
ভারতের সংবিধান দিবস
আজ ভারতের সংবিধান দিবস। ১৯৪৯ সালে আজকের তারিখে গণপরিষদে গৃহীত হয় ভারতের সংবিধান। যাকে বলা হয় স্বাধীন সার্বভৌম ভারতীয় গণতন্ত্রের আত্মা – আমাদের সর্বোচ্চ আইন। অনেক বরেণ্য মনীষীর অক্লান্ত পরিশ্রমে দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের সংবিধান রচিত হয়েছে। গণপরিষদে ভীমরাও আম্বেদকর, ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ, ডঃ সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণান, জওহরলাল নেহরুর মতো নেতাদের বর্ণময় ভূমিকা আলোচিত হয়ে থাকে বারবার। সেই তুলনায় মহিলাদের অবদান নিয়ে খুব বেশি চর্চা হয় না। অথচ বেশ কয়েকজন নারী ছিলেন গণপরিষদের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ‘ভারতের নাইটিঙ্গেল’ সরোজিনী নাইডুর কথাই ধরা যাক। স্বাধীন ভারতের জাতীয় পতাকার বিষয়ে তাঁর মতামত খুবই তাৎপর্যময়। মহিলাদের ভোটাধিকার তথা সর্বজনীন ভোটাধিকার স্বীকৃতির জন্য সক্রিয় ছিলেন গণপরিষদে। বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধ করা এবং নারীশিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে শানিত যুক্তি তুলে ধরেছিলেন।
বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী, কবি ও জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম ভারতীয় মহিলা সভাপতি সরোজিনী নাইডু-র জন্ম হয়েছিল হায়দ্রাবাদে এক বাঙালি পরিবারে। পৈত্রিক নিবাস পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্মণগাঁও। বাবা ডঃ অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায় ছিলেন শিক্ষাবিদ। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় সমগ্র মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন সরোজিনী। ইংল্যান্ডের কিংস কলেজ এবং গার্টন কলেজে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। বাংলা, ইংরেজি ছাড়াও উর্দু, তেলুগু ও ফার্সি ভাষায় দক্ষ ছিলেন। বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন গোবিন্দরাজুলু নাইডুর সঙ্গে।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে যোগ দেন সরোজিনী। সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ করলে ভারতের নানা জায়গায় সভা করে নারী এবং শ্রমিকের অধিকার, জাতীয়তাবাদ নিয়ে বক্তৃতা দিতে থাকেন। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯২০ সালে মহাত্মা গান্ধির ডাকে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে অংশগ্রহন করেন তাতে। কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হন ১৯২৫ সালে। কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে গান্ধিজির সঙ্গে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন।
গণপরিষদের বৈঠকে অস্থায়ী সভাপতি সচ্চিদানন্দ সিনহা একবার সরোজিনীকে আহ্বান করে বলেন, “‘বুলবুল-ই-হিন্দ’ ভারতের নাইটিঙ্গেলকে আমি অনুরোধ করছি সভায় বক্তব্য রাখার জন্য। গদ্যে নয়, কবিতায় শুনব তাঁর কথা।”
ভারত ছাড়ো আন্দোলনে তিনি প্রথম সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত থাকার জন্য একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে তাঁকে। মহাত্মাজির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল খুবই মধুর। গান্ধিকে ‘মিকি মাউস’ বলে ডাকতেন সরোজিনী। গান্ধিজি তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘বুলবুল’। ভারত স্বাধীন হওয়ার প্রাক্কালে সংবিধান রচনার জন্য বিভিন্ন প্রদেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয় গণপরিষদ। সরোজিনী নাইডু বিহার থেকে সংবিধান সভায় নির্বাচিত হন।
১৯৪৬ সালের ১১ ডিসেম্বর। গণপরিষদের বৈঠকে অস্থায়ী সভাপতি সচ্চিদানন্দ সিনহা একবার সরোজিনীকে আহ্বান করে বলেন, “‘বুলবুল-ই-হিন্দ’ ভারতের নাইটিঙ্গেলকে আমি অনুরোধ করছি সভায় বক্তব্য রাখার জন্য। গদ্যে নয়, কবিতায় শুনব তাঁর কথা।”
সরোজিনী হেসে বলেন, “সভাপতি মহোদয়ের এই ডাক সাংবিধানিক নয়”।
“আমার পদ এখানে উহ্য থাক”, হেসে জবাব দেন সভাপতি।
আরও পড়ুন: ইন্দিরা – শান্তিনিকেতনের আশ্রমবালিকা
সরোজিনী বলতে থাকেন, “এক কাশ্মীরি কবির লেখা কয়েকটা লাইন আমার মনে পড়ছে – ‘বুলবুল কো গুল মুবারক, / গুল কো চারমান মুবারক, / রঙ্গিন তাইবিয়াতোঁ কো রঙ্গ-এ-সুখান মুবারক’।” (বুলবুল সুখী থাকে ফুলের কাছে। ফুল সুখী থাকে বাগানে। রঙিন ব্যক্তিত্বের মানুষেরা কবিতায় আনন্দিত হন।)
সরোজিনী নাইডুর সুললিত কণ্ঠে কবিতা শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন সভার সদস্যরা।
ভারত স্বাধীন হওয়ার পর সরোজিনী নিযুক্ত হন সংযুক্ত প্রদেশের (এখন যার নাম উত্তরপ্রদেশ) রাজ্যপালের দায়িত্বে। ১৯৪৯ সালে হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত তিনি সেই পদেই আসীন ছিলেন।
______
তথ্যঋণ – ডঃ কার্তিকা নায়ার, একতা হানডা, স্বপনা রঘু সানন্দ।

