শেরপাদের ইতিহাস ও বর্তমান

১৮৮০ সালের আগেই দার্জিলিং-এ রেলপথ নির্মাণের জন্য ইংরেজরা কাজে লাগায় শেরপাদের

এভারেস্ট জয় করার জন্য দার্জিলিং পাহাড়ের তেনজিং নোরগে শেরপার নাম সবাই জানেন। এভারেস্ট বা অন্য পর্বতশৃঙ্গ জয় করতে যাওয়া অভিযাত্রীদের বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করে থাকেন শেরপারা। নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও তাঁরা অভিযাত্রীদের পাশে দাঁড়ান। ব্রিটিশরা দার্জিলিং পাহাড়ে রাস্তঘাট নির্মাণের মতো কঠিন ও কঠোর পরিশ্রমের কাজে এক সময় শেরপাদের কুলির মতো ব্যবহার করেছে। কুলির মতো পরিশ্রম করিয়েও তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হয়নি বলে জানাচ্ছেন কিছু ইতিহাসবিদ। তাঁদের ছেলেমেয়েরা সঠিক চিকিৎসা ও শিক্ষা পায়নি। আজ আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হিমালয় পাহাড়ের এই শেরপাদের জীবনযাত্রার ধারায় ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। তাদের মধ্যে কেউ ডাক্তারি পড়ছে, কেউ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। কেউ হয়েছে শিক্ষক। উত্তরবঙ্গের এই পাহাড়ি আদি জনজাতিদের নিয়ে তাই দেশের মধ্যে প্রথম ইতিহাসের আলোকে গবেষণার কাজ শেষ করে এম ফিল করলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী অঞ্জসী সরকার।

শিলিগুড়ি শিবমন্দিরে বাড়ি অঞ্জসীর। তার বাবা ডঃ ইচ্ছামুদ্দিন সরকার উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাত্র ২৫ বছরের মেয়ে অঞ্জসী দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পূর্ব এশিয়ার মধ্যে এই প্রথম শেরপাদের বিভিন্ন দিক নিয়ে ইতিহাসের ভিত্তিতে গবেষণা করলেন। ২০১৪ থেকে ২০১৬ – দুই বছরের মধ্যে অঞ্জসী তাঁর গবেষণা শেষ করেছেন। এর মধ্যে দেড়শ পৃষ্ঠার গবেষণা পত্র লিখতে তার টানা ছয় মাস সময় লেগেছে। এই কাজের জন্য তাকে বিশেষ ভাবে তিব্বতি ভাষা শিখতে হয়েছে। তার গবেষণার বিষয় ,দ্য হিমালয়ান পোর্টার –এ সোস্যাল হিস্টোরি অফ দ্য শেরপাস। আসছে ফেব্রুয়ারি মাসে এ নিয়ে দুশ পাতার বইও প্রকাশিত হতে চলেছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিংহ-র কন্যা তথা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান উপেন্দার সিংহ এই কাজের প্রশংসা করেন। গবেষণাপত্রে  প্রাক্তন মন্ত্রী জহরলাল নেহেরু, শিক্ষা মন্ত্রী মৌলানা আজাদের চিঠি ছাড়া নাঙ্গা পর্বতে শেরপাদের হাতে অর্পণ করা জার্মান রেড ক্রসের সার্টিফিকেট ঠাঁই পেয়েছে। জার্মান রেড ক্রসের সেই সার্টিফিকেটে অ্যাডলফ হিটলারের সই রয়েছে। রয়েছে শেরপাদের আরও অনেক দুষ্প্রাপ্য ছবি।

কিন্তু কী আছে সেই গবেষণায়? জানা যাচ্ছে, পঞ্চদশ শতকে তিব্বত থেকে শেরপারা নেপালের শোলোখুম্বুতে বসবাস শুরু করেছিলেন। আর সেই সময় তারা নেপাল থেকে দার্জিলিং পাহাড়ে প্রথম আসা শুরু করেন ব্যবসার জন্য। দার্জিলিং-এর বসবাসকারীদের জন্য তাঁরা গরম পোশাকের উল ছাড়া বিভিন্ন খাদ্যের কাঁচা পন্য নিয়ে এসে বিক্রি শুরু করেন। এই শেরপারা খুব পরিশ্রমী, সাহসী। ব্রিটিশরা দার্জিলিং-এর উন্নতির কাজে নামলেন। ১৮৮০ সালের আগেই দার্জিলিং-এ রেলপথ নির্মাণের জন্য প্রস্তুতি শুরু হয়। তখন তাঁরা শেরপাদের পুরোদমে কাজে নামালেন। রেল লাইন পাতা থেকে শুরু করে পাহাড়ে কঠিন রাস্তা নির্মাণে শেরপাদের কাজে নামানো হল। শেরপারা বেশ স্বাধীনচেতা। তাঁরা তাঁদের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য সততার সঙ্গে  দিন রাত পরিশ্রম করতে পিছপা ছিলেন না। একদিকে নিজের পায়ে দাঁড়ানো অন্যদিকে কুলি পরিচয় থেকে সামাজিক মর্যাদা আনতে পরিশ্রম করলেও তাঁরা ক্রমশ ব্রিটিশদের কাছে প্রভু ভৃত্যের জায়গায় পৌঁছোতে লাগলেন। যেখানে যে কাজে দুই জন শ্রমিক প্রয়োজন সেখানে একজনকে দিয়ে কাজ করানো হতে লাগল। এর মধ্যেই ১৮৬০ সাল থেকেই দার্জিলিং-এর হাওয়ায় চা বাগানের বিস্তৃতি ঘটল। সেখানেও প্রথম দিকে শেরপাদের কাজে লাগানো শুরু হল। কিন্তু চা বাগানে কাজ করতে গিয়ে অনেকেরই  সেই সময় ম্যালেরিয়া হতে লাগল। এতে অনেক শেরপা কাজ ছেড়ে চলে যেতেন সহজেই। আর তখন বাইরে থেকে বিশেষ করে বিহার থেকে চা বাগানের কাজে মদেশীয়দের আনা শুরু হল। কিন্তু শেরপারা দমে যেতে চান না। তাঁরা লড়াকু। ব্রিটিশরা অনেক শেরপাকে সেনা বাহিনীতেও নিয়োগ শুরু করলেন। তাঁরা পাহাড়ে চড়ার সময় একটা কাজ আর কুলি হিসাবে কাজ করার জন্য বিভিন্ন সময়ের ভাগ করে নিলেন। অপরদিকে তিব্বত থেকে তাদের মধ্যে বুদ্ধ ধর্মীয় প্রভাব ছিল।

