শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গ নয়, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ টালা জলের ট্যাঙ্ক
বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দুল্লাহ্ ১৭৫৮ সালে মিরজাফরের থেকে কিনে নিয়েছিলেন ৩৩টি গ্রাম এবং সেগুলি নিজের মতো করে সাজিয়েছিলেন। পুরো অঞ্চলটি সেইসময় ডিহি পঞ্চগ্রাম নামে পরিচিত ছিল। বর্তমান টালা তারই একটা অংশ। উত্তর কলকাতার এই টালা অঞ্চলের প্রসঙ্গ এলেই সবার প্রথমে নজরে আসে টালা ট্যাঙ্ক। শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলের ট্যাঙ্ক। ব্রিটিশদের হাত কলকাতা যখন সাবালক শহরে পরিণত হচ্ছে, তখন নাগরিক পরিষেবা বাড়ানোর দিকে নজর দেয় ব্রিটিশরা। তখনকার পুর-ইঞ্জিনিয়ার মিঃ ডেভেরাল একটি রিজার্ভার জলের ট্যাঙ্ক তৈরির প্রস্তাব দেন। সেই প্রস্তাবের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন বেঙ্গল গভর্নমেন্ট। প্রস্তাবের সামান্য অদলবদল আনেন পুরসভার নতুন ইঞ্জিনিয়ার ডব্লু বি ম্যাকক্যাবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী খরচ হবার কথা ৬৯ লক্ষ ১৭ হাজার ৮৭৪ টাকা। কিন্তু কোথায় হবে সেই বৃহৎ আয়তনের ট্যাঙ্ক? জায়গা কোথায়? অনেক পর্যবেক্ষণের পর নজরে এল টালা অঞ্চল। আজকের টালা ট্যাঙ্ক দাঁড়িয়ে আছে কত কত স্মৃতি আর ঐতিহ্য নিয়ে।

এই জায়গায় তখন বেশ কয়েকটি বড়ো বড়ো পুকুর ছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সমস্ত পুকুর বুজিয়ে তার উপর নির্মিত হবে ওভারহেড রিজার্ভার। পুকুরগুলিকে জনশূন্য করে চারিদিকে শাল খুঁটি দিয়ে ২০-২৫ ফুট পাইল করে খোয়া দিয়ে ভর্তি করা হয়। ভারি স্টিম রোলার দিয়ে সমান করে তার ওপর খোয়া দিয়ে ৯ ইঞ্চি পুরু আরও একটি স্তর তৈরি করা হয়। এরপর আড়াই ফুট পুরু কংক্রিট সিমেন্টের উপর ফ্ল্যাট স্টিল টাঁই-এর সঙ্গে বোল্ড স্টিল জয়েন্ট দিয়ে স্তম্ভগুলিকে দাঁড় করানো হয়। ট্যাঙ্কের উচ্চতা প্রায় ১১০ ফিট। যেখান থেকে মাধ্যাকর্ষণের স্বাভাবিক নিয়মে জল পরিষেবা দেওয়া সম্ভব হবে। অবশেষে সেই কাজ সম্পন্ন হল। ১৯০৯ সালের ১৮ নভেম্বর টালা ট্যাঙ্ক উদ্বোধন করলেন লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার এডওয়ার্ড বেকার।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এ যাবৎকাল পর্যন্ত সংঘটিত সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫)-এর সময় টালা ট্যাঙ্কের উপর বোমা ফেলে জাপান। কিন্তু সেই জাপানি বোমায় টালা ট্যাঙ্ক ধ্বংস হয়নি। মাত্র ৯টি ক্ষত হয়। এরপর ১৯৬২ এবং ১৯৭১-এর যুদ্ধে চিন এবং পাকিস্তানেরও টার্গেট ছিল টালা ট্যাঙ্ক।
• ট্যাঙ্ক ফাউন্ডেশন- টি সি মুখার্জি
• কংক্রিট ফাউন্ডেশন- স্যার রাজেন্দ্রলাল মুখার্জি অ্যান্ড কোম্পানি
• বাকি কাজ সম্পন্ন- ক্লেটন কোম্পানি
• ট্যাঙ্কের গভীরতা- ১৬ ফুট
বিশ্ব ইতিহাসকে ধারণ করে আছে কলকাতার এই টালা ট্যাঙ্ক। আসলে সমস্ত ইতিহাসের গায়ে পলি পড়ে না। আদিম এক গন্ধ নিয়েই বেঁচে থাকে অজানা অচেনা সব ইতিহাস। আজ যখন টালা ট্যাঙ্কের পাশ দিয়ে যাতায়াত করেন, ভাবতে পারবেন সেখানে উপস্থিত থাকা সেই পুকুরগুলোর কথা! কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রাক্কালে জাপানিরা বোমা ফেলছে ট্যাঙ্কের উপর, অথচ আস্ত ট্যাঙ্কটির কোনো ক্ষতিই হচ্ছে না! ইতিহাস এইভাবে গায়ে কাঁটা দিয়ে যায়। টালা ট্যাঙ্কের বয়স আজ ১১০ বছর। এখনও লক্ষ লক্ষ মানুষকে ফ্রেশ জল দিয়ে যাচ্ছে। এখনও অবধি কাউকে বলতে শোনা যায়নি, টালার জল বড্ড বাজে হয়ে যাচ্ছে। কি, পারবেন বলতে?

তথ্যসূত্র- উইকিপিডিয়া এবং ডেইলিহান্ট.ইন