ছ’টি স্তর খোঁড়ার পর জল উঠে আসায় থামিয়ে দেয়া হয়েছে খননকার্য
রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘চন্দ্রকেতুগড়ে যে-সমস্ত অতিপ্রাচীন নিদর্শন আবিষ্কৃত হইয়াছে, তাহা দেখিয়া স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায় যে, স্থানটি ভারতবর্ষের অতি পুরাতন স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম।’ মনে পড়ে গঙ্গারিডি সভ্যতার প্রসঙ্গ। আলেকজান্ডারের সমসাময়িক গ্রিক লেখক পেরিপ্লাস আর টলেমি ভারতের পূর্বদিকে যে সভ্যতার কথা উল্লেখ করেছিলেন, যার রাজধানী ছিল ‘গঙ্গে’, তা কি এই চন্দ্রকেতুগড় বা তার সংলগ্ন এলাকাই? অনেক ঐতিহাসিক সমর্থন করেছেন এই ধারণার। গঙ্গারিডি সভ্যতার অবস্থান ও ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করা আমার লক্ষ্য নয়। তবে এ-প্রসঙ্গও এড়িয়ে যাওয়া অনুচিত, কাছেই যে অঞ্চল দেগঙ্গা, তার নামকরণের উৎস খুঁজতে গিয়ে উঠে আসে ‘দেবগঙ্গা’, ‘দ্বীপগঙ্গা’, ‘দীর্ঘগঙ্গা’ ‘দ্বিগঙ্গা’ ইত্যাদি শব্দ। অনুমান করা হয়, গঙ্গার দুটি ধারা পদ্মা ও ভাগীরথী একসময় এই অঞ্চল দিয়েই প্রবাহিত হত এবং তাদেরই ব-দ্বীপে গড়ে উঠেছে উল্লিখিত অঞ্চল। এবং ‘গঙ্গে’, যা গঙ্গারিডি সভ্যতার রাজধানী ছিল, তা আসলে ‘দ্বিগঙ্গা’ বা বর্তমান দেগঙ্গারই আদিরূপ। ঐতিহাসিকদের এই অনুমান যদি সত্যি হয়, তাহলে এই অঞ্চল যে প্রায় ২৩০০ বছরের পুরনো, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না কোনও।

এ-ছাড়াও প্রমাণ আছে বইকী! চন্দ্রকেতুগড়ে খননের ফলে উঠে এসেছে মৌর্য(খ্রিস্টপূর্ব ৩২২ সন) ও শুঙ্গযুগের(খ্রিস্টপূর্ব ১৭৮ সন) সমসাময়িক নানা সামগ্রী, যা প্রাচীনত্বের প্রমাণে শীলমোহর বসিয়েছে।
যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল এখানে, তার সম্পর্কে অবশ্য বিস্তৃত জানা যায় না আজও। পুরাতত্ত্ব বিভাগের পূর্বাঞ্চল শাখার সুপারিন্টেন্ডেন্ট মিঃ লঙ হার্স্ট ১৯০৬ সালে চন্দ্রকেতুগড় পরিদর্শনে এসে মন্তব্য করেন, ‘This was one of the earliest settlement in lower Bengal.’ এরপর ১৯০৯ সালে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এসেছিলেন, সে-কথা আগেই বলেছি। কিন্তু এসবের বহু পরে, ১৯৫৬-৫৭ সালে কলকাতার আশুতোষ মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধানে প্রথম খননকার্য শুরু হয় এখানে। পাওয়া যায় মৌর্য, শুঙ্গ, কুষাণ, গুপ্ত, পাল ও সেনযুগের নানা প্রত্নবস্তু। ছ’টি স্তর খোঁড়ার পর জল উঠে আসায় খননকার্য থামিয়ে দেয়া হয়েছে।

এখানকার শেষ হিন্দু রাজা চন্দ্রকেতু। তাঁর আমলে ওই অঞ্চল পরিচিত ছিল ‘দেউলিয়া’ নামে। অসংখ্য মন্দিরের উপস্থিতির কারণে ‘দেবালয়’ লোকের মুখে মুখে পরিণত হয় ‘দেউলিয়া’য়(বর্তমানেও বেঁড়াচাপা-সংলগ্ন গ্রামটি দেউলিয়া নামেই পরিচিত)। যদিও মৌর্যযুগ থেকে চন্দ্রকেতুর আগে পর্যন্ত এই অঞ্চলে রাজত্ব করতেন কারা, জানা যায়নি এখনও। ইতিহাসের সে-অধ্যায় আড়ালেই থেকে গেছে।
