ইতিহাসের লালদিঘি: কলকাতার ‘ছায়া-পড়া-আয়না’

কলকাতায় এমন স্বাদু জলের দিঘি আর একটিও নেই। ছিলও না কখনো…

ঢাউস ঢাউস কতগুলো আদ্দিকালের পুরোনো বাড়ি। মহাকরণ-জেনারেল পোস্ট অফিস-টেলিফোন ভবন-রিজার্ভব্যাঙ্ক। এই সমস্ত মিলিয়ে কলকাতার ডালহৌসি পাড়া। ভালোনাম বিবাদিবাগ। অক্টোপাসের মতো আট-আটখানা রাস্তা মেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এখানে ব্যস্ততার শেষ নেই। লোকে ছুটছে এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত। চড়া রোদ, ঝুপুরঝাপুর বৃষ্টি, ধুলোকাদায় কখনোই এ অঞ্চল শান্ত হয় না। গাড়ির হর্ন থামে না। সোমবার সকাল থেকেই ডালহৌসি স্কোয়ারের গায়ে পরানো হয় একটি অফিসি-কোট। হপ্তা পেরিয়ে রোববার না-আসা ইস্তক তা খোলা চলে না। আর রবিবারও আজকাল বিরাম নেই। ঘর্ঘর করে অফিসঘরের পাখা ঘুরতেই থাকে।এই ডালহৌসি স্কোয়ারের ঠিক মাঝখানটায় গা-এলিয়ে রয়েছে বাঁধানো একটি দিঘি। চারপাশের আকাশছোঁয়া বাড়িগুলির ছায়া পড়ে দিঘির স্বচ্ছ জলে। লালদিঘি।

কলকাতার ইতিহাস লিখতে গেলে এই দিঘিকে বাদ দেওয়া চলে না। কলকাতায় এমন স্বাদু জলের দিঘি আর একটিও নেই। কখনো ছিলও না। কলকাতার ইতিহাস নিয়ে লেখা সমস্ত বইতেই দিঘিটির কথা ঘুরেফিরে আসে। শোনা যায়, সাবর্ণ চৌধুরীদের কাছারি বাড়ি ছিল লালদিঘির পাড়ে। আর ছিল শ্যামরায়ের মন্দির। দোল উৎসবের দিন কুঙ্কুমে আবিরে চেলির মতো রাঙা হয়ে উঠত দিঘির জল। আবার কেউ কেউ বলেন মুকুন্দরাম শেঠের কাছারিঘর ছিল দিঘির কিনারায়। দোলের দিন খুব ঘটা করে রঙ খেলা হত। সেই রঙ লাগত দিঘির জলে। তাই নাম লালদিঘি। এখানেই শেষ নয়। লালদিঘির নামকরণের কারণ হিসেবে লালচাঁদ বসাকের নামও উঠে আসে। দিঘিটি নাকি খনন করিয়েছিলেন তিনিই। আবার পুরোনো কেল্লার লাল দেওয়ালের ছায়ায় রাঙা হত বলেও নাকি লালদিঘি উপাধি জুটেছিল।

সে যাইহোক, এই দিঘির কাছেই স্ট্র‍্যান্ড রোডের ওপরে একসময় নাগাল মিলত গঙ্গার। ইংরাজরা সাবর্ণ চৌধুরীদের কাছ থেকে দিঘি খরিদ করে তা সংস্কার করে। তখনকার দিনে খরচ হয়েছিল ৫৪ টাকা। সংস্কারের পর নামও পালটে রাখা হল 'ট্যাঙ্ক স্কোয়ার'। কিছুকাল পরে তা হল ‘গ্রিন বিফোর দ্য কোট’। সাহেব-মেমদের হাওয়া-খাওয়ার জায়গা ছিল লালদিঘির পার আর স্ট্র‍্যান্ড রোড। তবে,এই দিঘি “শুধু হাওয়া খাওয়ার একমাত্র জায়গা ছিল না, জলপানেরও একমাত্র পুকুর ছিল।… সাহেবপাড়ার সমস্ত পানীয় জল এখান থেকে সরবরাহ হয়…”। [কেরী সাহেবের মুন্সী: প্রমথনাথ বিশী]

