দ্রনাথের দর্শনে লালিত চরিত্র তাঁর সাহিত্যে বহু— কিন্তু বিশুর মধ্যে এই সব কিছুর পূর্ণতা। বিশু সাহসী, প্রতিবাদী, বাহুবলেও সে কম নয়— এবং বিশু পাগল প্রেমিক। রবীন্দ্র সাহিত্যে এর আগেও বহু চরিত্রে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মুক্ত মানুষের দর্শনকে গেঁথে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই মুক্তি বা স্থৈর্য্য লাভের জন্য সে মানস-দ্বন্দ্বে বিক্ষুব্ধ মানব চরিত্র তা বিশুর মধ্যে এসে সজীব এবং পূর্ণ রূপ পেয়েছে। এই নাটকেও বিশু সবচেয়ে অভিজ্ঞ। তার বিচিত্র জীবন অভিজ্ঞতার স্তরকে অতিক্রম করেই সে তার আত্মউপলব্ধির শিখর ছুঁয়েছে।

প্রথম খসড়ায় চরিত্রের নাম, নাটকের নাম এমনকি দৃশ্যসজ্জাও ছিল না, পরে পরে সে সব যুক্ত হয়েছে। এবং খঞ্জনী, সুনন্দা, নন্দা থেকে নন্দিনী – বারবার নন্দিনীর নাম বদলে দিয়েছেন, নাটকের নামেও ‘যক্ষপুরী’, ‘নন্দিনী’ থেকে ‘রক্তকরবী’-তে স্থির হয়েছিলেন তাঁর অষ্টম খসড়ায় এসে।

রক্তকরবী নাটকটির নির্দিষ্ট সূচনা বা সমাপ্তি নেই, নাটকের সে অর্থে কোনো কেন্দ্রীয় চরিত্রও নেই। ওপেন এন্ডেড এই নাটকটি ক্যানভাসে আঁকা ডিটেইলে ভরপুর ওয়েস্টার্ন ক্ল্যাসিকাল ছবির মতো (তাই এই নাটককে রবীন্দ্রনাথ ‘পালা’ বলেছেন)। তবু বিশু রবীন্দ্র মানসের অনেক কাছাকাছি চরিত্র বলেই এই নাটকে সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের মর্যাদা পাওয়ার দাবিদার। নন্দিনী কিছু না জেনে তার ইনোসেন্স থেকে প্রশ্ন ছুড়েছে, কিন্তু বিশু সব জেনেই মুখোশ উন্মুক্ত করতে প্রতিবাদ করেছে।

রক্তকরবীর শেষ দৃশ্যের পাণ্ডুলিপি, রচনাকাল: ১৩৩০ (১৯২৩) থেকে ১৩৩১ (১৯২৪)

এই নাটকের মোট দশটি খসড়া লেখার পরে আজকের রক্তকরবী-কে পাওয়া গেছে (প্রায় দেড় বছর ধরে)। প্রথম খসড়া লিখেছিলেন শিলঙের জিৎভূমে বসে, ১৯২৩ সালের মে মাসে। প্রথম খসড়ায় চরিত্রের নাম, নাটকের নাম এমনকি দৃশ্যসজ্জাও ছিল না, পরে পরে সে সব যুক্ত হয়েছে। এবং খঞ্জনী, সুনন্দা, নন্দা থেকে নন্দিনী – বারবার নন্দিনীর নাম বদলে দিয়েছেন, নাটকের নামেও ‘যক্ষপুরী’, ‘নন্দিনী’ থেকে ‘রক্তকরবী’-তে স্থির হয়েছিলেন তাঁর অষ্টম খসড়ায় এসে। এই খসড়াতেই তাঁর নাটকটি অনেকখানি আজকের রূপ পায়, শুধু কিশোর চরিত্রটি দশম খসড়ায় যুক্ত হয়। এই ধারায় বিশু কিন্তু প্রথম থেকেই নাটকে আছে— যদিও প্রথম খসড়ায় সে কেবল একজন মাতাল ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু বিভিন্ন খসড়ায় বিশু চরিত্রের বিবর্তনের ধারাপথটিকে বুঝলে আজকের বিশুর স্তরগুলোকে আলাদা করে চেনা যাবে। এখানেই বলার যে, ঐ আপাত পূর্ণ অষ্টম খসড়াতে এসে এই নাটক বিশুকে দিয়েই শেষ করার কথা ভেবেছেন রবীন্দ্রনাথ। তবু এতগুলো খসড়া লিখেও তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না, তাই ১৩৩১ সালের আশ্বিন সংখ্যায় ‘রক্তকরবী’ প্রকাশিত হলে তিনি পত্রিকার একটি কপিতেও নানান শব্দ পরিবর্তন করেছিলেন। সব মিলিয়ে মোট ১২টি পাঠান্তর তৈরি হয় এর। এতবার বদলে গেছিল বলেই নাটকটি বহুস্তরীয়—পাললিক শিলার মতো স্তরে স্তরে সাজানো।

গৌতম হালদার নির্দেশিত রক্তকরবীতে নন্দিনী চরিত্রে চৈতি ঘোষাল

নাটকটি নিয়ে অমিয় চক্রবর্তী একটি চিঠিতে আপত্তি তুললে কবি লিখেছিলেন— “তুমি বলেচ যে এ নাটক বিশেষভাবে পশ্চিমের পক্ষে উপযোগী। …স্বরচিত যন্ত্রের হাতে মানুষ পীড়িত হচ্চে এই তথ্যটি ন্যূনাধিক সব দেশেরই— কিন্তু তথ্য পদার্থটিই তো সাহিত্য নয়। মানুষের বেদনা— তার কারণ যাই থাক— যখন সাহিত্যের আকার ধারণ করে তখন তার আর দেশভেদ থাকে না।” এখানে স্পষ্ট বোঝা গেল মানুষের বেদনার কথাই ‘কবি’ এখানে শোনাতে চেয়েছেন— যে বেদনাকে অতিক্রম করেই বিশু তার পূর্ণতার দিকে এগিয়ে মানুষের সার্বিক মঙ্গলের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছে। বাসনার ক্ষুদ্র গণ্ডী পেরিয়ে সে আকাঙ্ক্ষার দিকে এগোতে পেরেছিল বলেই নন্দিনীকে সে বস্তুগতভাবে চায়নি, বরং তাকে নিজের মানসে তরীর নেয়ে বানিয়েছে— চোখের জলের জোয়ার লাগলে যে চেনার কুল থেকে অচেনার কুলে নিয়ে যাওয়ার কাণ্ডারী হবে।

______ 
রক্তকরবী | স্থান : শিলং ও অন্যান্য স্থানে | কবির বয়স : ৬২-৬৩ | প্রথম প্রকাশ : ‘প্রবাসী’ ১৩৩১ (১৯২৪), গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশ ১৩৩৩ (১৯২৬)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী নাটকের শতবর্ষ উপলক্ষ্যে এই বিশেষ লেখা

Developed by DXDasia