ডাকব্যাক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সুরেন্দ্রমোহন বসু
ডাকব্যাকের নাম শোনেনি, বা তার রেইনকোট, বর্ষাতি ব্যবহার করেনি – এমন বাঙালি পাওয়া মুশকিল। বর্ষাকাল মানেই ডাকব্যাকের রেইনকোট। স্কুল-পড়ুয়া খুদেদেরও পছন্দের তালিকায় থাকে তা। অপূর্ব তার রং। বর্ষাকেও যেন আরো রঙিন করে তোলে।
তা এই ডাকব্যাক নয়-নয় করে প্রায় একশো বছর ছুঁয়ে ফেলল। বাঙালির নস্টালজিয়ায় মিশে তো বটেই। তাছাড়া, এই ডাকব্যাক বাঙালির স্বাবলম্বিতারও গল্প বলে। সেটাও অবশ্য আজকাল শুধু নস্টালজিয়াই হয়ে উঠতে চলেছে। তবে চাইলে অনুপ্রেরণাও হতে পারে।
ডাকব্যাকের প্রতিষ্ঠাতা সুরেন্দ্রমোহন বসু। অসাধারণ মেধা, ক্ষুরধার বুদ্ধির একজন মানুষ। ১৮৮২ সালে জন্মেছিলেন ঢাকার বামনতিতা গ্রামে। বাবা মোহিনীমোহন বসু ছিলেন প্রধান শিক্ষক। ছোটোবেলা থেকেই স্বদেশি চেতনা ডালপালা মেলেছিল সুরেন্দ্রমোহন বসুর মধ্যে। ব্রিটিশ সরকারের রোষেও পড়েছিলেন ভালোভাবেই। আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ফলিত রসায়ন ছিল তাঁর বিষয়। কিন্তু বিদেশে থাকলেও তাঁর স্বদেশচিন্তাকে ইংরেজ বেশ ভয়ই পেয়ে এসেছিল। সেকারণে পড়াশোনা শেষ করে ১৯১৪ সালে অ্যামেরিকা থেকে ফেরার সময়ই তাঁকে আটক করার পরিকল্পনা তারা করে। বোম্বে বন্দরে নামতে না নামতেই ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্টে গ্রেপ্তার হন সুরেন্দ্রমোহন। উত্তরপ্রদেশের রেওয়া এস্টেটের হামিরপুরে অন্তরীণ করে রাখা হয়।
ডাকব্যাক আজও বাঙালির অনুপ্রেরণা
সেখানে এক জার্মান সাহেবের গালার রাসায়নিক কারখানা ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আমল। তিনি তাই দেশে ফিরে যান। কিন্তু রেওয়া এস্টেটের রাজা সুরেন্দ্রমোহনের ফলিত রসায়নে দক্ষতার কথা জেনে, তাকে শিল্পোৎপাদনের কাজে লাগান। অবশ্যই ব্রিটিশ সরকারের অনুমতি নিয়ে। এখানে তিনি একটি ছোটো ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম উপায়ে অ্যান্টিকোরেসিভ কেমিক্যাল কম্পাউন্ড তৈরি করেন। অনেকের মতে সুরেন্দ্রমোহনের এই অ্যান্টিকোরেসিভই ভারতে প্রথম তৈরি কৃত্রিম রবার।
সে যাই হোক। সুরেন্দ্রমোহন সময় মতো ছাড়া পেলে, কলকাতায় ফেরেন। ১৯১৯ সালে। তাঁর মা- বাবা ও অন্য তিন ভাই তখন কলকাতাতেই থাকেন। ছোট্ট একটি বাড়ি, তাতে স্থানাভাব বেশ ভালোই। তবু তিন ভাইকে নিয়ে সেখানেই সুরেন্দ্রমোহন বানিয়ে ফেললেন, বেঙ্গল ওয়াটার প্রুফ ওয়ার্কস। কেমিক্যাল প্রসেসিং-এর মাধ্যমে রেইনকোট-সহ আরো বেশকিছু জল-নিরোধক জিনিসপত্র বাজারে ছাড়লেন। গায়ে লেখা রইল ডাকব্যাক। সালটা ১৯২০। ঠাসাঠাসি চৌখুপি ঘরে শুরু হল ডাকব্যাকের যাত্রা।
১৯২২ সাল। সুরেন্দ্রমোহনের বিবাহ হল হোমিওপ্যাথি ডাক্তার ডিএন দে’র কন্যার সঙ্গে। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের কাছে ছিল ডাক্তারবাবুর বিশাল বাগান। সে বাগানখানা কারখানা গড়তে দিলেন জামাইকে। ১৯২৩ সালে এভাবে শুরু হল ডাকব্যাক কারখানা। বাঙালি জীবনে তদ্দিনে ডাকব্যাক দিব্বি ঢুকে পড়েছে বরিষণ মুখরিত শ্রাবণের সঙ্গী হয়ে।
ব্রিটিশ আমলেই গোটা ভারতে জমে উঠেছিল ড্যাকব্যাকের বাজার
১৯২১ সালে একজন ইংরেজও এই ব্যবসা শুরু করেছিল কলকাতায়। বিশাল অর্থ বিনিয়োগও করেছিল। ডাকব্যাকের থেকে তার জিনিসপত্তর সস্তাও ছিল খানিক। তবু ডাকব্যাকের ফিনিশিং, তার রং, রুচির সঙ্গে সে পাল্লা দিয়ে টিকতে পারেনি। হাল ছেড়েছিল। ১৯৩৮ সাল নাগাদ গোটা ভারতেই ডাকব্যাকের রমরমা বাজার একেবারে জমে উঠল। কলকাতার স্বল্প পরিসর ছেড়ে কারখানা উঠে যায় পানিহাটিতে। সেখানে সুরেন্দ্রমোহন ও তাঁর তিন ভাই-নিজেরা রাতদিন পরিশ্রম করে কারখানা গড়ে তোলেন। ১৯৪০ সালে তা বেঙ্গল ওয়াটার প্রুফ ওয়ার্কস লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হয়। আর তারপর ডাকব্যাকের ছড়িয়ে পড়া বা তার জনপ্রিয়তার কথা আমরা জানি।
খুব বেশিদিন নয়। একশোটি বছর, এক বিশাল সময়ফ্রেমের নিরিখে কতই বা আগে! তবু একটা জাতি ঘুরে দাঁড়াতে চেয়েছিল। স্বাবলম্বী হতে চেয়েছিল। নিজেদের বিদ্যাবুদ্ধিকে দেশের কাজে লাগিয়েছিল এভাবেই। আজকের মুহূর্তে এই গল্পগুলোর মতো প্রাসঙ্গিক আর খুব কম কিছুই আছে। সময়টা বা বাস্তব অবস্থাটা এখনকার থেকে খুব আলাদা ছিল না।
ঋণ : বাংলার কলকারখানা ও কারিগরি বিদ্যার ইতিহাস – জিতেন্দ্রনাথ রায়
ছবিসূত্র : Pinterest, classicindianads.blogspot.com