জেনারেল পোস্ট অফিসের ভিটেয় তখন পুরোনো ফোর্ট উইলিয়াম। ১৭৫৬-এর ১৮ই জুন সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে লড়াই বাঁধে কোম্পানির। সে যুদ্ধও কিন্তু ইতিহাসে লালদিঘির যুদ্ধ নামেই খ্যাত। তারপর থেকে অবশ্য দিঘির অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে যায়। ময়লা পড়ে মজে আসতে থাকে। পরে ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলে আবার তা সংশোধিত হয়। রেলিং ওঠে দিঘির চারধারে।

এই লালদিঘি প্রসঙ্গে আরো একটি কথা বলা চলে। ‘ওপারে যে বাংলাদেশ/ এপারেও সেই বাংলা’র মতো করে আমরা বলতে পারি ওপারে যে লালদিঘি, এপারেও তা। বাংলাদেশের চট্টগ্রামের একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন সেখানকার লালদিঘি। ১৭৬১সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রাম দখল নেওয়ার পর থেকে এই দিঘির রমরমা। দিঘির চারপাশ ঘিরে তৈরি হয়েছিল প্রশাসনিক ভবনগুলি।

লালদিঘির পাড়ে সন্ধ্যা নামার সময় এখনো ক্ষীণ রক্তিম রেখা জেগে ওঠে। হুগলি নদীর তীরে তিনখানা গ্রাম। তাদের অদলবদল করে একদা গড়ে উঠেছিল কলকাতা শহর। আজ সেই ইতিহাসের অনেক কিছুই মজুত নেই। থাকলেও ক্ষয়াটে, কুয়াশার মতো ঝাপসা। হুগলি নদীর পার ধরে ভিতরে প্রবেশ করতে করতে চোখ হয়তো পড়বে তিনশো বছরের ইতিহাস মেখে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ির দিকে। আজ হয়তো তার সামনে লটকে আছে সাইনবোর্ড ‘বিপজ্জনক বাড়ি’। পুরসভা থেকে বাড়ি খালির নির্দেশ। আধভাঙা দরজায় হয়তো দুমড়ে আছে কতদিনের পুরোনো ডাকবাক্স। পাশের দেওয়ালে পাথুরে ফলকে মুছে-যাওয়া নাম- করুণা ভবন। কলকাতার শিকড় সন্ধান করলে আজকাল এগুলোই মেলে।

দিঘিতে-খালে-পুকুরে এই শহর একদা উপচে পড়ত। নয়ানজুলির ধারে ধারে চাষের খেত মজুত ছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার বেশ কিছু বছর পরেও। আজ সেগুলিও অতীতের তালিকায়। 

লালদিঘিটি টিকে গিয়েছে কোনোক্রমে। মধ্যকলকাতার মধ্যমণি এই দিঘির ধারে ইতিহাসের কোনো শেষ নেই। নতুন চার্চ, পুরোনো কেল্লা, নন্দকুমারের ফাঁসি- এইসমস্ত ঘটনার ছায়া পড়েছিল লালদিঘির বুকে। রাইটার্স বিল্ডিঙের অলিন্দে দাঁড়ালে চোখ জুড়িয়ে দিত স্বচ্ছ জলাশয়টি।

আর আজও কলকাতার বুড়ো বাদামওয়ালা, দেহাতি ঠেলাওয়ালা, অফিস-ফেরত বাবু বা বেকার যুবকের হতাশা মিশে যেতে থাকে লালদিঘির স্বাদু জলে। শহরের সুখ ও দুঃখবোধের, অতীত ও বর্তমানের নির্বাক প্রতিচ্ছবি এই দিঘি।

ছবি- তর্পিণী ভুঁইঞা

Post Tags
Developed by DXDasia