বিভিন্ন রাজ্যে ভিন্ন ভিন্ন ছবি ও ইতিহাস জড়িয়ে আছে পানের বাটার সঙ্গে
শেষ পাতে পান বাঙালির খাদ্য তালিকার একটি উল্লেখযোগ্য উপকরণ। গেরস্থের অন্দরমহলে দুপুরে চুল এলিয়ে গায়ে রোদ লাগাতে লাগাতে গল্পকথায় সঙ্গী থাকত পানের বাটা এবং ডাবর। অতিথি আপ্যায়ন, পূজাপার্বণ, শুভকাজে সবক্ষেত্রেই বাঙালি প্রধান উপাদান পান ও সুপারি। পান ও সুপারি মহিলা ও পুরুষের যৌনাঙ্গের প্রতীকী হিসাবে বংশবৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হত। আগে ঠোঁট রাঙাতে এর ব্যাপক প্রচলন ছিল।
জাভা হল পানের জন্মভূমি। পান রাখা ও খাওয়ার পদ্ধতির মধ্যে একটা বৈচিত্র্য দেখা যায় সারা ভারতজুড়ে। পান যেখানে রাখা হয় তাকে বলে ডাবর এবং পান যাতে করে পরিবেশন করা হয় তাকে বলে বাটা। ডাবর শব্দটির অর্থ দভ্র বা সাগর। যেখানে পান ধুয়ে লাল সালু কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, যাতে শুকিয়ে না যায়। পেতলের অথবা রুপো দিয়ে তৈরি হয় এই বাটা। তবে এদের আকার আকৃতি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন হয়। বাংলায় দেখতে পাওয়া পানের বাটাগুলি হয় গোল স্ফীত বেশ গম্ভীর চরিত্রের। যেন হৃষ্টপুষ্ট গোলাকার গৃহিণী থুপ করে বসে আছেন ঘরে। অলস দুপুরের গৃহিণীর একান্ত আপন সঙ্গী। অসমের পানের বাটার আকৃত পাহাড়ে চূড়ার মত। কিন্তু উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, লখনউ, বেনারসে পান রাখার পাত্রকে বাটা বলা হয় না। একে বলে পানের কৌটো। এখানে পানের সঙ্গে রাখা হয় নানা রকম সুগন্ধি দ্রব্য ও মশলা। এতে নাকি পান ‘রংদার’ হয়। তাঁরা মনে করেন পান হবে গন্ধে ভরপুর। তাকে অলঙ্করণ করা হবে নানা ধরনের মনোহারি দিয়ে যা মনকে হরণ করবে। এই মশলা থেকে নির্গত রস জিভের মধ্যে ঘোরাফেরা করবে। সেই রস মুখে দিয়ে কথা বললে কথার আমেজ হয় আলতো আর সেই কথার মধ্য থেকেও খুশবু বের হয়। তাতে অতিথির মন ভালো হয়। এক কথায় বলতে গেলে, এখনকার মাউথ ফ্রেশনারের পূর্বপুরুষ। পান খেলে, পানের রস যদি ঠোঁটের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে তাকে আভিজাত্যের লক্ষণ বলা হয়। কারণ অতিথিকে গান শোনানোর জন্য খুশবুদারি আয়োজন করা হয়েছে। বাংলা ও অসমের পানের বাটায় মসলা রাখা হয় না।
অসম দেশে পানের বাটার আরেকটি আলাদা বিশেষ চরিত্র আছে। পানের বাটায় কাটা হয় নানা নকশা। পানের বাটা তা সে পিতল হোক বা রুপো, তার পিছনে ছিলাকাটা নকসায় নানা পরিচয় পাওয়া যায়। একসময় সমাজের বিভিন্ন ঘটনার পরিপেক্ষিতে পানের বাটায় ছিলা কেটে লেখা হত রূপসী এলোকেশীর নাম। অনেকে আবার এলোকেশীর স্বামী নবীনের নামও লিখিয়ে রাখতেন। লোকমুখে প্রচলিত, হুগলী জেলার নবীনচন্দ্র-এলোকেশীর নাম লেখা পানের বাটা থেকে ঘরের মেয়ে বউরা পানের খিলি করতে করতে হাপুস নয়নে দুপুর কাটাতেন। মনের আড়ালে হয়ত জেগে থাকত নিজের ঘরের পুরুষটির দীর্ঘদিনের ‘কলকেতায় আপিস কাজের’ দীর্ঘ অনুপস্থিতি।
স্বদেশীযুগে ঠাকুমা-দিদিমারা বিপ্লবীদের নাম লিখে রাখতেন পানের বাটায়। কেউ লেখাতেন বাদল, কেউ লেখাতেন যতীন, কেউ লেখাতেন দীনেশ, কেউ আবার কল্পনা অথবা মাতঙ্গিনী। এই ভাবে অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা মা-দিদিমাদের ঘরের সন্তান হয়ে যেতেন। গৃহের আড়ালে বসে একদিকে তাঁর সেই বাটা থেকে পান থলে অতিথি আপ্যায়ন করতেন অন্যদিকে বিপ্লবীদের প্রতি আর্শীবাদের বার্তা দিয়ে রাখতেন লোকের মুখেমুখে। ইসলামি কিতাবে ইউছুপ জুলেখা বা রূপবান কন্যার কাহিনীতে রুপোর পানের বাটার উল্লেখ রয়েছে। মনসামঙ্গল কাব্যে উল্লেখ আছে চাঁদসদাগরের স্ত্রী সনকা পানের সঙ্গে এমন মিশ্রণ তৈরি করতে যাতে ঠোঁট লাল টকটকে হয়। আর সেই লালা টকটকে ঠোট দেখে পাগল হতেন চাঁদ সদাগর। আজও বেশ কিছু পুরনো বাড়িতে ময়ূর আকৃতির পানের কৌটোর দেখা মেলে। ময়ূরের দেহের বিভিন্ন অংশে রাখা থাকে পান, চূন, খয়ের, জর্দা, সুপরি, পানের মশলা। অসমে পান খাওয়ার জন্য ব্যবহার করত কাঁচা সুপারি ও শুকনো নারকেল কুচি।
তথ্যসূত্র- দেবদত্ত গুপ্ত
পানের কৌটো সংগ্রাহক- অরুণ পাল