আমার ধারণা, স্থানীয় জমিদার বা সামন্তরাজা ছিলেন চন্দ্রকেতু বা তাঁর পূর্বপুরুষেরা। অবশ্য দীর্ঘ দেড়হাজার বছর ধরে তাঁদের বংশই যে এই অঞ্চল শাসন করেছে, এ-কথা ভেবে বসা অর্থহীন। অধিকাংশ খননকার্য এখনও বাকি থেকে যাওয়ায়, মৌর্যযুগ থেকে পালযুগ পর্যন্ত অধ্যায়ের অনেকটাই অন্ধকারেই থেকে গেছে। আবার, যদি স্বতন্ত্র ও উল্লেখযোগ্য রাজাই হতেন চন্দ্রকেতু, তবে সামান্য কিছু পীরের পুঁথি ছাড়া ঐতিহাসিক অন্যান্য রচনাতেও তাঁর উল্লেখ পাওয়া যেত নিশ্চই। একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে তাঁর ক্ষেত্র সীমাবদ্ধ ছিল বলেই, স্থানীয় লোককথা ও প্রবাদের মধ্যেই আবর্তিত হয়ে চলেছেন তিনি। অবশ্য এতে স্থানটির প্রাচীনত্ব ও গরিমায় টান পড়ে না মোটেই। যে-সমস্ত নিদর্শন পাওয়া গেছে চন্দ্রকেতুগড় ও আশেপাশের গ্রাম থেকে, তা একটি উন্নত ও রুচিশীল সভ্যতার কথাই জানান দেয়। সাধারণ জনজীবনেরও একটি চিত্র অনুমান করা যায় এর থেকে।
আরও পড়ুন
খনা-মিহিরের ঢিপি
প্রসঙ্গত, চন্দ্রকেতুগড় ও সংলগ্ন এলাকা একসময় বালান্দা(বালাণ্ডা)’র অন্তর্গত ছিল। প্রাচীন ‘বালবল্লভী’ রাজ্য থেকেই ‘বালান্দা’ শব্দটির উৎপত্তি, এমন অনুমান করা হয়। শেরশাহের আমলে (১৫৩৯-৪৫) বালান্দা পরগনার সৃষ্টি হলেও, বহু আগে বৌদ্ধযুগ থেকেই এই অঞ্চলের খ্যাতি ছিল। হাড়োয়া-চন্দ্রকেতুগড় বালান্দার উল্লেখযোগ্য অংশ। ফলে, প্রাচীনকালে চন্দ্রকেতুগড়-সহ সম্পূর্ণ অঞ্চল ‘বালবল্লভী’ রাজ্যের অধীনে ছিল, এ-অনুমান খুব একটা ভুল হবে না।
১৯০৬ সালে লঙ হার্স্ট কর্তৃক পরিদর্শনের প্রায় আঠাশ বছর আগে, ১৮৭৮ সালে কেদারনাথ চক্রবর্ত্তী একটি উপন্যাস লিখেছিলেন, নাম ‘চন্দ্রকেতু’। প্রচলিত গল্পের সঙ্গে কল্পনা মিশিয়ে ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার যথার্থ ধারা অনুসরণ করেছিল সেটি। অবশ্য চন্দ্রকেতুগড় সংক্রান্ত কারও লেখাতেই সেই উপন্যাসটির উল্লেখ চোখে পড়েনি আমার। ‘চন্দ্রকেতুগড়’ শব্দটিও একবারও ব্যবহৃত হয়নি সেখানে। এমনকী, ১৯২৬ সালে মাসিক বসুমতী পত্রিকায় রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন, তারও শিরোনাম ছিল ‘চন্দ্রকেতুর গড়’। পরবর্তীকালে জায়গাটি অধিক আলোচিত হওয়ার সময় পরিচিতি পেয়েছে ‘চন্দ্রকেতুগড়’ নামে, চন্দ্রকেতুর আমলে যা ‘দেউলিয়া’ নামেই অভিহিত হত। যাইহোক, কেদারনাথ চক্রবর্ত্তী প্রণীত ‘চন্দ্রকেতু’ উপন্যাসটির তৃতীয় পরিচ্ছেদ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেয়ার লোভ দুঃসহ হয়ে উঠছে – “জেলা চব্বিশ পরগণার অধীন সবডিবিজন বারাসতের সীমা অভ্যন্তরে, পূর্ব্বোক্ত বালণ্ডা নাম্নী নগরী ছিল। দীর্ঘা যত পরিখা, অত্যুচ্চ ভিত্তি বেষ্টিত একটী ভগ্নাবশিষ্ট দুর্গ রাজা চন্দ্রকেতুর ঐশ্বর্য্যের পরিচয় দিতেছে। দুর্গটী সমচতুষ্কোণ, ত্রি-ভুজ কি বৃত্তাকার নহে, বহুকোণ বিশিষ্ট। অবিকল না হউক, কলিকাতার ফোর্টউইলিয়ম নামক দুর্গের সহিত অনেকাংশে সৌসাদৃশ্য আছে। দৈর্ঘ পরিমাণ সমষ্টি চারি বর্গ মাইল। প্রস্থ, তদপেক্ষা শত হস্ত ন্যূন হইবেক। দুর্গটীর দক্ষিণাংশে প্রশস্ত সিংহদ্বার ছিল। অধুনা লোক ঐ স্থানের নাম ‘সিংদরজা’ দিয়াছে…।” ঐতিহাসিক উপন্যাসের মধ্যে এভাবে বর্তমান চলে আসায় রসভঙ্গ হলেও, ১৮৭৮ সালের চন্দ্রকেতুগড় সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করা যায় এর মাধ্যমে। সম্ভবত এটিই ওই গড় সম্পর্কে বাংলাভাষায় লিখিত আদিতম নিদর্শন।
উপন্যাসটিতে চন্দ্রকেতুগড়ের সভ্যতার বিলুপ্তির কারণ সম্পর্কে লোককথা ভিত্তি করে গোরাচাঁদ-প্রসঙ্গই নিয়ে আসা হয়েছে। অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক। অলৌকিক সমস্ত ঘটনা বাদ দিলে, গোরাচাঁদ পীরের সঙ্গে চন্দ্রকেতুর সংঘর্ষ ও পরবর্তী ঘটনাক্রমই এই গড়ের ক্রমবিলুপ্তির কারণ বলে মনে করি।
(ঋণ – মাস্তুল পত্রিকা)