এখন ২০১১ সালের গণনা অনুযায়ী দার্জিলিং জেলায় শেরপাদের সংখ্যা এক লক্ষ ৫০ হাজার। আর তিন লক্ষ ৫০ হাজার গোটা রাজ্যে। তাদের মধ্যে প্রথম তেনজিং নোরগে ১৯৫৩ সালে এডমণ্ড হিলারির সঙ্গে এভারেস্ট শৃঙ্গ আরোহন করে দেশের সন্মান সেই সঙ্গে বিশ্বের দরবারে শেরপাদের স্বীকৃতি নিয়ে এলেন। এরপর ১৯৫৪ সালে হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট তৈরি হলে সেখানে প্রথম ইন্সট্রাক্টর হিসাবে ছয় জন শেরপার স্থান হল। যারা তাদেরকে কুলি হিসাবেই বেশি পরিচয় দিয়ে এসেছে সেই ব্রিটিশদের শোষণ থেকে মুক্তি পেয়ে তারা সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে বেশ এগিয়ে যেতে থাকল। তাদের মধ্যে অনেকেই আজ বিভিন্ন স্থানে চাকরি করছে। যদিও গবেষক অঞ্জসীর কথায়, ওদের উচ্চ শিক্ষার হার এখন মাত্র ৩ শতাংশ। আর ওদের কাজের কিছু কিছু এখন নিজস্ব ব্র্যান্ডিং পাওয়া শুরু করেছে। যেমন শেরপা বুট, শেরপা সোয়েটার।

শেরপা মানে হল পূর্ব দেশের অধিবাসী। তারা একটি উপজাতি। তাদের প্রধান খাদ্য আলু। তার সঙ্গে দুধ, ঘি, মাখন রয়েছে। অনেকে ইয়াক ও ;মুরগির মাংস খেয়ে থাকেন। পাহাড়ে ওঠার জন্য তারা রান্না করা মাংস নিয়ে পাহাড়ে উঠতে থাকেন। শীতের আবহাওয়ায় তা অনেক দিন ভালো থাকে। তারা ছাগল ও ভেড়া পোষার সঙ্গে সঙ্গে ইয়াক পোষেন। এদের লোম থেকে গরম পোশাক তারা তৈরি করেন। অনেক শেরপা আবার হাতে একটু পয়সা এলে গুম্ফা তৈরি করছেন। তাঁরা মনে করছেন বৌদ্ধ গুম্ফা তৈরি করে সামাজিক গুরুত্ব বাড়বে। অনেকেই আজ আবার তাদের ট্রাভেল ব্যবসা শুরু করছে। কুলি শব্দের তারা পরিবর্তনের জন্য এভাবেই লড়ছে। তাদের পোশাকে চলে এসেছে জিনস, আধুনিকতা। গবেষক অঞ্জসী এই সব বিভিন্ন দিক মেলে ধরে পাশ্চাত্যের ইতিহাসবিদ আর ভারতীয় ইতিহাসবিদদের মধ্যে শেরপাদের মূল্যায়ন নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার কথায়, পাশ্চাত্যের ইতিহাসবিদরা দাবি করে থাকেন ব্রিটিশরা এসে শেরপাদের সভ্য করে তুলেছেন, শিক্ষিত করেছেন।

পাশাপাশি ভারতীয় ইতিহাসবিদরা দাবি করছেন, ব্রিটিশরা শেরপাদের সভ্য বা শিক্ষিত করেননি। শেরপাদের মধ্যে আগে থেকেই সভ্যতা ছিল। বুদ্ধের ভাব, অহিংস মনোভাব তাঁদের মধ্যে আগে থেকেই ছিল। অঞ্জসীও ভারতীয় ইতিহাসবিদদের মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তার প্রশ্ন, ব্রিটিশরা যদি তাদের শিক্ষিত করে তুলবেন তবে কেন দুই জন শ্রমিকের কাজ একজনকে দিয়ে করানো হত? প্রাপ্য মজুরি না পেয়ে শেরপারা টাকার অভাবে তাদের ছেলেমেয়েদের ইংলিশ মিশনারিতে ভর্তি করতে পারেনি। তাঁদেরকে কুলি বলে অনেক স্থানেই ইংরেজরা পরিচয় দিত। কারও চিন্তাশক্তিতে যদি আধুনিকতা থাকে তবে সেটা তাঁদেরকে সৃজনমূলক কাজে এগিয়ে দিতে পারে। ‘শেরপারা অসভ্য ছিল, আমরা এসে ওদের সভ্য করেছি’ – সাদা সাহেবদের এই দাবি সঠিক নয় বলেও মন্তব্য করেছেন অঞ্জসী।

 

Developed by DXDasia