১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে জেনেভায় সাক্ষাৎকারটি অনুষ্ঠিত হয়
প্রখ্যাত দার্শনিক, সাহিত্য-সমালোচক রোমাঁ রল্যাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের যোগাযোগ ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে। তখন রোমাঁ রল্যাঁ সঙ্কীর্ণ জাতীয়তা-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যের বিষয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তাঁদের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে প্যারিসে। এখানে যে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হলো, তা অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে জেনেভায়। এটি প্রথম মুদ্রিত হয় ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে এশিয়ায়।
রবীন্দ্রনাথ: আপনি কি মনে করেন যে, বিশ্বে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জেনেভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে?
রল্যাঁ: হতে পারে, অনেকগুলো বিষয় নির্ভর করছে, যেসব ক্ষেত্রে জেনেভার নিয়ন্ত্রণ নেই, সেগুলোর ওপর।
রবীন্দ্রনাথ: আমার মনে হয় যেসব শক্তি এক্ষেত্রে কাজ করছে, সেগুলোর মধ্যে জাতিসংঘ একটি। এ মুহূর্তে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে কোনোভাবেই হোক এটি সবচেয়ে কার্যকর উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্বে এটি অধিকতর সঙ্গতি-রক্ষার ক্ষেত্রে শক্তিতে রূপান্তরিত হতে না-ও পারে। যেসব আন্তর্জাতিক, সামাজিক এবং স্বতন্ত্র গোষ্ঠী এখানে কাজ করছে, আমার আশা তারা জেনেভায় ক্রমে-ক্রমে আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডের এমন একটি কেন্দ্র গড়ে তুলবে, যা ভবিষ্যতের রাজনীতিকে একটি কাঠামো দান করবে।
রল্যাঁ: আমরা দেখি, প্রচুর পরিমাণ মানুষ প্রাচ্য থেকে বাণী পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। তারা মনে করে, ভারত – এবং আমি যোগ করতে চাই যে, নির্দিষ্টভাবে ভারতই এই বাণী পৌঁছে দিতে পারে সারা বিশ্বে।
রবীন্দ্রনাথ: লক্ষ করলে বিস্মিত হতে হয়, কীভাবে ভারত প্রথম আন্তর্জাতিক মনোভাবাপন্ন মানুষটিকে ঊনবিংশ শতাব্দীতে উপস্থাপন করল! আমি রাজা রামমোহন রায়ের কথা বলতে চাইছি। সত্যের প্রতি ছিল তাঁর প্রচণ্ড আবেগ। তিনি একটি গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ভেঙে দিয়েছিলেন সব কুসংস্কার এবং ধর্মীয় আচারনিষ্ঠতা। তিনি বৌদ্ধধর্ম-সম্বন্ধে জানার জন্য তিব্বত গিয়েছিলেন। হিব্রু, গ্রিক, আরবি, ফারসি, ইংরেজি ফরাসি ভাষা শিখেছিলেন। তিনি ব্যাপকভাবে ইউরোপ সফর করেন। মৃত্যুবরণ করেন ব্রিস্টলে।
রল্যাঁ: আমি প্রায়ই বিস্মিত হই ভারতে আধ্যাত্মিক সহিষ্ণুতার গুণাবলি লক্ষ করে। এধরনের কিছু আমাদের পাশ্চাত্যে নেই। আপনাদের ধর্মের মহাজাগতিক প্রকৃতি এবং আপনাদের সভ্যতার যৌগিক চরিত্র একে সম্ভব করে তুলেছে। ভারতবর্ষ সব ধর্মকেই সুযোগ দিয়েছে যথাযথভাবে বিকশিত হওয়ার জন্য।
রবীন্দ্রনাথ: এটি আমাদের দুর্বলতাও বটে। বৈষম্যমূলক সহিষ্ণুতার কারণে সব ধরনের ধর্মীয় মতবাদ ও ত্রুটি ভারতবর্ষে সাম্প্রতিক দাঙ্গা সৃষ্টি করছে। আমাদের আধ্যাত্মিক সত্যের প্রকৃত ভিত্তি-সম্বন্ধে অনুধাবন করার বিষয়টিকে কঠিন করে তুলেছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, পশুবলির বিষয়টি আমাদের ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। তারপরেও ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে অনেক মানুষ একে বৈধতা দিয়েছে। এই ধরনের ধর্মীয় অস্বাভাবিকতা প্রতিটি দেশেই লক্ষ করা যায়। এখন আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, ভারতবর্ষ থেকে এসব দূর করা এবং আমাদের যে প্রকৃত আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য রয়েছে সেই বৃহত্তর বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করা।
রল্যাঁ: খ্রিষ্টীয় ধর্মগ্রন্থেও এই পশুবলির ব্যাপারটি রয়েছে। আদিপুস্তক ৪ অধ্যায় ৪ পদে রয়েছে হেবল পশু বলি দেয়ার কারণে ঈশ্বর তাঁর উপহার গ্রাহ্য করলেন।
রবীন্দ্রনাথ: আমি কখনোই পুরাতন নিয়মের ঈশ্বরকে ভালোবাসতে পারবো না।